বৈশ্বিক বাজারে চীনের বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের সামনে বড় সুযোগ তৈরি হলেও তা কাজে লাগাতে পারছে না দেশের নন-লেদার বা কৃত্রিম উপকরণের তৈরি জুতা শিল্প। গত অর্থবছরে এ খাতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশে। উদ্যোক্তারা বলছেন, চাহিদার সংকট নয়, বরং বিনিয়োগের অভাব, ব্যাংকঋণ সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাই প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ‘অন্যান্য জুতা’ শ্রেণির আওতায় থাকা সিনথেটিক, রাবার, প্লাস্টিক ও টেক্সটাইল জুতার রপ্তানি হয়েছে ৫৩১ মিলিয়ন ডলারের। এর আগের অর্থবছরে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছিল ৫২২ মিলিয়ন ডলার।
গত কয়েক বছরের হিসাবেও দেখা যায়, নন-লেদার জুতা রপ্তানিতে এক ধরনের ওঠানামা রয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাতের রপ্তানি ছিল ৪৪৯ মিলিয়ন ডলার। পরের বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে চাহিদা কমে তা নেমে আসে ৩৮৫ মিলিয়ন ডলারে। এরপর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে রপ্তানি বেড়ে হয় ৪১৭ মিলিয়ন ডলার।
তবে গত অর্থবছরে আবারও গতি হারিয়েছে এই শিল্প। বিশেষ করে যখন বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে, তখন বাংলাদেশের প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি না হওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। চামড়ার জুতা রপ্তানিসহ বাংলাদেশের মোট জুতা রপ্তানি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার। অথচ একই সময়ে ভিয়েতনাম বছরে ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি এবং ইন্দোনেশিয়া ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি জুতা রপ্তানি করছে।
চাহিদা আছে, বাড়ছে না উৎপাদন সক্ষমতা:
শুয়েনিভার্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বলেন, রপ্তানি কমার মূল কারণ বাজার সংকট নয়, বরং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে না পারা।
তিনি বলেন, দেশের বেশিরভাগ কারখানা বর্তমানে পূর্ণ সক্ষমতার কাছাকাছি উৎপাদন করছে। নতুন কারখানা স্থাপন বা বিদ্যমান কারখানার সম্প্রসারণ না হলে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ সীমিত থাকবে। রিয়াদ মাহমুদ বলেন, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকটের কারণে উদ্যোক্তারা সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, তাদের কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার হচ্ছে এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডারও রয়েছে। কিন্তু নতুন বিনিয়োগের জন্য অর্থায়ন পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি জানান, বিকল্প অর্থায়নের পথ হিসেবে তাদের প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে আসার উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য শুয়েনিভার্সের জুতা ইউনিট সুনিপুণ ফুটওয়্যার লিমিটেডের প্রসপেক্টাস তৈরির কাজ চলছে। তার মতে, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়াও শিল্প বিনিয়োগে ধীরগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্ডার থাকলেও উৎপাদন বাড়ানোর মতো সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না।
ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেডের চেয়ারম্যান হাসানুজ্জামান হাসান বলেন, ব্যাংকিং সহায়তার অভাবে গত বছর তাদের বড় একটি রপ্তানি সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ক্রেতাদের কাছ থেকে পাওয়া ২২ লাখ ডলারের একটি রপ্তানি আদেশের জন্য ঋণপত্র (এলসি) খুলতে প্রায় দুই মাস চেষ্টা করতে হয়েছে। কিন্তু ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ক্রেতারা সেই অর্ডার বাতিল করে অন্য দেশে চলে যায়।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় এলসি সমস্যার সমাধান না হওয়ায় ক্রেতারা অপেক্ষা না করে বিকল্প সরবরাহকারীর কাছে চলে গেছে। হাসানুজ্জামান আরও বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণেও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থায় প্রভাব পড়েছে। তার আশা, নির্বাচিত সরকারের অধীনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে ক্রেতাদের আস্থা বাড়বে এবং বাংলাদেশ আবারও হারানো বাজার ফিরে পেতে পারে।
অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের আন্তর্জাতিক ব্যবসা বিভাগের প্রধান ও মহাব্যবস্থাপক মো. নাসরুল্লাহ বলেন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিশেষ করে ইউরোপীয় বাজারে ক্রেতাদের আস্থার ঘাটতির কারণে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধীর হয়েছে। তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, প্রতিবছর শ্রমিকদের মজুরি বাড়া এবং ব্যাংকঋণের ১২ থেকে ১৩ শতাংশ সুদের কারণে কারখানা পরিচালনার খরচ অনেক বেড়েছে। তার হিসাব অনুযায়ী, শুধু গ্যাসের খরচেই উৎপাদন ব্যয় ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
জেনিস শুজের চেয়ারম্যান মো. নাসির খান বলেন, দেশের জুতা শিল্পে উদ্যোক্তারা ইতোমধ্যে বিপুল বিনিয়োগ করেছেন। কোটি কোটি ডলারের যন্ত্রপাতি আমদানি করে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যার কারণে অনেক কারখানা তাদের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছে না।
তিনি বলেন, সময়মতো কাঁচামাল না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ ও জটিল আমদানি প্রক্রিয়াও শিল্পের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। নাসির খান বলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা নষ্ট হয়।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যেখানে প্রতিবছর ২০ থেকে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ছিল, সেখানে বর্তমান সমস্যাগুলো অব্যাহত থাকলে এ শিল্প নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন থেকে উৎপাদন সরিয়ে নেওয়ার বৈশ্বিক প্রবণতা বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে দ্রুত অর্থায়ন সংকট সমাধান, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

