দেশের অর্থনীতি এখনও মূল্যস্ফীতি, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও আর্থিক চাপের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে এসব প্রতিকূলতার মাঝেও ব্যতিক্রমী প্রবৃদ্ধি দেখাচ্ছে দেশের আইসক্রিম শিল্প। গত পাঁচ বছরে বাজারের আকার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
একই সঙ্গে বেড়েছে দেশি-বিদেশি স্বাদের বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, করপোরেট বিনিয়োগ এবং নতুন পণ্যের উদ্ভাবন। ফলে একসময়ের মৌসুমি খাদ্য এখন হাজার কোটি টাকার সম্ভাবনাময় শিল্পে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিযোগিতা শুধু বিক্রিতে নয়, নতুন স্বাদ, গুণগত মান ও বাজার সম্প্রসারণেও।
প্রতিবছর জুলাই মাসের তৃতীয় রোববার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব আইসক্রিম দিবস। এবার দিবসটি এমন সময় এসেছে, যখন দেশের বাজারে আইসক্রিমের চাহিদা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। বৈশাখ, দুই ঈদ, দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে আইসক্রিম এখন পারিবারিক আয়োজনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। শিশুদের পছন্দের খাবারের গণ্ডি পেরিয়ে এটি এখন সব বয়সী মানুষের কাছে জনপ্রিয়।
বাজার বিশ্লেষকদের তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশের আইসক্রিম বাজারের আকার প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। প্রতি বছর এই বাজার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্তও প্রবৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে এবং গড়ে ৯ শতাংশের বেশি হারে বাজার সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, নগরায়ণ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ব্যবহার বাড়ায় আইসক্রিমের চাহিদাও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে ভোক্তাদের রুচিতে পরিবর্তন আসায় বাজারে শুধু পরিমাণ নয়, পণ্যের বৈচিত্র্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনও এই শিল্পের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আগে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত আইসক্রিম বিক্রির প্রধান মৌসুম থাকলেও এখন দীর্ঘস্থায়ী গরম ও তাপপ্রবাহের কারণে সেপ্টেম্বর কিংবা অক্টোবর পর্যন্ত বিক্রি উচ্চ পর্যায়ে থাকে। ফলে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের বড় একটি সময় উৎপাদন ও সরবরাহ কার্যক্রম সচল রাখতে পারছে। এতে শীত মৌসুমের তুলনামূলক কম বিক্রির প্রভাবও অনেকটা সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
বাজারের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে দেশের আইসক্রিম বাজারের মূল্য ছিল আনুমানিক দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে শিল্প খাতে করপোরেট বিনিয়োগ।
দেশের শীর্ষস্থানীয় আইসক্রিম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা কয়েক লাখ লিটারে উন্নীত হয়েছে। ফলে একসময়ের সরবরাহ সংকট অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে শিল্পটি। এখন প্রতিযোগিতা হচ্ছে কে দ্রুত নতুন বাজারে পৌঁছাতে পারে এবং কে আরও উন্নত মানের পণ্য বাজারে আনতে পারে।
শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, ভোক্তাদের রুচির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন নতুন স্বাদ বাজারে আনছে কোম্পানিগুলো। একসময়ের ভ্যানিলা, চকলেট কিংবা স্ট্রবেরির বাইরে এখন আন্তর্জাতিক ধাঁচের প্রিমিয়াম ফিউশন ফ্লেভার জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। পেস্তা, কুনাফা, বেলজিয়ান ডার্ক চকলেটসহ নানা স্বাদের আইসক্রিম বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। সুপারশপ থেকে শুরু করে ছোট খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রেও প্রিমিয়াম পণ্যের জন্য আলাদা প্রদর্শন ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। কারণ তুলনামূলক বেশি লাভের সুযোগ থাকায় কোম্পানিগুলো গবেষণা ও নতুন পণ্য উন্নয়নে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করছে।
তবে দ্রুত সম্প্রসারণের মাঝেও শিল্পটি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল যেমন স্কিমড মিল্ক পাউডার, বাটার ফ্যাট, কোকো এবং বিশেষ ফ্লেভারের বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। সাম্প্রতিক বাজেটে এসব পণ্যের ওপর শুল্ক ও কর বৃদ্ধি এবং ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে শিল্পের প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো কোল্ড চেইন বা নিরবচ্ছিন্ন শীতল সরবরাহ ব্যবস্থা। কারখানা থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত আইসক্রিমকে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু গ্রামাঞ্চল ও উপজেলা পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং লোডশেডিংয়ের কারণে এই তাপমাত্রা ধরে রাখা অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ে। এতে খুচরা বিক্রেতাদের ব্যয় বাড়ে, পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। ফলে শহরের তুলনায় গ্রামীণ বাজারে সম্প্রসারণের গতি এখনও তুলনামূলক ধীর।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের অনিশ্চয়তার কারণে পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যয়ও বেড়েছে। গ্রীষ্মকালে চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকলেও একই সময়ে বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে উৎপাদক ও বিক্রেতাদের অতিরিক্ত চাপ নিতে হয়। এই পরিস্থিতিতে আধুনিক কোল্ড চেইন অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে শিল্পটি আরও দ্রুত সম্প্রসারিত হতে পারবে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি, নগরায়ণ, পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাস এবং দীর্ঘায়িত গ্রীষ্ম—এই চারটি বিষয় আগামী কয়েক বছরেও আইসক্রিম শিল্পের প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নেবে। তবে কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা কমানো, দেশীয় দুগ্ধ উৎপাদন বাড়ানো, শুল্ক কাঠামো পর্যালোচনা এবং আধুনিক কোল্ড চেইন ব্যবস্থা গড়ে তোলা না গেলে ভবিষ্যতে এই শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। তাই বাজারের আকার বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করাই এখন এই শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

