পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে বড় উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। রাজধানী ঢাকা এবং দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে পর্যায়ক্রমে ১০০টি বৈদ্যুতিক বাস চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ২৫টি চার্জিং স্টেশন নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে মোট ৪০০ কোটি টাকা অনুদান বা ইক্যুইটি সহায়তা চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করেছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের গণপরিবহন খাতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন বাড়বে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ব্যয় ও পরিচালন খরচও কমে আসবে।
সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বিআরটিসি শাখা থেকে অর্থ বিভাগের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এই বরাদ্দ চাওয়া হয়। বিভাগটির সিনিয়র সহকারী সচিব অজিত দেব স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিআরটিসি দেশের নগর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য গণপরিবহন সেবা সম্প্রসারণে কাজ করছে। সেই ধারাবাহিকতায় আধুনিক, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বৈদ্যুতিক বাস সংযোজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের মধ্যে সবুজ পরিবহন ব্যবস্থা, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং আধুনিক গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। বৈদ্যুতিক বাস চালুর উদ্যোগকে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের একটি কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের মতে, ডিজেলচালিত বাসের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক বাস ব্যবহার শুরু হলে জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে, বায়ুদূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে এবং যাত্রীসেবার মান উন্নত হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে যানবাহন পরিচালনার ব্যয়ও কমে আসবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব বাস শুধু রাজধানীর ব্যস্ত সড়কেই নয়, বিভাগীয় শহরগুলোর গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃনগর রুটেও পরিচালিত হবে।
জানা গেছে, এর আগেও একই প্রকল্পের জন্য ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে অর্থ বিভাগের কাছে আবেদন করা হয়েছিল। তবে সে সময় উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে উদ্যোগটি বাস্তবায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু বিআরটিসির দাবি, বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা দিয়ে পুরো প্রকল্পের ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে ঋণ নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে সুদ ও ঋণের অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে, যা রাষ্ট্র পরিচালিত গণপরিবহন সেবার জন্য দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।
এ কারণে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের পরিচালন বাজেট থেকে বিআরটিসির অনুকূলে ৪০০ কোটি টাকা অনুদান বা ইক্যুইটি হিসেবে বরাদ্দ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিআরটিসি আশ্বাস দিয়েছে, বরাদ্দ পাওয়া অর্থ শুধুমাত্র নির্ধারিত খাতেই ব্যয় করা হবে এবং সরকারি আর্থিক বিধিমালা ও সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত আইন কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে।
প্রস্তাবিত ব্যয় পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১০০টি বৈদ্যুতিক বাস কেনার জন্য ২৫০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এছাড়া ২৫টি চার্জিং স্টেশন স্থাপনে ৫০ কোটি টাকা, যন্ত্রপাতি ও খুচরা যন্ত্রাংশ সংগ্রহে ৩৫ কোটি টাকা, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তায় ২০ কোটি টাকা, পরিবহন, নিবন্ধন ও অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয়ে ২৫ কোটি টাকা এবং ডিপোসহ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়ন ও মেরামতে আরও ২০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০০ কোটি টাকা।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈদ্যুতিক বাস চালু হলে শুধু পরিবেশগত সুবিধাই মিলবে না, বরং জ্বালানি আমদানির ওপর দেশের নির্ভরতাও ধীরে ধীরে কমবে। বর্তমানে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর গণপরিবহন খাতে বৈদেশিক মুদ্রার বড় একটি অংশ ব্যয় হয়। বিদ্যুৎচালিত যানবাহনের ব্যবহার বাড়লে সেই ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি নগরাঞ্চলে শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু বাস কেনাই যথেষ্ট নয়। সফলভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নির্ভরযোগ্য চার্জিং অবকাঠামো, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ, দক্ষ কারিগরি জনবল এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে চার্জিং স্টেশন পরিচালনা, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা এবং যন্ত্রাংশ সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও গ্রহণ করা জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনে দ্রুত রূপান্তর শুরু করেছে। বাংলাদেশেও বৈদ্যুতিক বাস প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার সূচনা করবে না, বরং কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে টেকসই নগর পরিবহন ব্যবস্থার দিকেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে।

