চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশকে যুক্ত করে প্রস্তাবিত ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক করিডর নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। একদিকে এই করিডর বাংলাদেশের বন্দর, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য বড় সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক নীতির কারণে এ উদ্যোগ ঘিরে ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের মূল লক্ষ্য হলো বিকল্প ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করা। বর্তমানে চীনের জ্বালানি ও বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের বড় অংশ নির্ভর করে হরমুজ ও মালাক্কা প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর। এসব পথে সম্ভাব্য কোনো বাধা তৈরি হলে তা চীনের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণেই বিকল্প যোগাযোগ পথ তৈরির বিষয়ে দেশটি আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
প্রস্তাবিত করিডরের মাধ্যমে চীনের ইউনান প্রদেশকে বাংলাদেশের বন্দরগুলোর সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে চীন যেমন একটি বিকল্প সরবরাহ পথ পেতে পারে, তেমনি বাংলাদেশও বন্দর ব্যবহার, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকেন্দ্র:
এই করিডরের সঙ্গে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজনে মোংলা বন্দরসহ দেশের অন্যান্য বন্দরও এর আওতায় আসতে পারে। বাংলাদেশের বন্দরগুলো ব্যবহার করে চীন তার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশে পণ্য পরিবহন সহজ করতে পারবে।
তবে বঙ্গোপসাগরে চীনের বাণিজ্যিক উপস্থিতি কীভাবে দেখবে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলো, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। কারণ বঙ্গোপসাগর ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সংশ্লিষ্ট কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগকে মূলত অর্থনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধির প্রকল্প হিসেবেই দেখা উচিত। তাদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখতে পারলে বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমার—তিন দেশই লাভবান হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম শামস বলেন, চীনের প্রস্তাবিত এই করিডর বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে। তার মতে, বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করে চীন পণ্য পরিবহন করলে বাংলাদেশ বন্দর ব্যবহারের ফি থেকে আয় করতে পারবে।
তিনি বলেন, শুধু একটি দেশের জন্য নয়, জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় আগ্রহী সব দেশের জন্য বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহারের সুযোগ রাখা উচিত। এজন্য ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ এবং সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। তার মতে, করিডরটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশও দ্রুত এর অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের ধারণা সামনে আনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এর উদ্দেশ্য হলো তিন দেশের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বহুমুখী পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এই করিডর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর, মোংলা বন্দর, বে-টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ সেতু হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এক অনুষ্ঠানে বলেন, উন্নয়ন, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে চায় চীন। এ লক্ষ্যেই বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর নিয়ে কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।
চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বলেন, এই করিডর মূলত অর্থনৈতিক সংযোগ বৃদ্ধির উদ্যোগ। বাংলাদেশের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে। তার মতে, দেশের বন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়িয়ে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। রাখাইনে উন্নয়ন বাড়লে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা। চীন বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন অংশীদার। একই সঙ্গে ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই কোনো শক্তির কৌশলগত প্রতিযোগিতার অংশ না হয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বলেন, হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তা চীনকে বিকল্প সরবরাহ পথ নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে। একইভাবে মালাক্কা প্রণালিতে ভবিষ্যতে কোনো বাধা তৈরি হলে তা চীনের জন্য বড় ঝুঁকি হতে পারে। তিনি বলেন, চীনের ইউনান প্রদেশ স্থলবেষ্টিত হওয়ায় বিকল্প সামুদ্রিক যোগাযোগ পথ তৈরি করা দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বও বিবেচনায় রাখতে হবে।
তার মতে, বঙ্গোপসাগর দিয়ে বিশ্বের বড় একটি অংশের বাণিজ্য পরিচালিত হয়। তাই জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারলে এই করিডর বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
কুনমিং থেকে চট্টগ্রাম: নতুন বাণিজ্য পথের সম্ভাবনা
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের ধারণা অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। এই করিডর চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের মান্দালয় পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এরপর একটি অংশ ইয়াঙ্গুন এবং অন্য অংশ রাখাইনের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত যেতে পারে। বর্তমানে মিয়ানমারের বন্দর ব্যবহার করে চীনের ইউনানে পণ্য পরিবহন করা হয়। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হলে আমদানি-রপ্তানিতে সময় ও ব্যয় কমতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই করিডর শুধু একটি যোগাযোগ প্রকল্প নয়, এটি বাংলাদেশের জন্য আঞ্চলিক বাণিজ্যের নতুন দরজা খুলে দিতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে কূটনৈতিক ভারসাম্য, অবকাঠামোগত প্রস্তুতি এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার ওপর।

