আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তিতে নিজেদের স্বার্থ যথাযথভাবে তুলে ধরতে না পারায় বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তি এবং জাপানের সঙ্গে করা অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) বিভিন্ন ধারা নিয়ে দেশের ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, দক্ষ আলোচক এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে অনেক সময় চুক্তিতে বাংলাদেশের তুলনায় প্রতিপক্ষ দেশ বেশি সুবিধা আদায় করে নেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনায় শুধু পণ্য রপ্তানির বিষয় নয়, বরং শুল্ক সুবিধা, মেধাস্বত্ব, শ্রম অধিকার, পরিবেশগত মান, পণ্যের উৎপত্তি বিধিমালা এবং ডিজিটাল বাণিজ্যের মতো জটিল বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত দক্ষতা ও প্রস্তুতি ছাড়া আলোচনার টেবিলে শক্ত অবস্থান নেওয়া কঠিন।
তাদের মতে, বাংলাদেশের অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো দীর্ঘমেয়াদি একটি দক্ষ বাণিজ্য দরকষাকষি দল না থাকা। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্বের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক চুক্তির আলোচনায় যুক্ত করা হয়। ফলে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীর প্রস্তুতি নেওয়া বা ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অনেক সময় সম্ভব হয় না।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার একটি উন্নয়ন কর্মসূচির পরামর্শক হাফিজুর রহমান বলেন, কোনো দেশের আলোচক দলের সক্ষমতা কম হলে প্রতিপক্ষ দেশ সেটির সুযোগ নেয়। তার মতে, আন্তর্জাতিক চুক্তির আলোচনায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের বাণিজ্যনীতি, শুল্ক কাঠামো, পণ্যের উৎপত্তি বিধিমালা, মেধাস্বত্ব, ই-কমার্সসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, অনেক সময় আলোচনার মাঝপথেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি হয়ে যায়। এতে আলোচনার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয় এবং আগের প্রস্তুতি ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ কমে যায়। তার মতে, দক্ষ কর্মকর্তাদের ধরে রাখা এবং তাদের দীর্ঘ সময় একই বিষয়ে কাজের সুযোগ দেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, অতীতে বাংলাদেশ অনেক বাণিজ্য চুক্তি তুলনামূলক কম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করেছে। অথচ বিশ্বের অনেক দেশ একটি চুক্তি করার আগে দীর্ঘ সময় ধরে সম্ভাব্য সুবিধা-অসুবিধা বিশ্লেষণ করে। ফলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও চুক্তির আগে পর্যাপ্ত গবেষণা ও অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
২০২৯ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর নতুন বাস্তবতায় পড়তে হবে দেশকে। তখন অনেক উন্নত দেশের কাছ থেকে পাওয়া বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধা কমে যেতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এরই অংশ হিসেবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা চলছে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, চীন, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও সৌদি আরবের সঙ্গেও এ ধরনের চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে সরকার।
তবে এত বড় পরিসরে আলোচনা চললেও বর্তমানে স্থায়ী ও বিশেষায়িত কোনো আলোচক দল নেই। এ কারণে দেশের দরকষাকষির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকরা।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ফেলো ড. মোস্তফা আবিদ খান বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনার জন্য আলাদা একটি দক্ষ বিভাগ বা উইং থাকা প্রয়োজন। সেখানে তরুণ ও প্রশিক্ষিত কর্মকর্তাদের যুক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি একটি দল গড়ে তুলতে হবে।
তার মতে, কোনো চুক্তির আলোচনায় যাওয়ার আগে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রতিপক্ষ দেশের নীতি, বাজার পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত গবেষণা ছাড়া কার্যকর দরকষাকষি সম্ভব নয়। তিনি বলেন, চুক্তির প্রতিটি বিষয়কে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করতে হবে। এর জন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি স্থায়ী কাঠামো তৈরি করা জরুরি।
এদিকে সরকারও বাণিজ্য দরকষাকষির দুর্বলতা কাটাতে একটি ‘নেগোশিয়েটর পুল’ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। প্রাথমিকভাবে এতে প্রায় ১৫০ জন কর্মকর্তাকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, তথ্যপ্রযুক্তি ও শিল্প মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা এতে যুক্ত থাকবেন।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বড় কোনো বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শুরু হলে এই পুল থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তাদের নির্বাচন করা হবে। এর মাধ্যমে কোন কর্মকর্তা কোন বিষয়ে দক্ষ, তা চিহ্নিত করা সহজ হবে এবং আলোচনার জন্য উপযুক্ত দল গঠন করা যাবে।
নতুন এই কাঠামোর জন্য একটি নির্দেশিকা তৈরির কাজ চলছে। এতে অবসরপ্রাপ্ত দক্ষ কর্মকর্তাদেরও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্দিষ্ট চুক্তি বা পারিশ্রমিকের ভিত্তিতে তাদের পরামর্শক হিসেবে যুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে বড় সমস্যা হলো কর্মকর্তা বদলি হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অভিজ্ঞতা ও আলোচনার ধারাবাহিকতা অনেক সময় হারিয়ে যায়। স্থায়ী নেগোশিয়েটর পুল থাকলে এ সমস্যা কমবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (এফটিএ) মো. ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ জানান, নেগোশিয়েটর পুল তৈরির বিষয়ে ইতোমধ্যে কয়েকটি বৈঠক হয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে দক্ষদের বাছাই করে এই দলে যুক্ত করা হবে। তিনি জানান, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা ৪৭ জন কর্মকর্তাকে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি ইউএনডিপি তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
তিনি বলেন, জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির আলোচনায় দেখা গেছে, মেধাস্বত্ব বিষয়ে জাপানের বিপুলসংখ্যক বিশেষজ্ঞ রয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল সীমিত। তাই আন্তর্জাতিক আলোচনায় কার্যকর অবস্থান নিতে আরও বেশি দক্ষ আলোচক তৈরি করা প্রয়োজন।
তবে বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান খান দাবি করেছেন, দেশের বাণিজ্য দরকষাকষির সক্ষমতা দুর্বল নয়। তিনি বলেন, দক্ষতা উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং সরকার এ বিষয়ে নিয়মিত কাজ করছে। এ জন্য ২০৩০ সাল পর্যন্ত চলবে এমন একটি কারিগরি প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার ধরে রাখা এবং নতুন বাজারে প্রবেশের জন্য শুধু বেশি চুক্তি করাই যথেষ্ট নয়, বরং দেশের স্বার্থ রক্ষা করে কার্যকর চুক্তি করার সক্ষমতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ ও পেশাদার আলোচক দল গঠন করতে পারলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।

