একসময় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল উৎপাদন বাড়ানো। কারখানার সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে বছরের পর বছর তারা অর্জিত মুনাফা আবারও ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। ক্ষুদ্রতম ব্যয়ও হিসাব করে বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছেন তারা।
তবে এখন সেই চিত্র বদলাচ্ছে। পোশাক শিল্পের মাধ্যমে গড়ে ওঠা বিপুল পুঁজি আর শুধু দেশের কারখানাকেন্দ্রিক ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নেই। বরং তা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে দুবাই, সিঙ্গাপুর ও লন্ডনের মতো বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্রগুলোতে। আবাসন, কৃষিভিত্তিক ব্যবসা, আর্থিক প্রযুক্তি (ফিনটেক) এবং প্রযুক্তিনির্ভর নানা খাতে নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের পরিধি বাড়াচ্ছেন।
পোশাক শিল্প থেকে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক শক্তি:
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের ৮৪ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ শিল্পে কর্মসংস্থান হয়েছে ৪০ লাখেরও বেশি মানুষের, যাদের বড় অংশই নারী। দীর্ঘদিন ধরে আনাম গ্রুপ, ডিবিএল গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ ও বেক্সিমকোর মতো শিল্পগোষ্ঠী উৎপাদন বাড়ানো, পুনর্বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান শক্ত করার মাধ্যমে নিজেদের ব্যবসা বিস্তৃত করেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় বেক্সিমকো গ্রুপের সালমান এফ রহমান বস্ত্রের পাশাপাশি ওষুধ, গণমাধ্যম ও আবাসন খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন। এতে স্পষ্ট হয়, বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর কাছে বহুমুখীকরণ কেবল ব্যবসা বাড়ানোর কৌশল নয়, দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকারও একটি উপায়। তবে ২০২৫-২৬ সালে এসে সেই কৌশল আরও আন্তর্জাতিক রূপ নিতে শুরু করেছে।
দুবাই এখন নতুন আকর্ষণের কেন্দ্র:
বাংলাদেশি শিল্পগোষ্ঠীর নতুন বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় গন্তব্য হয়ে উঠছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বিশেষ করে দুবাই। বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর দ্বিতীয় প্রজন্মের উদ্যোক্তারা সেখানে হোল্ডিং কোম্পানি গড়ে তুলছেন। মূলধনি মুনাফার ওপর কর না থাকা, উন্নত মুক্তাঞ্চল ব্যবস্থা এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বাজারে সহজ প্রবেশাধিকার তাদের এই সিদ্ধান্তে উৎসাহিত করছে।
এ প্রবণতার পেছনে বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফোর্বস মিডলইস্টের ২০২৬ সালের তালিকা অনুযায়ী, আরব বিশ্বের ৩৭ জন বিলিয়নিয়ারের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ এক বছরে ৮ শতাংশ বেড়ে ১৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এই প্রবৃদ্ধি উপসাগরীয় অঞ্চলের বিনিয়োগ সম্ভাবনার প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহ বাড়িয়েছে।
একইভাবে, মাত্র ২৬ বছর বয়সে এএইচএস প্রপার্টিজের মাধ্যমে আব্বাস সাজওয়ানির বিলিয়নিয়ার হয়ে ওঠা দেখিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে আবাসন খাতে বিনিয়োগ করলে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন সম্ভব।
শুধু আবাসন নয়, কৃষি ও খাদ্যভিত্তিক শিল্পেও বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়ছে। পোশাক শিল্পে অর্জিত সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, লজিস্টিকস পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এখন তারা খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য চাষ এবং হিমায়িত সামুদ্রিক খাদ্য রফতানির মতো খাতে বিনিয়োগ করছেন।
সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের উইলমার ইন্টারন্যাশনাল এবং নাইজেরিয়ার ট্রপিক্যাল জেনারেল ইনভেস্টমেন্টস গ্রুপ পশ্চিম আফ্রিকার সম্ভাবনাময় কৃষি বাজারকে লক্ষ্য করে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের একটি যৌথ উদ্যোগ ঘোষণা করেছে। এই ধরনের উদ্যোগ এশিয়ার পারিবারিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোরও আগ্রহ বাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয় এবং বিদ্যমান রফতানি অবকাঠামো খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করতে পারে।
প্রযুক্তি ও ফিনটেকে নতুন প্রজন্মের ঝোঁক:
নতুন প্রজন্মের ব্যবসায়ীরা প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগেও সক্রিয়ভাবে বিনিয়োগ করছেন। বাংলাদেশের মোবাইল আর্থিক সেবার বাজার দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। বিকাশের মতো প্ল্যাটফর্ম প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ লেনদেন পরিচালনা করছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও একটি সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এ অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে দেশের কয়েকটি পারিবারিক শিল্পগোষ্ঠী বাংলাদেশ ছাড়াও ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন ফিনটেক, লজিস্টিকস প্রযুক্তি ও ই-কমার্স সহায়ক প্রতিষ্ঠানে সংখ্যালঘু অংশীদার হিসেবে বিনিয়োগ করছে।
বৈশ্বিক শিল্পগোষ্ঠীর পথ অনুসরণ:
আফ্রিকার শিল্পপতি আলিকো ডাঙ্গোটের ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ অনেক উদ্যোক্তার জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালে ডাঙ্গোটে সিমেন্টের শেয়ারদর ৬৯ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১ ট্রিলিয়ন নাইরা মুনাফা অর্জন করে। এরপর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে তিনি একটি চীনা যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৪০ কোটি ডলারের চুক্তি করেন।
এই উদাহরণ দেখায়, একটি খাতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হলে তা অন্য খাতে সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি ও বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করে। বাংলাদেশের অনেক শিল্পগোষ্ঠীও এখন একই ধরনের কৌশল অনুসরণ করছে।
গড়ে উঠছে পেশাদার সম্পদ ব্যবস্থাপনা:
বাংলাদেশের বড় শিল্প পরিবারগুলোর বিনিয়োগ কাঠামোও পরিবর্তিত হচ্ছে। আগে পারিবারিক সম্পদ পরিচালনা ছিল তুলনামূলক অনানুষ্ঠানিক। এখন ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে পেশাদার ‘সিঙ্গেল ফ্যামিলি অফিস’, যেখানে সুস্পষ্ট বিনিয়োগ নীতি, স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ এবং অভিজ্ঞ সম্পদ ব্যবস্থাপক যুক্ত হচ্ছেন।
দুবাই, সিঙ্গাপুর ও লন্ডনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, উত্তরাধিকার পরিকল্পনা এবং প্রজন্মান্তরের বিনিয়োগ কৌশল নির্ধারণ করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় পরিচালিত ফাউন্ডেশনগুলোকেও আরও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে, যাতে সামাজিক অবদানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছেও একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় তৈরি হয়।
সামনে কোন পথে এগোবে শিল্পপুঁজি?
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শিল্প খাত থেকে সরে যাওয়ার প্রবণতা নয়। পোশাক শিল্প এখনও বাংলাদেশের বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর মূল ভিত্তি। তবে এখন তাদের লক্ষ্য শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং বৈশ্বিক পর্যায়ে সম্পদ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা।
আগামী কয়েক বছরে যেসব পরিবার আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে পারবে, উপসাগরীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করবে এবং সুশাসনভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করবে, তারাই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে।
বাংলাদেশের শিল্পপুঁজি এখন ধীরে ধীরে একটি বৈশ্বিক বিনিয়োগ নেটওয়ার্কের অংশে পরিণত হচ্ছে। ফলে আবাসন, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং প্রযুক্তি খাতে অংশীদারত্ব ও বিনিয়োগের সুযোগও নতুন মাত্রা পাচ্ছে। তবে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব খাতে প্রবেশের সুযোগও সীমিত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

