দেশে রাস্তার পাশের ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান, ছোট রেস্তোরাঁ, বেকারি, আমদানিকারক থেকে শুরু করে বড় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান—খাদ্য ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রায় সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এখন থেকে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) নিবন্ধন বা লাইসেন্স নিতে হবে। নতুন ‘নিরাপদ খাদ্য (নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং) প্রবিধানমালা’ অনুযায়ী এ বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।
গত ১৬ জুলাই নতুন প্রবিধানটি সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, খাদ্যের মান নিশ্চিত করা এবং খাদ্য ব্যবসার ওপর কার্যকর নজরদারি বাড়াতেই এই বিধিমালা করা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে ব্যবসার ব্যয় ও প্রশাসনিক জটিলতা আরও বাড়বে।
প্রবিধান অনুযায়ী, খাদ্য ব্যবসাকে দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য নিবন্ধনই যথেষ্ট হবে। তবে বিশেষ ধরনের ও উচ্চঝুঁকিপূর্ণ খাদ্যপণ্য উৎপাদন বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স নিতে হবে।
নিবন্ধনের আওতায় থাকছে রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের রসের দোকান, পেস্ট্রি শপ, ক্যাটারিং সেবা, প্যাকেটজাত খাদ্য উৎপাদনকারী, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারী এবং কাঁচা ও তাজা খাদ্য ছাড়া অন্যান্য খাদ্যপণ্যের আমদানিকারকরা। এমনকি রাস্তার পাশে পিঠা, পুরি, পেঁয়াজু বা অন্যান্য ভাজাপোড়া খাবার বিক্রেতাদেরও নিবন্ধন নিতে হবে।
অন্যদিকে শিশুদের ফর্মুলা দুধ, বিশেষ রোগীদের জন্য তৈরি খাবার, ভিটামিন বা খনিজ সমৃদ্ধ (ফর্টিফায়েড) খাদ্য, অর্গানিক খাদ্য, জিনগতভাবে পরিবর্তিত (জিএমও) খাদ্য, বিকিরণ প্রযুক্তিতে সংরক্ষিত খাদ্য এবং বেসরকারি খাদ্য গুদাম ও কোল্ড স্টোরেজ পরিচালনাকারীদের লাইসেন্স নিতে হবে।
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ হবে তিন বছর। এরপর তা নবায়ন করতে হবে। নিবন্ধনের ফি এক হাজার টাকা এবং নবায়নের ফি ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। লাইসেন্সের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের আয়তন অনুযায়ী ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। ছোট প্রতিষ্ঠানের জন্য লাইসেন্স ফি এক হাজার টাকা, আর ১০ হাজার বর্গফুটের বেশি আয়তনের প্রতিষ্ঠানের জন্য পাঁচ হাজার টাকা। বড় খাদ্য গুদামের ক্ষেত্রে লাইসেন্স ফি সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
তবে ব্যবসায়ীরা এ বিধিমালার বিভিন্ন দিক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, বর্তমানে খাদ্য ব্যবসা পরিচালনার জন্য ১৭টি সরকারি সংস্থা থেকে লাইসেন্স ও নিবন্ধন নিতে হয়। নতুন এই বিধিমালা ব্যবসায়িক ব্যয় আরও বাড়াবে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থা যুক্ত হওয়ায় বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়হীনতা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে পণ্যের সিঅ্যান্ডএফ মূল্যের ভিত্তিতে ফি নির্ধারণ ব্যবসার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, শুধু নতুন বিধিমালা জারি করলেই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হবে না। তার মতে, বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন নিয়ম দুর্নীতির সুযোগও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এসব সমালোচনার জবাবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (এনফোর্সমেন্ট) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, প্রাথমিকভাবে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বৃহৎ পরিসরের খাদ্য উৎপাদনকারীদের ওপর নজরদারিতে গুরুত্ব দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে বিএসটিআইসহ অন্য সংস্থার সনদ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমও স্বাধীনভাবে পর্যবেক্ষণ করবে কর্তৃপক্ষ।
তিনি জানান, আমদানি করা খাদ্যপণ্যে ভেজাল ও মিথ্যা ঘোষণার বিষয়গুলো তদারকিতে দেশের চারটি বন্দরে ২৫ জন জ্যেষ্ঠ খাদ্য নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

