দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে এমন একটি পরিকল্পনা নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারকে যুক্ত করে একটি নতুন অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে বেইজিং। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের স্থলপথে যোগাযোগ আরও সহজ হবে, বাড়বে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ। তবে যতটা আশাবাদ এই পরিকল্পনাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে, বাস্তব পরিস্থিতি ততটাই কঠিন বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূরাজনীতি বিশ্লেষকরা।
গত ২৬ জুন ২০২৬ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকে এই করিডোরের প্রস্তাব সামনে আসে। এটি মূলত দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে থাকা বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভারত ও চীনের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে আগের প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে এগোতে পারেনি। সেই প্রেক্ষাপটে ভারতকে বাদ দিয়ে নতুন করিডোরের ধারণা উত্থাপন করেছে চীন, যা তাদের বৃহৎ বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
প্রথম দৃষ্টিতে এই করিডোর বাংলাদেশের জন্য একাধিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। স্থলপথে চীনের বাজারে দ্রুত প্রবেশ, শিল্প ও উৎপাদন খাতে নতুন বিনিয়োগ, বন্দর ও পরিবহন অবকাঠামোর উন্নয়ন, এমনকি আঞ্চলিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগপথ তৈরি হলে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্বও বাড়তে পারে।
কিন্তু অর্থনৈতিক সম্ভাবনার এই ছবির বিপরীতে রয়েছে এক জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মিয়ানমার। করিডোরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি এই দেশের ভেতর দিয়ে যাওয়ার কথা। অথচ বর্তমানে মিয়ানমার বিশ্বের অন্যতম অস্থিতিশীল রাষ্ট্রগুলোর একটি। দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ, সামরিক শাসন, অসংখ্য জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন এবং বিভক্ত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দেশটিকে এমন অবস্থায় নিয়ে গেছে, যেখানে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভূরাজনীতিতে এ ধরনের অঞ্চলকে অনেক বিশ্লেষক ‘শ্যাটারবেল্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। অর্থাৎ এমন একটি এলাকা যেখানে অভ্যন্তরীণ সংঘাত, জাতিগত বিভাজন এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা একসঙ্গে সক্রিয় থাকে। মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি সেই সংজ্ঞার সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়। সেখানে একদিকে রয়েছে সামরিক সরকার, অন্যদিকে জাতীয় ঐক্য সরকার এবং বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে সামরিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মাত্র ২০ থেকে ৩৩ শতাংশ এলাকা। বাকি ৬৭ থেকে ৮০ শতাংশ অঞ্চল হয় বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে, নয়তো সংঘর্ষপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
এই বাস্তবতা করিডোর নির্মাণকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করিডোর কেবল রাস্তা বা রেললাইন নির্মাণের বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা, স্থিতিশীল প্রশাসন, কার্যকর আইনশৃঙ্খলা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। যদি করিডোরের বড় অংশ নিয়মিত সংঘর্ষপূর্ণ এলাকার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে, তাহলে পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে বিনিয়োগ, বীমা, নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই ব্যয় ও ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।
এ ধরনের ঝুঁকির উদাহরণ ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্য অঞ্চলেও দেখা গেছে। পাকিস্তানে চীনের অর্থায়নে নির্মিত বৃহৎ অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়নের সময় বিদ্রোহপ্রবণ এলাকায় একাধিক হামলা হয়েছে। অবকাঠামো লক্ষ্য করে আক্রমণ, বিদেশি প্রকৌশলীদের নিরাপত্তা সংকট এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ফলে শুধু অর্থায়ন বা রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই একটি করিডোর সফল হয় না—নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মিয়ানমারের আরেকটি বড় সংকট হলো রোহিঙ্গা ইস্যু। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এখনো নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের কার্যকর কোনো অগ্রগতি নেই। এই অমীমাংসিত সংকট দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে। ফলে বৃহৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাধা হয়ে থাকতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা। মিয়ানমারকে ঘিরে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়াসহ একাধিক দেশের কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ সংকট কেবল একটি জাতীয় সমস্যা নয়; এটি আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতিরও অংশ। এমন পরিস্থিতিতে নতুন অর্থনৈতিক করিডোরকে কেন্দ্র করে কৌশলগত প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বাংলাদেশের জন্য এই করিডোর অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার নাম। আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, নতুন বাজারে প্রবেশ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্পায়নের গতি বাড়াতে এটি সহায়ক হতে পারে। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তব ঝুঁকিগুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করা জরুরি। কারণ দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া কোনো আন্তর্জাতিক করিডোরই টেকসই হয় না।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আকর্ষণীয় হলেও এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে মূলত মিয়ানমারের রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর। দেশটিতে যদি স্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়, কার্যকর রাষ্ট্রিক নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসে এবং দীর্ঘদিনের সংঘাত ও মানবিক সংকটের সমাধান শুরু হয়, তাহলে এই করিডোর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংযোগপথে পরিণত হতে পারে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি একটি উচ্চাভিলাষী কৌশলগত পরিকল্পনা হলেও বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা অবকাঠামো নয়, বরং ভূরাজনীতিই।

