যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তির বিনিময়ে বাংলাদেশ বড় ধরনের কোনো সুবিধা পেয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ একের পর এক ছাড় দিলেও ওয়াশিংটনের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সুবিধা এখনো মেলেনি। বরং নতুন করে শুল্ক আরোপের চাপ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করেছে, বাংলাদেশে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের বিষয় রয়েছে। এ অভিযোগের ভিত্তিতে ২৪ জুলাই থেকে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করেছে দেশটি। পাশাপাশি অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি তদন্ত চলছে। সেই তদন্তের ফলেও নতুন শুল্ক আরোপের আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তিতে বাংলাদেশ বড় ধরনের প্রতিশ্রুতি দিলেও বিনিময়ে নিশ্চিত সুবিধা পায়নি। বরং যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানির বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে, যার কারণে বাড়তি খরচ বহন করতে হতে পারে। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে চুক্তিটি পুনর্বিবেচনা করা কিংবা প্রয়োজনে বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া উচিত বাংলাদেশের।
‘চুক্তিটি অসম ও একতরফা’:
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা এই চুক্তি মূলত অসম ও অযৌক্তিক।
তিনি বলেন, প্রায় ৬০টি দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্র একই ধরনের শুল্ক আরোপ করেছে। ফলে বাংলাদেশ চুক্তি করে আলাদা কোনো প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পায়নি। উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্য তুলনামূলক বেশি দামে আমদানির প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাপিডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম এ রাজ্জাকও চুক্তিটিকে ‘অত্যন্ত অসম’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, এটি প্রকৃত অর্থে বাণিজ্য চুক্তি নয়। কারণ সাধারণত দুই পক্ষই কিছু ছাড় দেয়। কিন্তু এই চুক্তিতে বাংলাদেশ প্রায় সব ছাড় দিয়েছে, বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহারে পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা কতটা বাস্তব?
চুক্তির অন্যতম সম্ভাব্য সুবিধা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা দিয়ে তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে এখনো এ সুবিধা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর (ইউএসটিআর) জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর থেকে এ সুবিধা চালু হতে পারে। তবে এটি কার্যকর হবে মাত্র তিন বছরের জন্য। একই সঙ্গে কোন পণ্য এই সুবিধা পাবে এবং কত পরিমাণ রপ্তানি করা যাবে, তা নির্ধারণের ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকবে।
বাংলাদেশ ছাড়াও কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াকে একই ধরনের সুবিধার কথা বলা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক শুল্ক ব্যবস্থা নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের পর মালয়েশিয়া ওয়াশিংটনের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল করেছে। বাণিজ্য বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র এমন কঠিন শর্ত দিতে পারে, যার কারণে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য এই সুবিধা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠবে।
প্রতিশ্রুতি পূরণে বাড়ছে খরচ:
যদিও বাংলাদেশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটি অনুমোদন করেনি, তবুও এর বেশ কিছু শর্ত বাস্তবায়ন শুরু করেছে। চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য পণ্য আমদানি বাড়িয়েছে বাংলাদেশ। এসব পণ্য অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
গত ১ জুলাই সরকার যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টন গম আমদানির অনুমোদন দেয়। প্রতি টনের দাম নির্ধারণ করা হয় ৩২২ ডলার। একই দিনে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে ৫০ হাজার টন গম কেনার অনুমোদন দেওয়া হয় প্রতি টন ২৯৭ দশমিক ৯২ ডলারে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের গমের জন্য প্রতি টনে প্রায় ২৪ ডলার বেশি দিতে হচ্ছে।
এ ছাড়া চুক্তির পর বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), চিনি, সয়াবিন, তুলাসহ বিভিন্ন পণ্য কেনার পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো যাতে সরকারি দরপত্রে অংশ নিতে পারে, সে জন্য সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ৬০টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করলেও এখন পর্যন্ত অভিযোগের পক্ষে কোনো বিস্তারিত প্রমাণ প্রকাশ করেনি। তাদের মতে, একতরফাভাবে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে চলমান তদন্ত থেকেও নতুন শুল্কের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) সেলের মহাপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার অভিযোগ বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক। কিন্তু এর অধিকাংশ কাঁচামালই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তাই বাংলাদেশ অতিরিক্ত উৎপাদন করছে—এমন অভিযোগের ভিত্তি নেই।
তার মতে, বাংলাদেশের মূল সুবিধা হলো কম খরচের শ্রম। কম মজুরিতে বিপুল সংখ্যক মানুষকে পোশাক খাতে নিয়োজিত করা অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা।
তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করা পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা এখনো কার্যকর হয়নি। তিনি বলেন, ইউএসটিআর জানিয়েছে সেপ্টেম্বর থেকে এই সুবিধা চালু হতে পারে। তবে কোন শর্তে সুবিধা দেওয়া হবে এবং কত পরিমাণ রপ্তানি করা যাবে, তা যুক্তরাষ্ট্রই নির্ধারণ করবে। সুবিধাটি থাকবে তিন বছরের জন্য।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য প্রকৃত সুবিধার বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তুলার কত শতাংশ ব্যবহার করলে একটি পোশাক শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে, তা চুক্তিতে পরিষ্কার করা হয়নি। ফলে শেষ পর্যন্ত সুবিধার পরিমাণ নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ওপর।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক কূটনৈতিক চাপের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি মেনে নেওয়া উচিত নয় বাংলাদেশের। বরং দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসে চুক্তির শর্ত পরিবর্তন বা বাতিলের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তাদের আশঙ্কা, চুক্তির সব শর্ত কার্যকর হলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা আরও দুর্বল হতে পারে। বিশেষ করে যদি প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ওপর বাড়তি শুল্কের চাপ তৈরি হয়।

