চায়ের দাম বাড়েনি। রপ্তানি কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে, ঋণের বোঝা বেড়েছে, উৎপাদনশীলতা কমেছে এবং অনেক চা বাগান ধারাবাহিক লোকসানে পরিচালিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে খাতটিকে টেকসইভাবে ঘুরে দাঁড় করাতে একটি সরকারি টাস্কফোর্স বিস্তৃত সংস্কার পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছে।
সরকারের কাছে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে চা শিল্পের আটটি প্রধান সমস্যা চিহ্নিত করে মোট ৫৯টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে কীভাবে এসব সংস্কার বাস্তবায়ন করা যেতে পারে, তারও একটি রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। এতে সহজ শর্তে ঋণ, কর কমানো, পুরোনো ঋণের পুনর্গঠন, নতুন চা গাছ রোপণ, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম চা উৎপাদনকারী দেশ। দেশে ১৭২টি চা বাগানে ২০২৫ সালে মোট ৯ কোটি ৪৯ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। এই শিল্পে প্রায় ১ লাখ ২ হাজার স্থায়ী এবং ৪০ হাজার অস্থায়ী শ্রমিক কাজ করছেন। পাশাপাশি প্রায় ৫ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা সরাসরি চা বাগানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ফলে এই খাতের স্থিতিশীলতা শুধু ব্যবসায়িক নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বাস্তবতা হলো, ২০১৯ সালের পর থেকে চা বাগানগুলো উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কম দামে চা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। ২০২৪ সালে প্রতি কেজি চা উৎপাদনে গড়ে ব্যয় হয়েছে ২৬০ টাকা, অথচ নিলামে বিক্রির গড় মূল্য ছিল মাত্র ২০৮ টাকা ৮৮ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে প্রায় ৫১ টাকা ১২ পয়সা লোকসান গুনতে হয়েছে উৎপাদকদের।
চা শিল্পের আরেকটি বড় সংকট হলো রপ্তানিতে দীর্ঘমেয়াদি পতন। ২০০২ সালের তুলনায় বর্তমানে চা রপ্তানি প্রায় ৭৯ শতাংশ কমে গেছে। অন্যদিকে গত এক দশকে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ৭৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। কিন্তু সেই অনুপাতে বাজারমূল্য বাড়েনি। ফলে উৎপাদকদের মুনাফা কমে যাওয়ার পাশাপাশি অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়েছে।
টাস্কফোর্সের মতে, এই সংকটের অন্যতম কারণ চা বাগানকে এখনো শিল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে উদ্যোক্তাদের কৃষিখাতের তুলনায় অনেক বেশি সুদে ঋণ নিতে হয়। বর্তমানে যেখানে কৃষি ঋণের সুদের হার প্রায় ৬ শতাংশ, সেখানে চা শিল্পকে প্রায় ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। তাই চা বাগানকে কৃষি খাতের আওতায় এনে সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
কর ব্যবস্থাকেও বড় বাধা হিসেবে দেখা হয়েছে প্রতিবেদনে। বর্তমানে উৎপাদকদের মূল্য সংযোজন কর, চা সেস, ব্রোকারেজ ফি, গুদাম ভাড়া এবং অগ্রিম আয়করসহ বিভিন্ন খাতে উল্লেখযোগ্য ব্যয় বহন করতে হয়। টাস্কফোর্সের মতে, এসব কর ও চার্জ কমানো না গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করা কঠিন হবে। এজন্য মূল্য সংযোজন কর ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
রপ্তানি বাজারেও বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল। বছরে মাত্র ২৫ থেকে ৪৫ লাখ মার্কিন ডলারের চা রপ্তানি হচ্ছে, যার বড় অংশই পাকিস্তানে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের নিজস্ব শক্তিশালী চা ব্র্যান্ড নেই, ভৌগোলিক নির্দেশক স্বীকৃতি নেই এবং উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত বাজারেও উপস্থিতি সীমিত।
উৎপাদনশীলতার দিক থেকেও বাংলাদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। দেশে প্রতি হেক্টরে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কেজি চা উৎপাদিত হলেও ভারতে তা প্রায় ২ হাজার ৫০০ কেজি এবং শ্রীলঙ্কায় প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কেজি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চা বাগানের মোট জমির প্রায় ৪৫ শতাংশে বর্তমানে চা উৎপাদন হয় না। তবে এর বড় অংশই আবাসন, অবকাঠামো, পরিবেশ সংরক্ষণ ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে নতুন চা আবাদে ব্যবহারযোগ্য জমির পরিমাণ মাত্র ৮ থেকে ৯ শতাংশ।
চা শিল্পের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় টাস্কফোর্স ২ হাজার ৫০ কোটি টাকার একটি বিশেষ সহায়তা তহবিল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। এই তহবিল থেকে কম সুদে ঋণ, পুরোনো ঋণের পুনর্গঠন, নতুন চা গাছ লাগানো এবং কারখানার আধুনিকায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ চা বোর্ড এবং বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের জন্য নিয়মিত বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে, যাতে গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কাজ আরও জোরদার করা যায়।
দেশীয় বাজারে উৎপাদকদের সুরক্ষা দিতে তিন স্তরের মূল্য কাঠামোরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে সাধারণ মানের চায়ের জন্য প্রতি কেজি ন্যূনতম ২৭৫ টাকা মূল্য নির্ধারণ, রপ্তানিযোগ্য চায়ের জন্য ২০০ থেকে ২২০ টাকা মূল্য এবং উন্নতমানের বিশেষ চায়ের ক্ষেত্রে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
পুরোনো চা গাছের পরিবর্তে নতুন গাছ লাগানোর জন্য ১০ বছর মেয়াদি পুনঃরোপণ পরিকল্পনা গ্রহণেরও প্রস্তাব রয়েছে। এর আওতায় প্রতি বছর মোট চা গাছের ২ থেকে ৩ শতাংশ পরিবর্তনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে উৎপাদনশীলতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়।
রপ্তানি বাড়াতে পাকিস্তানের পাশাপাশি মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং রাশিয়ার সঙ্গে সরকারিভাবে বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রপ্তানিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান ৩ শতাংশ প্রণোদনা বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করার কথাও বলা হয়েছে।
বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অধীনে একটি বিশেষ চা বিনিয়োগ সেল গঠন, কৃষি প্রযুক্তি, সৌরবিদ্যুৎ এবং প্রিমিয়াম চা ব্র্যান্ডে বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার প্রস্তাবও প্রতিবেদনে রয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের জন্য সবুজ অর্থায়ন সুবিধা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের প্রায় ৮ হাজার ক্ষুদ্র চা চাষিকে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও মান উন্নয়নে সহায়তা দিতে পঞ্চগড়ে বাংলাদেশ চা বোর্ডের একটি স্থায়ী আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের কথাও বলা হয়েছে।
শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। প্রতিবেদনে শ্রমিক পরিবারের শিশুদের জন্য সরকারি বিদ্যালয়, কার্যকর চিকিৎসাকেন্দ্র, অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা এবং চা বাগানের সড়ক উন্নয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত শুরু করতে ৯০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনাও দেওয়া হয়েছে। প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় কর্মদল গঠন, ৬০ দিনের মধ্যে চা বাগানকে কৃষি খাত হিসেবে পুনঃশ্রেণিকরণ এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা, আর ৯০ দিনের মধ্যে বিনিয়োগ সেল চালু, পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা শুরু এবং পঞ্চগড়ে চা বোর্ডের আঞ্চলিক কার্যালয় চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের চা শিল্পের সংকট কেবল উৎপাদন ব্যয়ের সমস্যা নয়; এটি নীতিগত সীমাবদ্ধতা, দুর্বল রপ্তানি কৌশল, উচ্চ অর্থায়ন ব্যয় এবং দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ঘাটতির ফল। তাই শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বাজার সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন, ব্র্যান্ডিং এবং উৎপাদন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে পারলেই এই শিল্প আবারও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

