কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার বিশ্বজুড়ে আধুনিক মেমোরি চিপের চাহিদা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সেই প্রবণতার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটি এমন আর্থিক ফল প্রকাশ করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় নজিরবিহীন প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে স্যামসাংয়ের পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৮৯ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ওন, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় বিশাল অঙ্কের সমান। এক বছরের ব্যবধানে পরিচালন মুনাফা বেড়েছে ১ হাজার ৮০০ শতাংশেরও বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১৯ গুণ।
একই সময়ে প্রতিষ্ঠানের মোট বিক্রি বা রাজস্ব বেড়ে হয়েছে ১৭১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ওন, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩০ শতাংশ বেশি। নিট মুনাফাও লাফিয়ে বেড়ে ৭১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ওনে পৌঁছেছে। এই খাতে প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ১ হাজার ৩০০ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের ধারণার সঙ্গে এই ফলাফল প্রায় পুরোপুরি মিলেছে। ফলে বাজারে এটি বড় ধরনের ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য ব্যবহৃত তথ্যকেন্দ্র দ্রুত বাড়ছে। এসব তথ্যকেন্দ্রে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মেমোরি চিপের প্রয়োজন হয়, যা তৈরি করে বিশ্বের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। স্যামসাং, এসকে হাইনিক্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাইক্রন এই বাজারের সবচেয়ে বড় নির্মাতাদের মধ্যে রয়েছে।
বিশেষ করে উচ্চ ব্যান্ডউইথ মেমোরি চিপ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রসেসরে অপরিহার্য উপাদান। চ্যাটভিত্তিক প্রযুক্তি, ছবি তৈরি এবং অন্যান্য জটিল গণনামূলক কাজ পরিচালনায় এই চিপের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ফলে এসব পণ্যের চাহিদা স্যামসাংয়ের ব্যবসায় বড় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
স্যামসাং জানিয়েছে, তাদের মেমোরি চিপ বিভাগ চলতি প্রান্তিকে আবারও নতুন রেকর্ড গড়েছে। বিশেষ করে সার্ভার খাতের জন্য তৈরি পণ্যের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তবে শক্তিশালী আর্থিক ফলাফল প্রকাশের আগেই দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে বড় ধরনের দরপতন দেখা যায়। অনেক বিনিয়োগকারী আশঙ্কা করছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বাজারে যে অতিরিক্ত আশাবাদ তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতে টেকসই নাও হতে পারে।
এই উদ্বেগের কারণে এক পর্যায়ে স্যামসাংয়ের শেয়ারের দাম ১২ শতাংশের বেশি কমে যায়। একই সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী এসকে হাইনিক্সের শেয়ারও টানা দুই দিনে প্রায় অর্ধেক মূল্য হারায়। তবে আর্থিক ফল প্রকাশের পর বৃহস্পতিবার সকালে স্যামসাংয়ের শেয়ারদর আবার প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা মনে করছেন, বছরের দ্বিতীয়ার্ধেও তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির বিস্তার অব্যাহত থাকবে। এর ফলে সার্ভারের জন্য মেমোরি চিপের চাহিদাও শক্তিশালী থাকবে।
স্যামসাংয়ের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা পার্ক সুন-চেওল জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারে মেমোরি চিপের ঘাটতি ২০২৭ সালে আরও তীব্র হতে পারে এবং ২০২৮ সাল পর্যন্ত এই চাপ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের টেইলরে নির্মাণাধীন স্যামসাংয়ের প্রথম চিপ কারখানা চলতি বছরই উৎপাদন শুরু করার পথে রয়েছে। একই এলাকায় দ্বিতীয় কারখানার নির্মাণকাজ ২০২৬ সালের শেষ দিকে শুরু হওয়ার কথা এবং সেখানে ২০৩০ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, শুধু উন্নত মেমোরি চিপ নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারের কারণে প্রচলিত ন্যান্ড ও ডির্যাম চিপের দাম এবং বিক্রিও বেড়েছে। ফলে স্যামসাং একাধিক পণ্য থেকেই অতিরিক্ত সুবিধা পাচ্ছে।
সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের চিপ নির্মাতা ব্রডকমের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতার ঘোষণাও দিয়েছে। এই চুক্তির আওতায় আগামী প্রজন্মের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির জন্য উন্নত মেমোরি চিপ সরবরাহ করবে স্যামসাং। আগামী ২০৩০ সাল পর্যন্ত এই অংশীদারত্বের সম্ভাব্য মূল্য ২০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে স্যামসাং শুধু একটি বড় গ্রাহকের ওপর নির্ভরশীল না থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক বাজারে আরও বিস্তৃত ক্রেতা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে চাইছে।
দক্ষিণ কোরিয়া সরকারও এই শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণকে দেশের অর্থনীতির জন্য বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে। সরকার ইতোমধ্যে স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সকে নিয়ে ৮০০ ট্রিলিয়ন ওন বিনিয়োগে চারটি অত্যাধুনিক চিপ উৎপাদন কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ সতর্ক করে বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চিপের বর্তমান চাহিদা দীর্ঘমেয়াদে একই গতিতে থাকবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। নতুন কারখানাগুলো উৎপাদনে যেতে কয়েক বছর সময় লাগবে। এর মধ্যে যদি বৈশ্বিক চিপ বাজারের বর্তমান উল্লম্ফন কমে যায়, তাহলে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। তাই রেকর্ড মুনাফার মধ্যেও ভবিষ্যতের বাজার পরিস্থিতির দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন বিনিয়োগকারী ও শিল্প বিশ্লেষকরা।

