বিশ্বের তৈরি পোশাক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে নতুন কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে ভারত। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিতে পরিবর্তন এবং যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে দেশটি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব ইতিবাচক অগ্রগতি সত্ত্বেও বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ভারতের জন্য সহজ হবে না। কারণ কম উৎপাদন ব্যয়, বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতা এবং দীর্ঘদিনের রপ্তানি অভিজ্ঞতা এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।
বাজার বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর আরোপিত উচ্চ শুল্ক কমিয়ে ৫০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। এর ফলে ভারতীয় পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য মার্কিন বাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আগে শুল্কের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অনেকেই ভারত থেকে সরে গিয়ে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার দিকে ঝুঁকেছিলেন। এখন পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে এবং ভারত আবারও প্রতিযোগিতায় ফিরে আসার সুযোগ পাচ্ছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারেও চাহিদা বাড়ার ইঙ্গিত মিলছে। জুন মাসে দেশটির পোশাক ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের খুচরা বিক্রি আগের মাসের তুলনায় ০.৬৩ শতাংশ এবং আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩.৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রবৃদ্ধিকে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা নতুন করে অর্ডার দিতে আগ্রহী হওয়ায় ভারতীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর আশাবাদও বেড়েছে।
ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় ইতিবাচক ঘটনা হলো যুক্তরাজ্যের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হওয়া। গত ১৫ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া এই চুক্তির ফলে ভারতীয় তৈরি পোশাকের ওপর যুক্তরাজ্যে বিদ্যমান ৮ থেকে ১২ শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার হয়েছে। এর ফলে ভারতীয় পণ্য এখন আরও প্রতিযোগিতামূলক দামে যুক্তরাজ্যের বাজারে প্রবেশ করতে পারবে। বিশ্লেষকদের ধারণা, কয়েক বছরের মধ্যে যুক্তরাজ্যের পোশাক বাজারে ভারতের অংশীদারিত্ব বর্তমান প্রায় ৬ শতাংশ থেকে দ্বিগুণ অঙ্কে উন্নীত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এর পাশাপাশি ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্তবাণিজ্য চুক্তিও ভারতের জন্য বড় সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৭ সালে চুক্তিটি কার্যকর হলে ইউরোপে ভারতীয় পোশাকের ওপর থাকা ১০ থেকে ১২ শতাংশ আমদানি শুল্ক উঠে যাবে। বর্তমানে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও তুরস্ক শুল্ক সুবিধা পাওয়ায় ইউরোপীয় বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রয়েছে। নতুন চুক্তি কার্যকর হলে ভারতও একই সুবিধা পাবে এবং ইউরোপের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা এখনো বাংলাদেশের পক্ষেই রয়েছে। বৈশ্বিক ক্রেতারা বর্তমানে সরবরাহ ঝুঁকি কমাতে বড় ও নির্ভরযোগ্য উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে বেশি অর্ডার দিচ্ছেন। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক শক্তিশালী। দেশের শীর্ষ ১০টি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকটির বার্ষিক রপ্তানি আয় ৩৫ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি এবং অন্তত ১৫টি প্রতিষ্ঠানের আয় ২৩ কোটি ডলার অতিক্রম করেছে। অন্যদিকে ভারতে মাত্র পাঁচটি প্রতিষ্ঠান এই পর্যায়ের রপ্তানি সক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা এখনো কম উৎপাদন ব্যয়। শিল্প বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের মজুরি ভারতের তুলনায় প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কম। যেহেতু পোশাক উৎপাদনের মোট ব্যয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ শ্রম ব্যয়, তাই বাংলাদেশ তুলনামূলক কম দামে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য সরবরাহ করতে পারে। বিশেষ করে নিট পোশাক খাতে এই সুবিধা বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।
অন্যদিকে ভারতের বড় শক্তি হলো তার সমন্বিত বস্ত্রশিল্প অবকাঠামো। দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তুলা উৎপাদনকারী এবং সুতা উৎপাদন সক্ষমতার দিক থেকেও অন্যতম শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। তুলা উৎপাদন, সুতা তৈরি, কাপড় বয়ন থেকে শুরু করে পোশাক প্রস্তুত—প্রায় পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়াই ভারতের নিজস্ব শিল্পভিত্তির ওপর নির্ভরশীল। ফলে কাঁচামালের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরতা তুলনামূলক কম এবং সরবরাহ ব্যবস্থাও বেশি স্থিতিশীল।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে ভারতের এই শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে দেশটিকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। তবে শুধু বাণিজ্য চুক্তি দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবধান কমানো সম্ভব হবে না। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা ভারতের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠবে।
বাজার বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অনুকূল পরিস্থিতি, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি এবং ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির প্রভাবে ২০২৬ থেকে ২০২৮ অর্থবছরের মধ্যে ভারতের বেশিরভাগ বস্ত্র ও পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক রাজস্ব প্রায় ১৫ শতাংশ হারে বাড়তে পারে।
তবে সামগ্রিক মূল্যায়নে স্পষ্ট যে, ভারত নতুন বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা চালালেও বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক বড় হুমকি তৈরি হয়নি। কম উৎপাদন ব্যয়, বৃহৎ রপ্তানি সক্ষমতা, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দীর্ঘদিনের আস্থার কারণে বাংলাদেশ এখনো বৈশ্বিক তৈরি পোশাক বাণিজ্যে অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে। তবে জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাজার বহুমুখীকরণে গতি আনতে না পারলে ভবিষ্যতে ভারতের নতুন কৌশল বাংলাদেশের জন্য আরও বড় প্রতিযোগিতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

