চীন থেকে বাংলাদেশ এত বেশি পণ্য আমদানি করে—বিষয়টি দেখলে প্রথমে মনে হতে পারে, দেশের বাজার চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। বাস্তবে এর পেছনে শুধু সস্তা ভোগ্যপণ্যের চাহিদা নয়, বাংলাদেশের শিল্প ও উৎপাদন ব্যবস্থার একটি বড় অংশও জড়িত। পোশাক কারখানার যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে কাপড় ও অন্যান্য কাঁচামাল, ইলেকট্রনিকসের উপকরণ, শিল্পযন্ত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, নির্মাণসামগ্রী—বিভিন্ন ধরনের পণ্য চীন থেকে আসে। ফলে চীন থেকে আমদানির একটি বড় অংশ সরাসরি দেশের উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানি প্রায় ১৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ৭০০ মিলিয়ন ডলারেরও কম। অর্থাৎ চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো একদিকে বিপুল আমদানি, অন্যদিকে তুলনামূলক ছোট রপ্তানি।
এর একটি বড় কারণ চীনের শিল্প সক্ষমতা। কয়েক দশকে চীন এমন একটি উৎপাদন কাঠামো তৈরি করেছে, যেখানে একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পণ্য তৈরি করা যায় এবং তুলনামূলক কম দামে তা বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা সম্ভব। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য নিজস্বভাবে সব ধরনের যন্ত্রপাতি, শিল্প উপকরণ ও কাঁচামাল উৎপাদন করা এখনো সম্ভব হয়নি। ফলে যে পণ্য দেশে তৈরি হয় না, অথবা তৈরি হলেও চীনের তুলনায় বেশি খরচ পড়ে, সেগুলোর জন্য ব্যবসায়ীরা চীনের দিকে ঝুঁকছেন। বড় পরিসরের উৎপাদন, সরবরাহকারীর বিশাল নেটওয়ার্ক এবং দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক যোগাযোগের কারণে চীনা পণ্য অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশি আমদানিকারকদের জন্য সহজলভ্য। তাই চীন থেকে আমদানি কমানোর প্রশ্নটি শুধু চীনা পণ্যের ব্যবহার কমানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের শিল্প উৎপাদনের সক্ষমতা ও বিকল্প সরবরাহের ব্যবস্থাও জড়িত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীন থেকে আসা অনেক পণ্য আবার বাংলাদেশের রপ্তানি শিল্পকে সচল রাখে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, ইলেকট্রনিকস ও বিভিন্ন উৎপাদন খাতের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উপকরণের একটি অংশ আমদানি করতে হয়। অর্থাৎ চীন থেকে একটি যন্ত্র বা কাঁচামাল আমদানি করার পর সেটি ব্যবহার করে বাংলাদেশে পণ্য তৈরি হতে পারে, আর সেই পণ্য পরে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের বাজারে রপ্তানি হতে পারে। এই কারণে চীনের সঙ্গে বড় আমদানি সম্পর্ককে শুধু ভোগ্যপণ্যের নির্ভরতা হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়ে না। বরং বাংলাদেশের শিল্প এখনো যেসব ক্ষেত্রে বিদেশি যন্ত্রপাতি ও উপকরণের ওপর নির্ভরশীল, চীন সেই চাহিদার বড় অংশ পূরণ করছে।
তবে সমস্যাটি তৈরি হয় যখন আমদানির তুলনায় রপ্তানি একই গতিতে বাড়ে না। বাংলাদেশ চীনের বাজারে শুল্কমুক্ত ও সুবিধাজনক প্রবেশাধিকার পেলেও সেখানে রপ্তানি এখনও সীমিত। বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িতে তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রয়েছে, অথচ চীন নিজেই বিশ্বের অন্যতম বড় পোশাক উৎপাদনকারী দেশ। ফলে চীনের বিশাল বাজার থাকলেও সেখানে বাংলাদেশি পণ্যের পরিসর বাড়ানো সহজ হচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ চীনে কৃষিপণ্য, চামড়া, ওষুধ, মাছসহ আরও বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু শুল্ক সুবিধার পাশাপাশি পণ্যের মান, বাজারের চাহিদা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন অশুল্ক বাধা মোকাবিলা করাও জরুরি।
এ কারণে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর সহজ পথ হিসেবে শুধু আমদানি বন্ধ বা কমিয়ে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। বরং বাংলাদেশের জন্য বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত—চীন থেকে যে বিপুল পরিমাণ পণ্য আসছে, তার কতটা দেশে উৎপাদন করা সম্ভব এবং একই সঙ্গে চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কীভাবে বাড়ানো যায়। চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিকে বাংলাদেশে উৎপাদন বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করা গেলে একটি আমদানি-নির্ভর সম্পর্ক ধীরে ধীরে উৎপাদন ও রপ্তানিনির্ভর সম্পর্কেও পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য তাই চীন শুধু পণ্য কেনার জায়গা নয়; বড় বাজার, প্রযুক্তির উৎস এবং বিনিয়োগের সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর সবচেয়ে টেকসই পথ হবে এমন একটি শিল্পভিত্তি তৈরি করা, যেখানে বাংলাদেশ চীন থেকে শুধু পণ্য আমদানি করবে না—বরং বাংলাদেশে তৈরি পণ্যও আরও বেশি পরিমাণে চীনের বাজারে পাঠাতে পারবে।

