বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে চীন এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের একটি। তবে দুই দেশের বাণিজ্যের চিত্রে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে প্রায় ১৮ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, বিপরীতে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল মাত্র ৬৯৪ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন ডলার। ফলে ওই অর্থবছরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১৭ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারে। কিন্তু কেন বাংলাদেশের আমদানির এত বড় অংশ চীন থেকে আসে—এর উত্তর শুধু ‘চীনা পণ্য সস্তা’ বললে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদন, তৈরি পোশাক খাত, মেশিনারি, কাঁচামাল, রাসায়নিক, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং বিভিন্ন উৎপাদন উপকরণের সঙ্গে চীনের সরবরাহ ব্যবস্থা গভীরভাবে যুক্ত। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ চীন থেকে প্রায় ২২ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। এর বড় একটি অংশ ছিল টেক্সটাইল ও টেক্সটাইলজাত পণ্য, মেশিনারি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, রাসায়নিক এবং ধাতু ও ধাতব পণ্য। অর্থাৎ চীন শুধু বাংলাদেশের ভোক্তা বাজারের জন্য পণ্য সরবরাহ করছে না; অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কারখানাগুলো যে পণ্য তৈরি করছে, সেই উৎপাদন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতিও সরবরাহ করছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে চীনের এই সম্পর্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত পোশাক শিল্পকে সচল রাখতে বিপুল পরিমাণ সুতা, কাপড়, ডাই, রাসায়নিক, মেশিনারি এবং বিভিন্ন আনুষঙ্গিক উপকরণ প্রয়োজন হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানিতে টেক্সটাইল ও টেক্সটাইলজাত পণ্যের মূল্য ছিল প্রায় ৬ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার এবং মেশিনারি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের আমদানি ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার। এর অর্থ হলো, চীন থেকে আমদানি করা অনেক পণ্য সরাসরি বাংলাদেশের উৎপাদন ও রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত। একটি পোশাক কারখানা চীন থেকে কাপড় বা মেশিন কিনে সেই উপকরণ ব্যবহার করে পোশাক তৈরি করে ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করলে চীনা আমদানির একটি অংশ পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সঙ্গেও যুক্ত হয়। একই কারণে টেক্সটাইল, প্লাস্টিক, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বিভিন্ন শিল্পে চীনা মেশিনারি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চীনের বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা ও সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক। একই দেশে বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্ট ও আনুষঙ্গিক উপকরণ পাওয়া যায়। বড় পরিমাণে উৎপাদনের কারণে অনেক পণ্যের দামও প্রতিযোগিতামূলক থাকে। দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক, সরবরাহকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশি আমদানিকারকদের অভিজ্ঞতা এবং সমুদ্রপথে বড় পরিমাণ পণ্য পরিবহনের সুবিধাও চীনকে বাংলাদেশের জন্য একটি শক্তিশালী সাপ্লাই মার্কেটে পরিণত করেছে।
তবে এই নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ঘাটতিও অনেক বড় হয়েছে। চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিল্প ও উৎপাদন অর্থনীতি। মেশিনারি, ইলেকট্রনিকস, শিল্পপণ্য, রাসায়নিক, কাঁচামাল থেকে শুরু করে ভোক্তা পণ্য—অসংখ্য ধরনের পণ্য তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে। অন্যদিকে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো অনেক বেশি তৈরি পোশাকনির্ভর। পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া, পোশাক, কৃষিপণ্য, হিমায়িত খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্য চীনে রপ্তানি হলেও তার পরিমাণ চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানির তুলনায় অনেক কম। তবে বড় বাণিজ্য ঘাটতি দেখেই চীন থেকে সব আমদানিকে নেতিবাচক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কারণ আমদানির ধরন অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব নির্ধারণ করে। শিল্পের কাঁচামাল, মেশিনারি ও উৎপাদন উপকরণ আমদানি করে যদি দেশে উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানো যায়, তাহলে সেই আমদানির অর্থনৈতিক মূল্য প্রস্তুত ভোগ্যপণ্য আমদানির চেয়ে ভিন্ন। অন্যদিকে চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকিও রয়েছে। কোনো কারণে চীন থেকে কাঁচামাল বা যন্ত্রপাতি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে বাংলাদেশের কিছু শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে এমন সংকটের প্রভাব বাংলাদেশও অনুভব করেছিল। তাই আমদানির উৎসে কিছুটা বৈচিত্র্য আনা এবং একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
চীন থেকে আমদানি বন্ধ করা বাস্তবসম্মত সমাধান নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো এই আমদানিকে কীভাবে বাংলাদেশের উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করা যায়। যেসব কাঁচামাল ও শিল্প উপকরণ দেশে উৎপাদন করা সম্ভব, সেগুলোর স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সরবরাহ সম্পর্ক বাড়ানো যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চীন থেকে আমদানি করা কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দেশে আরও বেশি ভ্যালু অ্যাডেড পণ্য তৈরি করা এবং সেগুলো আন্তর্জাতিক মার্কেটে রপ্তানি করা। চীনের বিশাল বাজারেও বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, কৃষিপণ্য, হিমায়িত খাদ্য, ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্যের সুযোগ রয়েছে। সেই বাজার ধরতে হলে কোয়ালিটি, সার্টিফিকেশন, প্যাকেজিং, দাম এবং সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। ফলে চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানি বেশি হওয়ার বিষয়টিকে শুধু বাণিজ্য ঘাটতির দৃষ্টিতে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। আসল প্রশ্ন হলো—চীন থেকে যে পণ্য বাংলাদেশ আমদানি করছে, সেগুলো ব্যবহার করে দেশের শিল্প কতটা শক্তিশালী হচ্ছে, কতটা মূল্য সংযোজন হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত কতটা বেশি রপ্তানি তৈরি হচ্ছে। আমদানি যদি উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর উপকরণ হিসেবে কাজ করে, তাহলে সেটি শুধু ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরির অংশও হতে পারে।

