চিংড়ি, মাছসহ হিমায়িত খাদ্যপণ্যের রপ্তানি বাড়াতে ২ হাজার কোটি টাকার ঘূর্ণায়মান প্রি-ফাইন্যান্সিং তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কম সুদে অর্থায়নের এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থসংকট কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের হিমায়িত খাদ্যপণ্যের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন এই তহবিল থেকে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারবেন উদ্যোক্তারা। আর অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এই অর্থ পাবে ৪ শতাংশ সুদে। তিন বছর মেয়াদি তহবিলটি ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে।
দেশের সব তফসিলি ব্যাংক নির্দিষ্ট চুক্তি সম্পন্ন করে এই অর্থায়ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগ-২-এর সঙ্গে চুক্তি করার পর ব্যাংকগুলো তহবিল থেকে অর্থ পাওয়ার সুযোগ পাবে।
এই অর্থায়ন শুধু রপ্তানির জন্য পণ্য উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। চিংড়ি, মাছ ও অন্যান্য হিমায়িত খাদ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির পাশাপাশি কাঁচামাল কেনা, কারখানা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন, নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণেও ঋণের অর্থ ব্যবহার করা যাবে।
বন্ধ বা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া মাছ ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা পুনরায় চালু করতেও এই তহবিল থেকে অর্থ নেওয়া যাবে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং পরিবেশ পুনরুদ্ধার, এমনকি মাটির গুণগত মান পুনরুদ্ধারের মতো কাজও অর্থায়নের আওতায় রাখা হয়েছে।
নতুন কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাত বছরের জন্য মেয়াদি ঋণ দেওয়া যাবে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ এক বছর গ্রেস পিরিয়ড থাকবে। অন্যদিকে বিদ্যমান কারখানা সংস্কার, সম্প্রসারণ বা আধুনিকায়নের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের ঋণ পাওয়া যাবে, যার মধ্যেও এক বছর পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড রাখা যাবে।
চলতি মূলধনের প্রয়োজন মেটাতে এক বছরের ঋণ নেওয়া যাবে এবং তা একবার নবায়ন করা সম্ভব হবে। তবে একই প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ দুই বছর এই সুবিধা নিতে পারবে।
নতুন হিমায়িত খাদ্য কারখানার জন্য সর্বোচ্চ ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত মেয়াদি ঋণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিদ্যমান প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান সংস্কার, সম্প্রসারণ বা আধুনিকায়নের জন্য পেতে পারে সর্বোচ্চ ২০ কোটি টাকা।
কারখানায় সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্য মূল প্রকল্প ঋণের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ অথবা ৫ কোটি টাকা—যেটি কম—পর্যন্ত অর্থায়ন পাওয়া যাবে। কাঁচামাল কেনা, উৎপাদন ব্যয়, শ্রমিকদের মজুরি ও বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল মেটাতে চলতি মূলধনের ঋণের পরিমাণ নির্ধারিত হবে প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক লেনদেনের ভিত্তিতে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ঋণসীমা ২০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, যেসব হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের কারখানা চলতি মূলধনের সংকটে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, তাদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে একই উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারের অন্য কোনো কর্মসূচি থেকে অর্থায়ন পাওয়া প্রতিষ্ঠান এই সুবিধা পাবে না। খেলাপি ঋণগ্রহীতারাও এই তহবিলের আওতার বাইরে থাকবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোকে প্রি-ফাইন্যান্সিং দিলেও ঋণের পুরো ঝুঁকি বহন করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক। ঋণ আদায়ের দায়িত্বও তাদেরই থাকবে। নির্ধারিত সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে বিলম্বিত সময়ের জন্য ব্যাংককে অতিরিক্ত ২ শতাংশ সুদ দিতে হবে।
ঋণের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত নজরদারির আওতায় রাখতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের কারখানা বা অফিস অন্তত প্রতি তিন মাসে একবার পরিদর্শন করতে হবে।
তহবিলের সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে তাদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত ১৫ শতাংশ সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে পূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। এই শর্ত পূরণ না করলে পরবর্তী অর্থায়ন স্থগিত হতে পারে।
বাংলাদেশের হিমায়িত খাদ্য খাত দীর্ঘদিন ধরেই অর্থায়ন সংকট, উচ্চ মজুত ব্যয়, দীর্ঘ সময় ধরে অর্থ আটকে থাকা এবং ব্যয়বহুল কোল্ড-চেইন ব্যবস্থার মতো সমস্যার মুখোমুখি। এর মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে হিমায়িত ও জীবন্ত মাছের রপ্তানি সামান্য বাড়লেও প্রধান রপ্তানি পণ্য চিংড়ির রপ্তানি প্রায় ৪ শতাংশ কমে ২৮ কোটি ৬০ লাখ ডলারে নেমেছে।
নতুন তহবিলের মাধ্যমে এসব আর্থিক চাপ কিছুটা কমিয়ে উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে কার্যক্রম বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

