বাংলাদেশের ছোট ব্যবসার জগতে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—বিক্রি বেশি হলেই মুনাফা বেশি হয় না। একটি মুদি দোকান, পাইকারি ব্যবসা, সুপারশপ, পরিবেশক প্রতিষ্ঠান কিংবা ছোট ট্রেডিং ব্যবসায় দিনে কোটি টাকার পণ্য হাতবদল হতে পারে, কিন্তু সব খরচ বাদ দেওয়ার পর প্রকৃত লাভের পরিমাণ নেমে আসতে পারে কয়েক শতাংশে। এই বাস্তবতার মধ্যেই অর্থ আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে টার্নওভারভিত্তিক ন্যূনতম করের কাঠামো নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যবসার ক্ষেত্রে এখন ব্যবসার প্রকৃত মুনাফার পাশাপাশি মোট বিক্রি বা গ্রস প্রাপ্তির ওপর ন্যূনতম করের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে ব্যবসা লাভজনক কি না, তার চেয়ে ব্যবসার আকার কত বড়—কর নির্ধারণে সেই প্রশ্নের গুরুত্ব বেড়েছে। এ নিয়ে ইতোমধ্যে ব্যবসায়ী মহলে আপত্তি উঠেছে। চলতি বছরের মার্চে সুপারমার্কেট মালিকেরা গ্রস প্রাপ্তির ওপর বিদ্যমান ১ শতাংশ ন্যূনতম কর কমিয়ে ০.২৫ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, এই করব্যবস্থা কম মুনাফার ব্যবসায় মূলধনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
সমস্যাটির মূল জায়গা হলো ‘টার্নওভার’ এবং ‘মুনাফা’র পার্থক্য। ধরুন, একটি ব্যবসা বছরে ১ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করল। কিন্তু পণ্য কেনা, দোকান বা গুদামের ভাড়া, কর্মচারীর বেতন, পরিবহন, বিদ্যুৎ, ব্যাংক ঋণের সুদ এবং অন্যান্য ব্যয় মেটানোর পর ব্যবসাটির প্রকৃত মুনাফা দাঁড়াল ৫ লাখ টাকা। মুনাফার ওপর কর আরোপ করলে করের হিসাব হবে ওই ৫ লাখ টাকার ভিত্তিতে। কিন্তু টার্নওভারভিত্তিক ন্যূনতম করের ক্ষেত্রে হিসাবের ভিত্তি হলো ব্যবসার মোট প্রাপ্তি। ফলে ব্যবসার লাভের হার যত কম, একই টার্নওভারের বিপরীতে ন্যূনতম করের কার্যকর চাপ তত বেশি হয়। এই কারণেই ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, করের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত প্রকৃত আয় বা মুনাফা। এর আগে বাংলাদেশে ন্যূনতম টার্নওভার কর নিয়ে একই ধরনের আপত্তি উঠেছিল। ২০২৪ সালের এক বিশ্লেষণে ব্যবসায়ীরা বলেছিলেন, লোকসান বা কম মুনাফার সময়ও টার্নওভারের ওপর কর দিতে হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের মূলধন ক্ষয়ে যাচ্ছে।
তবে সরকারের অবস্থানের পেছনেও একটি বাস্তব কারণ রয়েছে। বাংলাদেশে অনেক ব্যবসা বছরের পর বছর কম মুনাফা বা লোকসান দেখিয়ে আয়কর কমিয়ে রাখে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ন্যূনতম করের ধারণাটি মূলত এ ধরনের কর-ফাঁকি ঠেকিয়ে ব্যবসার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আকারের সঙ্গে ন্যূনতম রাজস্ব নিশ্চিত করার জন্য তৈরি হয়েছে। ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে বাংলাদেশে ন্যূনতম কর ব্যবস্থার বিস্তার ঘটে। এনবিআরের যুক্তি ছিল, শুধু ঘোষিত মুনাফার ওপর নির্ভর করলে প্রকৃত আয় গোপনের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই ব্যবস্থার আরেকটি সমস্যা সামনে এসেছে—যেসব প্রতিষ্ঠান সত্যিই কম লাভ করে বা লোকসানে থাকে, তারাও একই কাঠামোর মধ্যে পড়ে যায়। ফলে কর ফাঁকি ঠেকানোর জন্য তৈরি একটি ব্যবস্থা নিয়মিত করদাতাদের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। ব্যবসায়ীদের এই আপত্তি নতুন নয়; ২০২১ সালেও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো ন্যূনতম টার্নওভার করকে আয়কর নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে তা কমানোর দাবি জানিয়েছিল।
এবারের বিতর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ ছোট ও মাঝারি ব্যবসার বড় অংশের মুনাফার হার খুব বেশি নয়। বিশেষ করে পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য, ডিস্ট্রিবিউশন এবং কম-মার্জিনের পণ্যের ব্যবসায় টার্নওভার বড় হলেও লাভের হার তুলনামূলক কম থাকে। এ ধরনের ব্যবসায় ১ শতাংশ টার্নওভার কর শুনতে ছোট মনে হলেও প্রকৃত মুনাফার তুলনায় তা বড় অংশ হয়ে উঠতে পারে। যেমন কোনো ব্যবসার নিট মুনাফার হার যদি ২ শতাংশ হয়, তাহলে মোট বিক্রির ওপর ১ শতাংশ কর কার্যত সেই ব্যবসার অর্ধেক মুনাফার সমান। মুনাফার হার আরও কম হলে চাপ আরও বাড়বে। আর ব্যবসা যদি কোনো বছর লোকসানে চলে, তখন টার্নওভারভিত্তিক কর দিতে হলে উদ্যোক্তাকে ব্যবসার চলতি মূলধন থেকেই অর্থ বের করতে হতে পারে। এ কারণেই ন্যূনতম করকে শুধু ‘করহার’ দিয়ে বিচার করলে সমস্যাটির পুরো চিত্র পাওয়া যায় না; দেখতে হবে করটি উদ্যোক্তার প্রকৃত মুনাফার কত অংশ নিয়ে যাচ্ছে।
এখানে আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো কর-পরিপালন। সরকারের লক্ষ্য যদি আরও বেশি ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিক করব্যবস্থার মধ্যে আনা হয়, তাহলে করব্যবস্থা উদ্যোক্তার কাছে সহজ, পূর্বানুমানযোগ্য এবং ন্যায্য হওয়া জরুরি। অতিরিক্ত চাপের আশঙ্কা তৈরি হলে ছোট ব্যবসার একটি অংশ প্রকৃত বিক্রি কম দেখানো, নগদ লেনদেন বাড়ানো কিংবা হিসাবের বাইরে ব্যবসা পরিচালনার দিকে ঝুঁকতে পারে। এতে স্বল্পমেয়াদে কর আদায়ের চাপ বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে করজাল সম্প্রসারণের লক্ষ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে ব্যবসার হিসাব যদি ডিজিটাল করা যায়, প্রকৃত ব্যয় ও মুনাফার হিসাব সহজ করা যায় এবং অতিরিক্ত ন্যূনতম কর ভবিষ্যৎ করদায়ের সঙ্গে দ্রুত সমন্বয়ের ব্যবস্থা কার্যকর করা যায়, তাহলে একই নীতির নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব।
ন্যূনতম করের ক্ষেত্রে সমন্বয়ের বিষয়টিও তাই গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায়ীদের জন্য অতিরিক্ত ন্যূনতম কর ভবিষ্যৎ করদায়ের সঙ্গে সমন্বয় বা অতিরিক্ত অর্থ ফেরতের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কারণ একটি প্রতিষ্ঠান কোনো বছরে ন্যূনতম কর হিসেবে বেশি অর্থ দিয়ে ফেললেও যদি সেই অর্থ বাস্তবে ফেরত বা সমন্বয় করা না যায়, তাহলে সেটি ব্যবসার জন্য কার্যত অতিরিক্ত ব্যয়ে পরিণত হয়। বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন ও করবিশেষজ্ঞ দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যার সমাধান দাবি করে আসছেন। ২০২৬ সালে সরকারের পক্ষ থেকেও অতিরিক্ত করের অর্থ ফেরত বা সমন্বয়ের কাঠামো নিয়ে উদ্যোগের আলোচনা সামনে এসেছে।
তাই ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য বর্তমান পরিস্থিতির আসল প্রশ্ন শুধু ‘১ শতাংশ কর বেশি কি না’—তা নয়। প্রশ্ন হলো, একজন উদ্যোক্তা যে অর্থ বিক্রি থেকে সংগ্রহ করছেন, তার কতটা আসলে তাঁর আয় এবং কতটা পণ্য কেনা, কর্মচারী, ভাড়া, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ মেটাতে চলে যাচ্ছে। টার্নওভার বড় হলেও মুনাফা সামান্য হলে একই করহার বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আবার করের ভিত্তি যদি শুধু মুনাফা হয়, তাহলে প্রকৃত আয় গোপনের সুযোগ তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। ফলে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি করব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে কর ফাঁকি রোধ হবে, কিন্তু সৎ ও কম-মার্জিনের ব্যবসায়ীরা মূলধন হারিয়ে ফেলবেন না।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে তাই ন্যূনতম করের কাঠামো নিয়ে আরও সূক্ষ্ম নীতিগত আলোচনা প্রয়োজন। ব্যবসার আকার অনুযায়ী কর নেওয়া সহজ হতে পারে, কিন্তু সব ব্যবসার লাভের হার এক নয়। কোনো খাতে ১ শতাংশ টার্নওভার কর সামলানো সম্ভব হলেও অন্য কোনো খাতে তা ব্যবসার বড় অংশের মুনাফা কেড়ে নিতে পারে। ফলে করহার নির্ধারণের পাশাপাশি খাতভিত্তিক মুনাফার বাস্তবতা, ব্যবসার আকার, লোকসানের বছর, নগদ প্রবাহ এবং অতিরিক্ত কর সমন্বয়ের কার্যকারিতা—সবকিছুকে বিবেচনায় নিতে হবে। তা না হলে রাজস্ব বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া একটি নীতি উল্টো ছোট উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ, সম্প্রসারণ ও আনুষ্ঠানিক করব্যবস্থায় থাকার আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে। আর সেটি শেষ পর্যন্ত শুধু ব্যবসায়ীর সমস্যা থাকবে না; এর প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থান, পণ্যের দাম এবং দেশের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশের ওপরও।

