বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আমদানি ও রপ্তানির ব্যবধান আবারও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে দেশের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ১৬.২৪ বিলিয়ন ডলার, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪.১৬ বিলিয়ন ডলারে। গত জুনে জাতীয় সংসদে এই তথ্য তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুকতাদির বলেন, আগের সরকারের নীতিগত দুর্বলতার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলার সংকটও ঘাটতি বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে জ্বালানি, খাদ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং রপ্তানি বৃদ্ধির ধীর গতি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে।
তবে সংখ্যাটি দেখলেই সমস্যার পুরো চিত্র বোঝা যায় না। বাণিজ্য ঘাটতি মূলত তখনই তৈরি হয়, যখন একটি দেশ বিদেশে পণ্য বিক্রি করে যত ডলার আয় করে, পণ্য আমদানিতে তার চেয়ে বেশি ডলার ব্যয় করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমদানির বড় অংশই আবার অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য—জ্বালানি, শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্য, যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও খাদ্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ আমদানি তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯.৮ শতাংশ বেড়েছে এবং পেট্রোলিয়াম পণ্যের আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৮৫.২ শতাংশ। বিপরীতে ভোক্তা পণ্যের আমদানি ১৩.৮ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ বর্তমান ঘাটতির একটি বড় অংশ সাধারণ মানুষের বিলাসী ভোগের কারণে নয়; শিল্প ও উৎপাদন সচল রাখতেও বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ বিদেশি পণ্য কিনতে হচ্ছে।
সমস্যার দ্বিতীয় দিকটি রপ্তানির কাঠামো। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকনির্ভর রপ্তানি মডেলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তৈরি পোশাক বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের বড় শক্তি হলেও কয়েকটি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের রপ্তানি আয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। নতুন বাজারে প্রবেশ, উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর রপ্তানি বাড়ানোর সক্ষমতা এখনও সীমিত। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুনে রপ্তানি ৪.২ বিলিয়ন ডলারে উঠে শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন করলেও পুরো অর্থবছরের পণ্য রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় সামান্য কমে প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। অর্থাৎ একটি ভালো মাস দিয়ে বছরের দুর্বল রপ্তানি প্রবণতা পুরোপুরি পাল্টানো সম্ভব হয়নি।
দেশের বাণিজ্য ঘাটতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অবশ্য দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে স্পষ্ট। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৫৮টি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতিতে ছিল। সবচেয়ে বড় ঘাটতি হয়েছে চীনের সঙ্গে। দেশটি থেকে বাংলাদেশ ১৮.৫৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করলেও রপ্তানি করেছে মাত্র ৬৯৪.৪৯ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। ফলে এক দেশেই ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭.৮৭ বিলিয়ন ডলারে। ভারতের সঙ্গেও বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ১.৭৬ বিলিয়ন ডলার, বিপরীতে আমদানি ৯.৬২ বিলিয়ন ডলার—ঘাটতি ৭.৮৬ বিলিয়ন ডলার। ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গেও ঘাটতি ছিল ৩.৫৮ বিলিয়ন ডলার।
এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, চীন বা ভারত থেকে এত বেশি আমদানি করাই কি মূল সমস্যা? পুরোপুরি নয়। কারণ বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে এসব আমদানির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। চীন থেকে আসা যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক পণ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনী পণ্যের একটি বড় অংশ দেশের উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। তাই আমদানি কমিয়ে কৃত্রিমভাবে ঘাটতি কমানো হলে উল্টো কারখানার উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আসল চ্যালেঞ্জ হলো—যে পণ্যগুলো বাংলাদেশ বিদেশ থেকে কিনছে, সেগুলোর কিছু দেশে প্রতিযোগিতামূলকভাবে উৎপাদন করা এবং একই সঙ্গে বিদেশি বাজারে আরও বেশি মূল্য সংযোজিত পণ্য বিক্রি করা।
এই জায়গাতেই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা সবচেয়ে বেশি। দেশে শিল্পায়ন বাড়লেও উৎপাদনের অনেক পর্যায়ে বিদেশি কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা রয়ে গেছে। ফলে রপ্তানি বাড়লেও তার সঙ্গে আমদানির প্রয়োজনও বাড়ে। একটি পোশাক কারখানা বেশি পোশাক রপ্তানি করলে কাপড়, সুতা, রাসায়নিক, যন্ত্রাংশ বা অন্যান্য উপকরণের আমদানি বাড়তে পারে। অর্থাৎ রপ্তানি বৃদ্ধির প্রতিটি ডলার পুরোপুরি দেশের ভেতরে থাকে না। স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদন, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা না গেলে রপ্তানি যত বাড়বে, আমদানির চাপও ততটা থেকে যেতে পারে।
তবে পরিস্থিতির আরেকটি দিকও আছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম কয়েক মাসে বাণিজ্য ঘাটতি আবার দ্রুত বাড়ার তথ্য সামনে এসেছিল। জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ঘাটতি ১৩.৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে আগের বছরের একই সময়ের ১১.৭৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ পাঁচ বছরের পুরোনো হিসাবের পাশাপাশি বর্তমান অর্থবছরেও আমদানি-রপ্তানির ব্যবধান নিয়ে সতর্ক থাকার কারণ রয়েছে।
তবে বাণিজ্য ঘাটতি নিজেই সবসময় অর্থনীতির জন্য খারাপ—এমন ধারণাও ঠিক নয়। একটি দেশ যদি যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করে নতুন কারখানা তৈরি করে, উৎপাদন বাড়ায় এবং পরে সেই উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করে, তাহলে সাময়িক বাণিজ্য ঘাটতি ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করতে পারে। সমস্যা তখনই গুরুতর হয়, যখন আমদানির বড় অংশ উৎপাদনশীল বিনিয়োগে না গিয়ে ভোগে চলে যায়, অথচ রপ্তানি আয় সেই হারে বাড়ে না। বাংলাদেশের জন্য তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু ‘কত ডলারের আমদানি হচ্ছে’ নয়; বরং কী আমদানি হচ্ছে, সেই আমদানি দেশের উৎপাদন কতটা বাড়াচ্ছে এবং সেই উৎপাদন থেকে ভবিষ্যতে কত ডলার আয় করা সম্ভব হচ্ছে।
এই কারণেই বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর সবচেয়ে টেকসই পথ আমদানি বন্ধ করা নয়, বরং রপ্তানির সক্ষমতা বাড়ানো। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া ও জুতা, ওষুধ, কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস, প্লাস্টিক, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নতুন বাজার খুঁজে বের করা এবং বিদ্যমান বাজারে বেশি মূল্য সংযোজন করা জরুরি। সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ৫৫.৩ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বড় বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগ সফল হলে রপ্তানি আয় বাড়িয়ে আমদানি-রপ্তানির ব্যবধান কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির সমস্যাটি ডলার সংকটের চেয়েও বড় একটি কাঠামোগত প্রশ্ন। দেশ কতটা উৎপাদন করতে পারছে, কতটা মূল্য সংযোজন করতে পারছে এবং বিশ্ববাজারে কতটা বৈচিত্র্যময় পণ্য বিক্রি করতে পারছে—তার ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতের বাণিজ্য ভারসাম্য। পাঁচ বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার বাড়া ঘাটতি তাই শুধু একটি হিসাবের সংখ্যা নয়; এটি বাংলাদেশের শিল্প ও রপ্তানি কাঠামোর সামনে থাকা একটি সতর্ক সংকেত। আমদানি কমিয়ে সাময়িকভাবে ঘাটতি নামানো সম্ভব, কিন্তু টেকসই সমাধান আসবে তখনই, যখন বাংলাদেশ বিদেশ থেকে শুধু পণ্য কেনার বাজার না থেকে আরও বেশি মূল্য সংযোজিত পণ্য বিক্রি করার দেশে পরিণত হবে।

