চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখন আর শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না দুই দেশ। বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্প উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। শনিবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত China-Bangladesh Ceramics Annual Conference 2026-এ বাংলাদেশ ও চীনের শিল্পনেতারা প্রযুক্তি হস্তান্তর, জ্ঞান বিনিময় এবং উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। বিশেষ করে বাড়তে থাকা জ্বালানি ব্যয় ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মধ্যে স্থানীয় শিল্পকে আরও দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করতে চীনের প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই উদ্যোগের গুরুত্ব বোঝা যায় বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বর্তমান বাণিজ্য সম্পর্ক দেখলে। চীন টানা ১৬ বছর ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। কিন্তু এই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো বাণিজ্যের ভারসাম্য। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে ১৮.৫৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করলেও দেশটিতে রপ্তানি করেছে মাত্র ৬৯৪.৪৯ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। ফলে এক দেশেই বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭.৮৭ বিলিয়ন ডলারে।
এই বিশাল ব্যবধান কমানোর প্রচলিত পথ হতে পারে চীন থেকে আমদানি কমানো। কিন্তু বাংলাদেশের শিল্প বাস্তবতায় সেটি সহজ সমাধান নয়। চীন থেকে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও শিল্প-উপকরণ আমদানি করে। এসব পণ্য আবার দেশের পোশাক, টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিকস, নির্মাণ এবং অন্যান্য উৎপাদন খাতে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ চীনা আমদানির একটি বড় অংশ বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গেই যুক্ত। তাই আমদানি কমিয়ে ঘাটতি কমানোর চেয়ে চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিকে বাংলাদেশে উৎপাদন বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করা তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর কৌশল হতে পারে।
সরকারও এখন সেই পথেই এগোতে চাইছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুকতাদির বলেছেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশে আরও চীনা বিনিয়োগ আনা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর যুক্তি হলো, চীনা বিনিয়োগ বাড়লে বাংলাদেশে উৎপাদন বাড়বে, উৎপাদিত পণ্য চীনের বাজারে রপ্তানি করা যাবে এবং একই সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতিও কমতে পারে। এ উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামে ৮০০ একর জমিতে চীনা শিল্পপার্ক স্থাপনের সিদ্ধান্তের কথাও তিনি জানিয়েছেন।
এরই মধ্যে সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণও ছোট নয়। জুনে চীন সফরের সময় ১২টি চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে মোট ৯.২১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন, গ্যাস অনুসন্ধান, মংলা বন্দরের অর্থনৈতিক অঞ্চল, বৈদ্যুতিক স্মার্ট মিটার, কোল্ড-চেইন লজিস্টিকস, পুনর্ব্যবহৃত তুলা ও সুতা, লিথিয়াম ব্যাটারি, ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, রেলওয়ে কোচ সংযোজন, মহাসড়ক এবং শিক্ষা খাত রয়েছে। অর্থাৎ সম্ভাব্য বিনিয়োগের বড় অংশই এমন খাতে, যেখানে প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রযুক্তি হস্তান্তরের সম্ভাব্য সুফল সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে দেখা যায় উৎপাদন খাতে। শনিবারের সিরামিক সম্মেলনে চীনা ও বাংলাদেশি শিল্পনেতারা শুধু বিনিয়োগের কথা বলেননি; তারা প্রযুক্তি ও জ্ঞান ভাগাভাগির ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশের সিরামিক শিল্পে চীনা দক্ষতা কাজে লাগিয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, মান উন্নত করা এবং জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। শিল্পনেতারা বৈদ্যুতিক কিলন ও হাইড্রোজেন-সমৃদ্ধ হিটিং সিস্টেমের মতো বিকল্প প্রযুক্তির কথাও তুলে ধরেছেন।
এখানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো কম খরচে বেশি উৎপাদন। আধুনিক যন্ত্রপাতি, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা, শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা স্থানীয় কারখানার উৎপাদন খরচ কমাতে পারে। এতে দেশীয় বাজারে পণ্যের প্রতিযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশি পণ্যের অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে। বিশেষ করে পোশাকের বাইরে ইলেকট্রনিকস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, সিরামিক, চামড়া, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব শিল্পে এর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে এখানেই একটি বড় সতর্কতার জায়গা আছে। চীনা বিনিয়োগ এলেই প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশি শিল্পে ছড়িয়ে পড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করলেই যদি মূল প্রযুক্তি, গবেষণা, ব্যবস্থাপনা ও উচ্চমূল্যের কাজ বিদেশেই থেকে যায়, তাহলে বাংলাদেশের লাভ মূলত শ্রম ও জমি ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। প্রকৃত সুফল পেতে হলে স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ, স্থানীয় সরবরাহকারীদের সঙ্গে সংযোগ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ভাগাভাগি এবং স্থানীয়ভাবে কিছু গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।
এ কারণেই বিনিয়োগের পরিমাণের পাশাপাশি বিনিয়োগের মান গুরুত্বপূর্ণ। জুনে বেইজিংয়ে BIDA আয়োজিত Invest Bangladesh অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ চীনা কোম্পানিগুলোকে দেশের উৎপাদন ও রপ্তানি মূল্যশৃঙ্খলে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সেখানে টেক্সটাইল ও পোশাক, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ইলেকট্রনিকস ও আইটি, ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা, অটোমোটিভ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে তুলে ধরা হয়। একই অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের Chinese Economic and Industrial Zone এবং মংলা Port Economic Zone নিয়ে চুক্তিও হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চীনের বাজার। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে চীনের কাছ থেকে ১০০ শতাংশ ট্যারিফ লাইনে শূন্য-শুল্ক সুবিধা পাওয়ার কথা তুলে ধরেছে। কিন্তু সেই সুবিধা ব্যবহার করে বাংলাদেশ চীনে যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করছে, তা আমদানির তুলনায় এখনও খুবই কম। তাই সমস্যা শুধু শুল্ক নয়; পণ্যের বৈচিত্র্য, মান, বাজারসংযোগ এবং চীনা ভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন সক্ষমতার ঘাটতিও বড় বাধা। বাংলাদেশ সরকারের বেইজিং দূতাবাসও বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে export basket diversification, non-tariff barriers এবং sanitary ও phytosanitary বাধা মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।
বাংলাদেশ যদি চীনা বিনিয়োগকে শুধু ‘বিদেশি মূলধন’ হিসেবে দেখে, তাহলে এর সুফল সীমিত হতে পারে। কিন্তু যদি সেই বিনিয়োগের সঙ্গে স্থানীয় শিল্পের প্রযুক্তি উন্নয়ন, দক্ষ কর্মী তৈরি, স্থানীয় সরবরাহকারী গড়ে তোলা এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদনকে যুক্ত করা যায়, তাহলে একই বিনিয়োগ দেশের শিল্প কাঠামো বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। বিশেষ করে চীনা কোম্পানিগুলো যদি নিজেদের বৈশ্বিক supply chain-এর কিছু অংশ বাংলাদেশে স্থানান্তর করে, তাহলে বাংলাদেশ শুধু চীনের বাজারেই নয়, তৃতীয় দেশের বাজারেও রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ পেতে পারে।
তবে এর জন্য বাংলাদেশের নিজস্ব প্রস্তুতিও জরুরি। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ, দ্রুত কাস্টমস ও বন্দরসেবা, জমি ও অনুমোদন পাওয়ার সহজ ব্যবস্থা, দক্ষ শ্রমিক এবং নীতির ধারাবাহিকতা ছাড়া বড় বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা কঠিন। বিশেষ করে সাম্প্রতিক শিল্প সম্মেলনে জ্বালানি ব্যয় ও সরবরাহের সমস্যা নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, সেটি দেখায়—প্রযুক্তি এলেও ব্যবসার মৌলিক পরিবেশ ঠিক না থাকলে তার পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না।
সবশেষে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক সম্পর্কের সাফল্য মাপার আসল মানদণ্ড হওয়া উচিত শুধু কত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এলো তা নয়। দেখতে হবে—কত নতুন কারখানা হলো, কত প্রযুক্তি স্থানীয় হলো, কত দক্ষ কর্মী তৈরি হলো, কত পণ্য বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়ে বিদেশে গেল এবং চীনের সঙ্গে ১৭.৮৭ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কতটা কমল।
চীন যদি বাংলাদেশের জন্য শুধু বড় আমদানির উৎস না থেকে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উৎপাদনের অংশীদারে পরিণত হয়, তাহলে এই সম্পর্ক দেশের শিল্পায়নের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগকে বাস্তব অর্থনৈতিক লাভে পরিণত করার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশেরই—বিনিয়োগ আনা সহজ হতে পারে, কিন্তু বিনিয়োগ থেকে প্রযুক্তি ও মূল্য সংযোজন দেশে ধরে রাখাই হবে আসল পরীক্ষা।

