চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে মূলত আমদানি-নির্ভর। এবার সেই সম্পর্ককে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উৎপাদনের দিকে নেওয়ার চেষ্টা করছে দুই দেশ। বাংলাদেশের জন্য বড় প্রশ্ন হলো—চীনা বিনিয়োগ কি শুধু আমদানি বাড়াবে, নাকি দেশের শিল্প ও রপ্তানির সক্ষমতাও বাড়াবে?
চীন টানা বহু বছর ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। কিন্তু দুই দেশের বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। বাংলাদেশ চীন থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করলেও সেখানে রপ্তানি তুলনামূলকভাবে খুব কম। এই ব্যবধান কমানোর সহজ পথ হতে পারে চীন থেকে আমদানি কমানো। কিন্তু বাস্তবে সেটি বাংলাদেশের জন্য খুব সহজ নয়। কারণ চীন থেকে আসা পণ্যের বড় একটি অংশ কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও শিল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণ, যা দেশের পোশাক, বস্ত্র, ইলেকট্রনিকস, নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবহার হচ্ছে। ফলে শুধু আমদানি কমানোর চেষ্টা করলে দেশের উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বরং চীনের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিকে বাংলাদেশে উৎপাদন বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করা গেলে একই সম্পর্ক থেকে বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
সরকারও এখন সেই দিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। চীনা বিনিয়োগ বাড়িয়ে বাংলাদেশে উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। চীনা কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকেও বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতে বড় বিনিয়োগের আগ্রহ দেখা গেছে। বর্জ্য থেকে জ্বালানি, গ্যাস অনুসন্ধান, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, ঠান্ডা সংরক্ষণ ব্যবস্থা, ব্যাটারি, ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, রেলওয়ে সরঞ্জাম, অবকাঠামো ও শিক্ষা—বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে। চট্টগ্রামে চীনা শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগও এই পরিবর্তনের অংশ। এর ফলে শুধু নতুন কারখানা তৈরি নয়, আধুনিক যন্ত্রপাতি, উৎপাদন পদ্ধতি এবং ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশে আসতে পারে। বিশেষ করে সিরামিক, ইলেকট্রনিকস, হালকা প্রকৌশল, চামড়া, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবেশবান্ধব শিল্পে চীনের প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে কম খরচে ভালো মানের পণ্য উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। এতে দেশের বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি রপ্তানির নতুন দরজাও খুলতে পারে।
তবে বিদেশি বিনিয়োগ এলেই প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশে ছড়িয়ে পড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কোনো চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে কারখানা করলেও যদি মূল প্রযুক্তি, গবেষণা, নকশা ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজ বিদেশেই থাকে, তাহলে বাংলাদেশের লাভ সীমিত হয়ে যেতে পারে। তাই বিনিয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ, দেশীয় সরবরাহকারী তৈরি, প্রযুক্তি ভাগাভাগি এবং স্থানীয়ভাবে গবেষণা ও উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে চীনের বাজারেও বাংলাদেশকে আরও বেশি পণ্য পাঠাতে হবে। শুল্কসুবিধা থাকলেও শুধু সেটি কাজে লাগালেই রপ্তানি বাড়বে না। পণ্যের বৈচিত্র্য, মান, বাজারসংযোগ এবং চীনা ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ হতে পারে চীনা কোম্পানিগুলোর বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়া। চীনের কোনো প্রতিষ্ঠান যদি তার উৎপাদনের একটি অংশ বাংলাদেশে নিয়ে আসে, তাহলে বাংলাদেশ শুধু চীনে নয়, অন্য দেশেও পণ্য রপ্তানির সুযোগ পেতে পারে।
এর জন্য অবশ্য বাংলাদেশের নিজের প্রস্তুতিও জরুরি। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস, দ্রুত বন্দর ও কাস্টমসসেবা, জমি ও অনুমোদন পাওয়ার সহজ ব্যবস্থা, দক্ষ শ্রমিক এবং নীতির ধারাবাহিকতা ছাড়া বড় বিনিয়োগ ধরে রাখা কঠিন। বিশেষ করে জ্বালানি ব্যয় ও সরবরাহ নিয়ে শিল্প উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধু বিনিয়োগের প্রস্তাব এলেই শিল্পায়ন হবে না। তাই চীনের সঙ্গে সম্পর্কের সাফল্য শুধু কত টাকা বা ডলারের বিনিয়োগ এলো, তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। দেখতে হবে কত নতুন কারখানা তৈরি হলো, কত প্রযুক্তি দেশে এলো, কত দক্ষ কর্মী তৈরি হলো এবং কত বেশি পণ্য বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়ে বিদেশে গেল।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যদি শুধু আমদানি থেকে সরে গিয়ে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উৎপাদনের অংশীদারত্বে পৌঁছায়, তাহলে এটি দেশের শিল্পায়নের জন্য বড় সুযোগ হতে পারে। তবে সেই সুযোগকে বাস্তব লাভে পরিণত করতে হলে বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তি ও মূল্য সংযোজনও বাংলাদেশে ধরে রাখতে হবে।

