আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের খরচ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। মাত্র দুই মাসে কয়েকটি পথে জাহাজ ভাড়া দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ব্যবসা ও পণ্যের দামে পড়তে পারে।
চট্টগ্রাম থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন বন্দরে পণ্য পাঠাতে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই মাস আগে চট্টগ্রাম থেকে নিউ জার্সিতে একটি কনটেইনার পাঠাতে যেখানে প্রায় ৩ হাজার ৫০ ডলার খরচ হতো, বর্তমানে একই পথে একটি প্রতিষ্ঠিত জাহাজ কোম্পানির মাধ্যমে খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ হাজার ২৭৫ ডলারে। অর্থাৎ পরিবহন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৭১ শতাংশ। অন্যদিকে চট্টগ্রাম থেকে উত্তর ইউরোপের পথে ৪০ ফুটের একটি কনটেইনারের মূল সমুদ্রভাড়া জুলাইয়ের মাঝামাঝি ৩ হাজার ৩৬ ডলার থেকে আগস্টের শুরুতে বেড়ে ৫ হাজার ৩৬ ডলারে উঠেছে। ১৫ আগস্ট থেকে সেটি আরও ১ হাজার ডলার বেড়ে ৬ হাজার ৩৬ ডলারে যাওয়ার কথা রয়েছে।
এই বাড়তি খরচের পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। ইরানকে ঘিরে নতুন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তা এবং লোহিত সাগরে নিরাপত্তাঝুঁকি জাহাজ চলাচলের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। তেলের দাম বাড়ায় জাহাজের জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে, একই সঙ্গে যুদ্ধঝুঁকির কারণে বিমা ও নিরাপত্তা ব্যয়ও বাড়ছে। লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল এড়িয়ে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথে চলতে হলে সময় ও জ্বালানি দুটোই বেশি লাগে। এতে বিশ্বে জাহাজের সংখ্যা একই থাকলেও কার্যকরভাবে পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা কমে যায়। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে কনটেইনার ও জাহাজের জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে এবং ভাড়া আরও বাড়ে।
বাংলাদেশের জন্য এর প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের রপ্তানি শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে পণ্য পাঠাতে সমুদ্রপথের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে এখন কনটেইনার পরিবহনের খরচ পণ্যের মূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে থাকা কিছু রপ্তানিকারক তাৎক্ষণিক ধাক্কা কিছুটা সামলাতে পারলেও নতুন করে পণ্য পাঠাতে যাওয়া ব্যবসায়ীরা বেশি সমস্যায় পড়ছেন। কনটেইনারের সংকট ও বুকিং পেতে দেরি হওয়ায় পণ্য পাঠানোর সময়ও বাড়ছে। এতে ক্রেতার কাছে সময়মতো পণ্য পৌঁছানো কঠিন হচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ রপ্তানি আদেশ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বাড়তি জাহাজ ভাড়ার পুরো চাপ শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে। তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে অধিকাংশ রপ্তানি পণ্য ‘এফওবি’ পদ্ধতিতে পাঠানো হয়, যেখানে সাধারণত পরিবহন ব্যয় বিদেশি ক্রেতার বহন করার কথা। কিন্তু ভাড়া অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে ক্রেতারা নতুন আদেশ কমিয়ে দিতে পারেন কিংবা পোশাকের দাম কমানোর জন্য বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ দিতে পারেন। ফলে পরিবহন ব্যয় সরাসরি ক্রেতা বহন করলেও এর পরোক্ষ চাপ পড়ে বাংলাদেশের উৎপাদক ও রপ্তানিকারকের ওপর। অন্যদিকে আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রে বাড়তি পরিবহন ব্যয় সরাসরি আমদানিকারকের মোট খরচ বাড়ায়। সেই খরচ ব্যবসায়ী নিজের মুনাফা থেকে বহন না করলে ধীরে ধীরে তা পাইকারি ও খুচরা বাজারে পণ্যের দামে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তবে জাহাজ ভাড়া দ্বিগুণ হলেই পণ্যের দামও দ্বিগুণ হবে—এমন নয়। কারণ একটি পণ্যের চূড়ান্ত দামের মধ্যে জাহাজ ভাড়া ছাড়াও কাঁচামালের দাম, ডলারের বিনিময় হার, শুল্ক, কর, বন্দর খরচ, স্থানীয় পরিবহন ও ব্যবসায়িক মুনাফার মতো আরও অনেক বিষয় থাকে। কিন্তু পরিবহন ব্যয় যদি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে থাকে, তাহলে আমদানি ব্যয় ও উৎপাদন খরচের ওপর চাপ বাড়বেই। সামনে চীনের জাতীয় দিবস ঘিরে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে পণ্য পরিবহনের চাপ বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে জাহাজের জায়গা ও কনটেইনারের সংকট আরও তীব্র হলে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য পরিবহন ব্যয়ের এই চাপ সাময়িক না হয়ে দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত বড় উদ্বেগ শুধু জাহাজ ভাড়া বাড়া নয়, বরং এর সঙ্গে রপ্তানি প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় ও বাজারদামের ওপর একসঙ্গে চাপ তৈরি হওয়া। ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এই বাড়তি পরিবহন ব্যয় বাংলাদেশের বাণিজ্যের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

