বাংলাদেশ আবারও মিয়ানমারের দিকে তাকাচ্ছে প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে। দেশের শিল্পখাত ও বিদ্যুৎ উৎপাদন যখন দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকটে চাপে রয়েছে, তখন সীমান্ত পেরিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে মিয়ানমার থেকে গ্যাস আনার পুরোনো পরিকল্পনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তবে এই উদ্যোগ শুধু একটি নতুন প্রকল্পের সম্ভাবনা নয়, বরং প্রায় তিন দশক আগে হারিয়ে যাওয়া একটি সুযোগের স্মৃতিও ফিরিয়ে এনেছে। একসময় বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারতের মধ্যে গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের যে পরিকল্পনা হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হলে আজকের জ্বালানি পরিস্থিতি হয়তো ভিন্ন হতে পারত। কিন্তু নানা রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক জটিলতায় সেই সুযোগ শেষ পর্যন্ত হাতছাড়া হয়। পরে মিয়ানমারের গ্যাস উন্নয়নে চীন এগিয়ে আসে।
এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এবার সেই পুরোনো সুযোগকে নতুন বাস্তবতায় কাজে লাগাতে পারবে?
জ্বালানি সংকটে নতুন অনুসন্ধান
২০২৬ সালের ২ আগস্ট সচিবালয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত ইউ কিয়াও সোয়ে মোয়ের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আমদানির প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
বৈঠকে দুই দেশ এ বিষয়ে আরও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়। বাংলাদেশ-মিয়ানমার যৌথ কারিগরি কমিটির মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাই এবং ভবিষ্যতে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের বিষয়েও আলোচনা হয়।
বাংলাদেশের এই আগ্রহের পেছনে রয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। বর্তমানে দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন কমে প্রায় প্রতিদিন ১৬৫ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে, যা ২০১৭ সালের তুলনায় প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট কম। অন্যদিকে শিল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে।
২০২৬ সালের ২১ জুলাই একটি অগ্নিকাণ্ডের কারণে দেশের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের গ্যাসের চাহিদা উল্লেখযোগ্য এবং মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের বিষয়ে দেশটি আগ্রহী।
তবে বর্তমানে এটি শুধুমাত্র একটি প্রাথমিক আলোচনা। গ্যাসের পরিমাণ, মূল্য নির্ধারণ, পাইপলাইনের পথ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অর্থায়নের বিষয়গুলো এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
তিন দশক আগের হারানো সম্ভাবনা
মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশ হয়ে ভারতে গ্যাস নেওয়ার ধারণার শুরু হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। সে সময় বাংলাদেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মোহনা হোল্ডিংস মিয়ানমারের গ্যাসক্ষেত্র থেকে বাংলাদেশ হয়ে ভারতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য একটি পাইপলাইন নির্মাণের প্রস্তাব দেয়।
তখন বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের বড় অংশ মনে করতেন, দেশের নিজস্ব গ্যাস মজুত বহু বছর ধরে চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হবে। ফলে এই প্রস্তাব তখন খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি।
পরবর্তীতে ২০০০ সালের শুরুতে পরিস্থিতি বদলে যায়। ভারতের বড় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলো মিয়ানমারের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ শুরু করে। ভারতের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে মিয়ানমারের নতুন আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
২০০৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার নীতিগতভাবে একটি ত্রিপক্ষীয় পাইপলাইন প্রকল্পে সম্মত হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, পাইপলাইনটি ভারতের ত্রিপুরা অঞ্চল থেকে বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে দেশের ভেতর দিয়ে উত্তর রাজশাহী সীমান্ত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে যাওয়ার কথা ছিল।
বাংলাদেশ অংশে পাইপলাইনের দৈর্ঘ্য হওয়ার কথা ছিল প্রায় ২৯০ কিলোমিটার। পুরো প্রকল্পের মাধ্যমে মিয়ানমারের সমুদ্রভিত্তিক গ্যাসক্ষেত্রগুলো ভারতের বিতরণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল।
প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার। এর বড় অংশের অর্থায়ন ভারতের করার কথা ছিল। বাংলাদেশ অংশে প্রায় ৩৫ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা ছিল।
বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি মার্কিন ডলার পরিবহন ফি, এককালীন প্রায় ১০ কোটি মার্কিন ডলার পথ ব্যবহারের মূল্য এবং ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিবছর আরও ২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার পাওয়ার সুযোগ পেত। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস নেওয়ার অধিকারও বাংলাদেশের থাকার কথা ছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি আর এগোয়নি।
শর্ত, আলোচনা ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা
বাংলাদেশ পাইপলাইন প্রকল্পের সঙ্গে আরও কিছু আঞ্চলিক সুবিধার বিষয় যুক্ত করতে চেয়েছিল। এর মধ্যে ছিল নেপাল ও ভুটান থেকে ভারতের মাধ্যমে বিদ্যুৎ আনার সুযোগ, ভারত হয়ে নেপাল ও ভুটানে পণ্য পরিবহনের সুবিধা এবং দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর ব্যবস্থা।
সে সময় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ভারসাম্য ছিল ব্যাপকভাবে অসম। বাংলাদেশ ভারত থেকে প্রায় ১৮০ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করলেও রপ্তানি করত মাত্র প্রায় ১৪ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য।
ভারত এসব বিষয়কে গ্যাস পাইপলাইন আলোচনার অংশ হিসেবে নিতে রাজি হয়নি। ফলে ২০০৬ সালে বাংলাদেশ প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায়।
এরপর ভারত বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করে। বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে মিজোরাম, ত্রিপুরা, আসাম, শিলিগুড়ি ও কলকাতা হয়ে পাইপলাইন নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। তবে এতে পথ প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ হতো এবং নির্মাণ ব্যয় প্রায় ২৫০ কোটি মার্কিন ডলার বাড়ত।
এ ছাড়া আসাম ও গারো বিদ্রোহী অঞ্চলসংক্রান্ত নিরাপত্তা ঝুঁকিও বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়ায়।
চীনের আগমন এবং মিয়ানমারের সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ যখন প্রকল্প থেকে সরে যায়, তখন মিয়ানমার অপেক্ষা করেনি। ২০০৮ সালের শেষ দিকে দেশটি চীনের সঙ্গে বড় ধরনের গ্যাস উন্নয়ন চুক্তি করে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠান দেউউ ইন্টারন্যাশনাল, যারা শুয়ে, শুয়েফু ও মিয়া গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছিল, চীনের জাতীয় পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের সঙ্গে এসব ক্ষেত্র উন্নয়নে চুক্তি করে।
এই প্রকল্পে প্রায় ৫৬০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করা হয়।
ফলে মিয়ানমারের গ্যাস সম্পদ আঞ্চলিক জ্বালানি বাজারে নতুন অবস্থান তৈরি করে এবং চীন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়।
দ্বিতীয় সুযোগ, কিন্তু নতুন বাস্তবতা
২০২৬ সালের নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী মিয়ানমারের গ্যাসক্ষেত্র থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ২০০৫ সালের তুলনায় অনেক বেশি জটিল।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলের বড় অংশ বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে পাইপলাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। ২০১৭ সালের পর মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা এখনো বাংলাদেশে অবস্থান করছে। তাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক এখনো জটিল।
আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগের মামলাও চলমান রয়েছে।
কেউ কেউ মনে করছেন, মিয়ানমারের সঙ্গে বড় ধরনের জ্বালানি সহযোগিতা বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে। আবার অন্য একটি মত হলো, অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হলে তা আলোচনার নতুন সুযোগও তৈরি করতে পারে।
শুধু গ্যাস নয়, আঞ্চলিক সংযোগের সম্ভাবনাও
মিয়ানমার থেকে গ্যাস আনার বিষয়টি শুধু জ্বালানি সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানোর একটি অংশ হতে পারে।
ভারতের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনায় উত্তর-পূর্ব ভারত, পশ্চিমবঙ্গ, চট্টগ্রাম এবং মিয়ানমারের সিত্তে অঞ্চলের মধ্যে পাইপলাইন সংযোগের সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ভারতের সঙ্গে জ্বালানি খাতে বিভিন্ন সহযোগিতা করছে। ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে ভারতীয় তেল করপোরেশন ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন চট্টগ্রামে তরল গ্যাস টার্মিনাল উন্নয়নের বিষয়ে কাজ শুরু করে।
এ ছাড়া ভারতের নুমালিগড় শোধনাগার ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের মধ্যে শিলিগুড়ি থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত জ্বালানি তেল সরবরাহ পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ভবিষ্যৎ জ্বালানি সহযোগিতা চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে।
এবার কি বাংলাদেশ সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মিয়ানমারের গ্যাস বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে পারবে না। একটি আন্তর্জাতিক পাইপলাইন নির্মাণে কয়েক বছর সময় লাগবে। পাশাপাশি মিয়ানমারের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়নও প্রয়োজন।
মিয়ানমারের জ্বালানি মন্ত্রণালয়, বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রমাণিত প্রাকৃতিক গ্যাস মজুত প্রায় ২২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট।
বাংলাদেশের জন্য এটি একটি সম্ভাবনাময় উৎস হতে পারে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, শুধু একটি ভালো ধারণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, গভীর প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
তিন দশক আগে যে সুযোগ হারিয়ে গিয়েছিল, এবার সেটি ফিরে এসেছে নতুন বাস্তবতায়। এখন মূল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এবার সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে?

