বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি আবারও বড় হয়েছে। রপ্তানি প্রায় স্থির থাকলেও আমদানি ব্যয় বাড়ায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঘাটতি তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় ঘাটতি বেড়েছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এ সময়ে বাংলাদেশ প্রায় ৪৩ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় অপরিবর্তিত। বিপরীতে আমদানি বেড়ে হয়েছে ৭১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। এক বছরে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১০ শতাংশের বেশি, যা কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বার্ষিক বৃদ্ধি।
তবে আমদানি বাড়লেই যে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বা উৎপাদন বাড়ছে, বিষয়টি এমন নয়। গবেষণা ও নীতি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান র্যাপিডের চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাকের মতে, সাম্প্রতিক আমদানি বৃদ্ধির সঙ্গে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। শিল্পের কাঁচামালের আমদানিও খুব শক্তিশালী নয়। অর্থাৎ আমদানি বাড়লেও নতুন কারখানা, উৎপাদন সক্ষমতা বা ভবিষ্যতের রপ্তানি বাড়ানোর মতো বিনিয়োগের গতি এখনো তেমন দেখা যাচ্ছে না।
একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য আমদানি বাড়া সবসময় খারাপ খবর নয়। শিল্পের যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও কাঁচামাল আমদানি বাড়লে তা ভবিষ্যতে উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগের জায়গাটি হলো—আমদানি বাড়ছে, অথচ রপ্তানি প্রায় স্থির এবং বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত আমদানিও দুর্বল। ফলে বাড়তি আমদানি থেকে অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতা কতটা বাড়ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ার পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও বড় ভূমিকা রেখেছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে। একই সময়ে পশ্চিমা দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি এবং বিভিন্ন যুদ্ধ ও সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদায় চাপ তৈরি করেছে। সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, এসব বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রভাবেই বাংলাদেশের রপ্তানি ও আমদানির মধ্যে ব্যবধান আরও বেড়েছে।
দেশের ভেতরের চাহিদা বা বিনিয়োগ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার কারণেও যে আমদানি বেড়েছে, এমন প্রমাণও খুব শক্তিশালী নয়। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দীর্ঘদিনের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় থাকায় বড় ধরনের বিনিয়োগ বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে আমদানি বৃদ্ধিকে শুধু অর্থনীতির শক্তিশালী পুনরুদ্ধার হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না।
তবে এই পরিস্থিতির একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। আমদানি স্বাভাবিক পর্যায়ে ফেরার অর্থ হলো, আগের কয়েক বছরের কঠোর আমদানি নিয়ন্ত্রণের পর দেশে খাদ্য, জ্বালানি, প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য ও উৎপাদনের কিছু উপকরণের সরবরাহ বাড়ছে। এতে বাজারে পণ্যের ঘাটতি কমতে পারে এবং প্রতিযোগিতা বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপরও কিছুটা চাপ কমতে পারে। সমস্যা হচ্ছে, এই আমদানি যদি উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ানোর সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল সীমিত থাকবে।
বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও আপাতত বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি। এর অন্যতম কারণ প্রবাসী আয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স রেকর্ড পর্যায়ে উঠে প্রায় ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই অর্থ বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়িয়ে চলতি হিসাবের ঘাটতি সীমিত রাখতে সহায়তা করেছে। একই সময়ে সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনে প্রায় ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন একটি ভিন্ন ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একদিকে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের কারণে বাইরের দিক থেকে স্থিতিশীলতা কিছুটা বেড়েছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি সেই গতিতে ঘুরে দাঁড়ায়নি। র্যাপিডের আবদুর রাজ্জাকের মতে, এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো এই বৈদেশিক স্থিতিশীলতাকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ ও রপ্তানি বৃদ্ধিতে কাজে লাগানো।
এ ক্ষেত্রে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ে সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিকল্প জ্বালানি উৎস বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সিপিডির খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
সব মিলিয়ে, বাণিজ্য ঘাটতি ২৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া একা বাংলাদেশের অর্থনীতির দুর্বলতার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। আসল প্রশ্ন হলো, বাড়তি আমদানি কি নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন তৈরি করছে, নাকি শুধু আমদানি ব্যয় বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে রপ্তানি কেন স্থবির, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো আমদানির গতি এমন খাতে নেওয়া, যা ভবিষ্যতে উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াবে। কারণ রেমিট্যান্স আপাতত বৈদেশিক খাতকে স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ভারসাম্যের জন্য রপ্তানি ও উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই।

