তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানি পণ্য বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার বড় বাজার ব্রাজিলে নিজেদের ঘর ও জীবনযাপনভিত্তিক পণ্য তুলে ধরছে বাংলাদেশ। সাও পাওলোতে শুরু হওয়া ‘হোম শো ব্রাজিল ২০২৬’-এ চারটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান পাট, চামড়া, বাঁশ, মাটির তৈরি পণ্য, ঘর সাজানোর সামগ্রী ও নকশিকাঁথাসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে অংশ নিয়েছে। ১১ আগস্ট শুরু হওয়া তিন দিনের প্রদর্শনীটি চলবে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত। বাংলাদেশ দূতাবাস ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর উদ্যোগে এই অংশগ্রহণের মূল লক্ষ্য ব্রাজিল ও আশপাশের লাতিন আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের নতুন ক্রেতা খুঁজে পাওয়া।
সাও পাওলোর দিস্ত্রিতো আনহেম্বিতে আয়োজিত প্রদর্শনীতে জিহান প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ, মাদার ট্যানারি, রেইনবো জুট ও ক্লাসিক্যাল হ্যান্ডমেড প্রোডাক্টস পাঁচটি স্টলে নিজেদের পণ্য প্রদর্শন করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পণ্যের মধ্যে রয়েছে পাট ও চামড়াজাত সামগ্রী, ঘর সাজানোর পণ্য, প্রাকৃতিক তন্তুর তৈরি ঝুড়ি, বাঁশের সামগ্রী, টেরাকোটা ও অন্যান্য মাটির পণ্য এবং নকশিকাঁথা। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন উদ্বোধনের পর দর্শনার্থীদের আগ্রহ বাড়ে এবং কয়েকটি ব্যবসায়িক বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। সম্ভাব্য ক্রেতারা বাংলাদেশি পণ্যের মান নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন এবং ভবিষ্যতে পণ্য কেনার আগ্রহ দেখিয়েছেন।
বাংলাদেশের জন্য ব্রাজিলের বাজার গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেখানে এখনো দেশের রপ্তানির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে ছোট। ২০২৫ সালে ব্রাজিলের বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮২ মিলিয়ন ডলার। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্রাজিল থেকে প্রায় ২ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। অর্থাৎ দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যে বাংলাদেশের ঘাটতি প্রায় ২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। এই ব্যবধান দেখাচ্ছে, ব্রাজিলের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ এখনো রয়েছে।
তবে এই বাজারে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান মূলত তৈরি পোশাকনির্ভর। বাংলাদেশ-ব্রাজিল বাণিজ্য নিয়ে প্রকাশিত খাতভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ব্রাজিলে বাংলাদেশের রপ্তানির ৯০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক ও বস্ত্রপণ্য থেকে আসে। অর্থাৎ বাংলাদেশের পোশাক খাত ব্রাজিলের বাজারে ইতোমধ্যে একটি জায়গা তৈরি করতে পারলেও পাট, চামড়া, হস্তশিল্প, প্লাস্টিক ও ঘর সাজানোর পণ্যের মতো অন্যান্য খাতের উপস্থিতি এখনো অনেক সীমিত। ফলে হোম শো ব্রাজিলে অংশগ্রহণকে শুধু একটি প্রদর্শনীতে পণ্য দেখানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি ধরা পড়বে না; এটি রপ্তানি ঝুড়িতে নতুন পণ্য যোগ করার একটি প্রচেষ্টাও।
এখানে বাংলাদেশের জন্য পাট ও প্রাকৃতিক তন্তুর পণ্যের বিশেষ সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যের চাহিদা বাড়ায় পাটের ব্যাগ, ঝুড়ি, ঘর সাজানোর সামগ্রী ও অন্যান্য পণ্যের বাজার তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে পাটজাত পণ্য উৎপাদনে অভিজ্ঞ এবং তুলনামূলক কম খরচে এসব পণ্য তৈরি করতে পারে। ব্রাজিলেও পরিবেশবান্ধব পণ্যের জন্য বাজারের সুযোগ রয়েছে বলে বাংলাদেশ-ব্রাজিল বাণিজ্য নিয়ে কাজ করা ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো উল্লেখ করেছে। তবে সম্ভাবনা থাকলেই রপ্তানি বাড়বে না; স্থানীয় ক্রেতার পছন্দ, পণ্যের নকশা, মান, প্যাকেজিং এবং নির্ধারিত মানদণ্ড মেনে চলার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
চামড়া ও হস্তশিল্পের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। ব্রাজিল নিজেই বড় ধরনের চামড়া ও জুতা শিল্পের দেশ হওয়ায় এই বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানকে শুধু কম দাম দিয়ে প্রতিযোগিতা করলে হবে না। মানসম্মত পণ্য, নির্ভরযোগ্য সরবরাহ, পরিবেশ ও শ্রমসংক্রান্ত মানদণ্ড এবং সময়মতো পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা ক্রেতাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ দূরত্বের বাজারে পরিবহন ব্যয় ও পণ্য পৌঁছানোর সময় চূড়ান্ত দামের ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে ব্রাজিলের বাজার ধরতে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের শুধু পণ্য প্রদর্শন নয়, স্থানীয় আমদানিকারক ও পরিবেশকদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরিও জরুরি।
এই প্রদর্শনীতে বাংলাদেশ দূতাবাস ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো আলাদা তথ্যকেন্দ্রও স্থাপন করেছে। সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত নিয়ে বিভিন্ন তথ্য, প্রচারপত্র ও তথ্যচিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। ১২ আগস্ট ‘বাংলাদেশ থেকে ঘর ও জীবনযাপনভিত্তিক পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি’ শীর্ষক একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। এতে ব্রাজিলের ব্যবসায়ী সংগঠন ও বিদেশি ক্রেতাদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে প্রদর্শনীটি শুধু পণ্য দেখানোর জায়গা নয়, সম্ভাব্য ক্রেতা ও বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরির সুযোগও দিচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ হলো ব্রাজিলের বাজারকে শুধু একটি দেশ হিসেবে না দেখে পুরো লাতিন আমেরিকার প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহার করা। তবে এ বাজারে টিকে থাকতে হলে পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি বাজার সম্পর্কে সঠিক ধারণা, স্থানীয় ভাষায় পণ্যের তথ্য, মান ও লেবেলিংয়ের নিয়ম মেনে চলা এবং নির্ভরযোগ্য স্থানীয় অংশীদার তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশ-ব্রাজিল বাণিজ্য নিয়ে ব্যবসায়ী সংগঠনের বিশ্লেষণেও পাট, চামড়া, জুতা, প্লাস্টিকসহ তৈরি পোশাকের বাইরের বিভিন্ন পণ্যে সুযোগের কথা বলা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ব্রাজিলের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বর্তমানে একপেশে। ব্রাজিল থেকে বাংলাদেশের আমদানি কয়েক বিলিয়ন ডলারের হলেও বাংলাদেশ থেকে সেখানে রপ্তানি এখনো কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে। তাই রপ্তানি বাড়ানোর জন্য নতুন বাজার ও নতুন পণ্য খোঁজা এখন শুধু ব্যবসায়ীদের জন্য নয়, দেশের বাণিজ্য ভারসাম্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। হোম শো ব্রাজিলে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ সেই বড় প্রচেষ্টার একটি ছোট ধাপ। এই প্রদর্শনী থেকে যদি স্থায়ী ক্রেতা, নিয়মিত অর্ডার এবং নতুন পরিবেশক তৈরি করা যায়, তাহলে পোশাকের বাইরে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য ব্রাজিল ও বৃহত্তর লাতিন আমেরিকার বাজারে নতুন জায়গা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

