দেশের ছোট-বড় সব খাবারের দোকান ও প্রতিষ্ঠানকে আইনি কাঠামোর আওতায় আনতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। রাস্তার পাশের সাধারণ খাবারের দোকান থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁ, বেকারি কিংবা খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান—সবাইকে এখন থেকে নিবন্ধন কিংবা লাইসেন্স নিতে হবে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) সম্প্রতি জারি করা এক প্রবিধানমালায় এই বিধান রাখা হয়েছে, যা ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর ভিত্তিতে প্রণীত এই নতুন প্রবিধানমালা গত ১৬ জুলাই সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের খাদ্য ব্যবসায়ীদের—যেমন রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের রসের দোকান, পেস্ট্রি শপ, ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান, মোড়কজাত খাবার প্রস্তুতকারক, মিষ্টির দোকান কিংবা দুগ্ধপণ্য উৎপাদনকারীদের—শুধু নিবন্ধন নিলেই চলবে। এমনকি ফুটপাতের পিঠা, পুরি বা পেঁয়াজু বিক্রেতাদেরও এই তালিকার বাইরে রাখা হয়নি। তবে শিশুখাদ্য, রোগীদের বিশেষ খাবার, অর্গানিক পণ্য কিংবা জিনগতভাবে পরিবর্তিত খাদ্যপণ্যের মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ লাইসেন্স নিতে হবে। এর আওতায় আসবে বেসরকারি গুদাম, হিমাগার এবং ভোজ্যতেলের পাইকারি ব্যবসায়ীরাও।
নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ থাকবে তিন বছর, পরে নবায়ন করতে হবে সামান্য অর্থের বিনিময়ে। ব্যবসার ধরন ও আকারভেদে নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার থেকে চল্লিশ হাজার টাকা পর্যন্ত। সরকারি হিসাবে দেশে খাদ্য পরিবেশনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার লাখ, যদিও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি।
এই উদ্যোগ ঘিরে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে হয়রানির আশঙ্কা। বর্তমানে একটি রেস্তোরাঁ বা খাবারের দোকান চালাতে অন্তত ডজনখানেক সরকারি সংস্থার তদারকি ও অনুমোদনের মুখোমুখি হতে হয় ব্যবসায়ীদের। দীর্ঘদিন ধরে তাদের দাবি ছিল, পুরো খাতটিকে একটি একক কর্তৃপক্ষের অধীনে আনা হোক। কিন্তু তা না করে নতুন করে বাধ্যতামূলক নিবন্ধন চালু হওয়ায় অনেকে একে বাড়তি বোঝা হিসেবেই দেখছেন। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এর ফলে একধরনের ‘লাইসেন্স বাণিজ্যের’ সুযোগ তৈরি হতে পারে, যেখানে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাধারণ ব্যবসায়ীরাই।
রাজধানীর একটি ব্যস্ত এলাকায় দুই দশক ধরে ফুটপাতে পরোটা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করা একজন ক্ষুদ্র বিক্রেতা জানান, স্বল্প পুঁজির এই ব্যবসায় নিবন্ধনের নামে বাড়তি চাঁদাবাজি ও হয়রানির শঙ্কায় আছেন তিনি। তার মতে, নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা না থাকায় কম শিক্ষিত ছোট ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়বেন, আর নিবন্ধন না থাকলে দোকান বন্ধ হয়ে গেলে দরিদ্র মানুষের খাবারের সংস্থানই বা কোথায় হবে, সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
রেস্তোরাঁ মালিকদের একটি সংগঠনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব বলছেন, লাইসেন্স নেওয়া বা না নেওয়া—উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবসায়ীদের ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার মতে, শুধু জরিমানার মাধ্যমে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দূর করা সম্ভব নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে হবে। তিনি পোশাকশিল্পের অভিজ্ঞতার উদাহরণ টেনে বলেন, একটি বড় দুর্ঘটনার পর যেভাবে পোশাক কারখানাগুলো নিজস্ব উদ্যোগে মান উন্নয়ন করেছিল, একইভাবে সরকারের সহযোগিতায় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও রেস্তোরাঁ খাতে তদারকিতে অংশ নিতে পারে। এতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমবে এবং খাদ্য বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ততায় প্রক্রিয়াটি আরও কার্যকর হবে বলে মত তার।
বেকারি ব্যবসায় যুক্তদের মধ্যেও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সংশ্লিষ্ট একটি সংগঠনের প্রধান বলেন, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া যদি সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হয় এবং তা প্রকৃতপক্ষে জনস্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়ক হয়, তাহলে ব্যবসায়ীরা তা স্বাগত জানাবেন। তবে প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ঢুকে পড়লে সামান্য ফির জন্য বহুগুণ বাড়তি খরচ গুনতে হতে পারে, যা ছোট বেকারি মালিকদের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়াবে। দেশে বর্তমানে সাত হাজারের বেশি ছোট-বড় বেকারি রয়েছে, যেগুলো এমনিতেই বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতার মুখে কোণঠাসা।
একজন শিল্প গ্রুপের পরিচালক প্রশ্ন তুলেছেন, একই ব্যবসার জন্য একাধিক সংস্থার কাছ থেকে আলাদা আলাদা অনুমোদন নেওয়ার বিধান আদৌ যৌক্তিক কিনা। ইতোমধ্যে মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থার লাইসেন্স বাবদ যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করতে হয় ব্যবসায়ীদের, তার ওপর নতুন করে সমান্তরাল অনুমোদন ব্যবস্থা যুক্ত হলে তা কার্যত বাড়তি জটিলতাই তৈরি করবে বলে তার অভিমত।
ভোক্তা অধিকারবিষয়ক একটি সংগঠনের প্রধান কর্তৃপক্ষের বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, দেশে ইতোমধ্যে খাদ্যপণ্যের মান নির্ধারণ ও আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও নতুন কর্তৃপক্ষ পৃথকভাবে অনুমোদনের ক্ষমতা নিজের হাতে নিতে চাইছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা বাড়াতে পারে। তিনি আরও বলেন, প্রক্রিয়া অনলাইনভিত্তিক হলেই হয়রানিমুক্ত থাকবে—এমন নিশ্চয়তা বাস্তবে সবসময় মেলে না, কারণ অন্যান্য অনলাইন সরকারি সেবাতেও মানুষ নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তবে বিএফএসএর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এসব উদ্বেগ প্রত্যাখ্যান করে বলছেন, পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে অনলাইনে সম্পন্ন হবে, যাতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা দুর্নীতির কোনো সুযোগ না থাকে। যাদের ইতোমধ্যে মান সনদ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে নতুন করে হস্তক্ষেপের কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও জানানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, দেশজুড়ে প্রায় দশ লাখ তেরো হাজার খাদ্য ব্যবসায়ীর একটি সুসংহত তালিকা তৈরির কাজ চলছে, যা আগামী ছয় মাসের মধ্যে সম্পন্ন হতে পারে। এই তালিকা তৈরি হলে ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ ও তদারকি সহজ হবে বলে মনে করছেন তারা। ভাসমান বা মৌসুমি বিক্রেতাদের শনাক্তকরণ কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হলেও ধীরে ধীরে তাদেরও এই কাঠামোর আওতায় আনা হবে বলে জানানো হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এই উদ্যোগ নীতিগতভাবে ইতিবাচক হলেও এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যবসায়ী মহল ও বিশ্লেষকদের মধ্যে যথেষ্ট সংশয় রয়ে গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, বিদ্যমান সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং প্রকৃত অর্থে হয়রানিমুক্ত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা না গেলে, এই সংস্কার উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ছোট ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সংকট তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

