ব্যবসায়ীদের আমদানি পরিকল্পনায় কিছুটা আস্থা ফিরেছে। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে নতুন ঋণপত্র বা এলসি খোলার পরিসংখ্যানে। তবে এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি বাড়লেও প্রকৃত আমদানিতে এখনো সেই গতি দেখা যায়নি। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলসি খোলা বেড়েছে ৭ দশমিক ০৬ শতাংশ, অথচ এলসি নিষ্পত্তির মাধ্যমে পরিমাপ করা প্রকৃত আমদানি বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ০৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ৭ হাজার ৪৭৮ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৯৮৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৪৯৩ কোটি ডলার।
তবে এলসি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। আগের অর্থবছরে যেখানে ৭ হাজার ৩৪ কোটি ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল, গত অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৪১ কোটি ডলারে। অর্থাৎ এক বছরে প্রকৃত আমদানি বেড়েছে মাত্র ৭ কোটি ডলার।
এখানে এলসি খোলা ও নিষ্পত্তির পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পণ্যের জন্য এলসি খোলার অর্থ হলো আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরপর পণ্য দেশে আসা, প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই এবং অর্থ পরিশোধের পর এলসি নিষ্পত্তি হয়। তাই দেশে বাস্তবে কতটা আমদানি হয়েছে, তা বোঝার ক্ষেত্রে এলসি নিষ্পত্তির তথ্য তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যে এখনো দুর্বলতা
আমদানির দুর্বলতা শুধু সামগ্রিক হিসাবেই নয়, শিল্প উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট।
অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে, অর্থাৎ জুলাই-মার্চ সময়ে শিল্পের কাঁচামালের এলসি খোলা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৬১ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে এসব এলসি নিষ্পত্তিও কমেছে ৫ দশমিক ৪২ শতাংশ।
মধ্যবর্তী পণ্যের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক ছিল না। এ সময়ে এ ধরনের পণ্যের এলসি খোলা কমেছে ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং নিষ্পত্তি কমেছে ১২ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
ফলে অর্থবছরের শেষ দিকে এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি বাড়লেও তার প্রভাব এখনো প্রকৃত আমদানিতে বড় ধরনের গতি তৈরি করতে পারেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, এলসি খোলা বাড়লেই বিনিয়োগ বেড়েছে—এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া ঠিক হবে না। আগামী কয়েক মাসে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কীভাবে বাড়ে, সেটিই পরিস্থিতি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
তবে তাঁর মতে, এলসি খোলায় ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতা নিয়ে ব্যবসায়ীদের অনিশ্চয়তা কিছুটা কমার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ডলারের বাজার নিয়েও উদ্বেগ
আমদানি বাড়াতে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার বাজার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের দাম কিছুটা বেড়েছে। ফলে আমদানির গতি আরও বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয় কি না, তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা গেলে বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তাঁর মতে, বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও ব্যবসাবান্ধব পদক্ষেপ নিতে হবে।
চলতি অর্থবছরে ১০ শতাংশ আমদানির আশা
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীল খাতে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের প্রভাবে চলতি অর্থবছরে আমদানি প্রায় ১০ শতাংশ বাড়তে পারে।
বেসরকারি খাতকে সহায়তা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজও ঘোষণা করেছে। এর ফলে বর্তমানে বন্ধ বা দুর্বল অবস্থায় থাকা শিল্পকারখানাগুলো আবার উৎপাদনে ফিরলে কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি চাহিদা বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, শিল্পকারখানা সচল রাখতে ইতিমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর সুফল হিসেবে সামনে এলসি নিষ্পত্তি এবং বিনিয়োগ—দুই ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধি বাড়বে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

