দেশের ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সরাসরি রপ্তানি ব্যবস্থায় যুক্ত করতে নতুন নীতি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ছোট উদ্যোক্তাদের সরবরাহ ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি করে তাদের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়াই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। রপ্তানি বহুমুখীকরণের পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট রপ্তানি আয় ১০০ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গেও উদ্যোগটিকে যুক্ত করা হচ্ছে। বাংলাদেশে এসএমই খাতের বড় অংশ এখনো রপ্তানি বাজারের বাইরে থাকায় এই নীতির বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় নীতিমালা তৈরি করা হবে। মূল সমস্যা হলো, অনেক ছোট উদ্যোক্তা এমন পণ্য তৈরি করলেও আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি যাওয়ার মতো মূলধন, প্রযুক্তি, উৎপাদন সক্ষমতা, মাননিয়ন্ত্রণ ও বাজারসংযোগ তাদের নেই। ফলে তারা বড় রপ্তানিকারকদের সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করলেও বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে সরাসরি ব্যবসা করার সুযোগ পান না। নতুন ব্যবস্থায় বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে এই উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও গভীরভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রধান রপ্তানিকারকের নিশ্চয়তার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ছোট প্রতিষ্ঠানকে নীতিগত সুবিধা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে।
এই উদ্যোগের গুরুত্ব বোঝা যায় ছোট ব্যবসার অর্থায়নের চিত্র দেখলে। ২০২৫ সালের একটি কর্মসূচিতে এসএমই ফাউন্ডেশন জানিয়েছিল, দেশের সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের মাত্র ৯ শতাংশ ব্যাংকঋণের আওতায় রয়েছেন। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, বিপুলসংখ্যক উদ্যোক্তা এখনো আনুষ্ঠানিক ঋণব্যবস্থার বাইরে। অর্থাৎ শুধু বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিলেই হবে না; উৎপাদন বাড়ানো, নতুন যন্ত্রপাতি কেনা, কাঁচামাল সংগ্রহ এবং রপ্তানির অর্ডার সামলানোর জন্য উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগও বাড়াতে হবে। কারণ একজন ছোট উদ্যোক্তা বিদেশি ক্রেতার অর্ডার পেলেও প্রয়োজনীয় মূলধন না থাকলে সেই অর্ডার সময়মতো সরবরাহ করতে পারবেন না।
আরেকটি বড় বিষয় হলো মান ও সক্ষমতা। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য বিক্রি করতে হলে শুধু পণ্য তৈরি করতে পারাই যথেষ্ট নয়; ক্রেতার নির্ধারিত মান, প্যাকেজিং, নিরাপত্তা, পরিবেশগত শর্ত এবং প্রয়োজনীয় সনদ পূরণ করতে হয়। বাংলাদেশের এসএমই খাতের সম্ভাবনাময় চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, ওষুধ ও অন্যান্য উৎপাদন খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান এসব জায়গায় সক্ষমতা বাড়াতে পারলে রপ্তানি বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে। রপ্তানি বৈচিত্র্য নিয়ে সরকারি উদ্যোগেও পণ্যের বৈচিত্র্য, উদ্যোক্তার সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে বড় রপ্তানিকারকের সঙ্গে ছোট উদ্যোক্তাকে যুক্ত করার মডেলটি কার্যকর করতে হলে সম্পর্কটি যেন শুধু অর্ডার নেওয়া-দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ছোট প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারী হিসেবে গড়ে তুলতে প্রযুক্তি, মাননিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও বাজারের তথ্য সব দিকেই সহায়তা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বড় রপ্তানিকারকদের জন্যও এমন ব্যবস্থা দরকার, যাতে তারা স্থানীয় ছোট প্রতিষ্ঠান থেকে নির্ভরযোগ্যভাবে কাঁচামাল বা উপকরণ সংগ্রহ করতে পারেন। এতে একদিকে বড় প্রতিষ্ঠানের সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী হবে, অন্যদিকে ছোট উদ্যোক্তার ব্যবসা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো তৈরি পোশাকনির্ভর। তাই নতুন উদ্যোক্তা ও ছোট শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্ত করা শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি বাড়ানোর বিষয় নয়; এটি পুরো রপ্তানি কাঠামোকে আরও বৈচিত্র্যময় করার সুযোগ। তবে ২০৩০ সালের ১০০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য অর্জনে শুধু নতুন নীতি ঘোষণা যথেষ্ট হবে না। রপ্তানি বাড়াতে বন্দর ও লজিস্টিকস, বাণিজ্য ব্যয়, জ্বালানি, মাননিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশেও উন্নতি প্রয়োজন বলে অর্থনীতিবিদেরা বারবার উল্লেখ করেছেন।
সবচেয়ে বড় কথা, ছোট উদ্যোক্তাদের রপ্তানিতে আনার ক্ষেত্রে এবার নীতির পাশাপাশি বাস্তব সংযোগ তৈরি করা কতটা সম্ভব হয়, সেটিই হবে মূল পরীক্ষা। একজন উদ্যোক্তা যদি স্থানীয় বাজারের জন্য পণ্য তৈরি করে সেখান থেকে বড় রপ্তানিকারকের সরবরাহকারী হতে পারেন, এরপর ধীরে ধীরে নিজের ব্র্যান্ড বা সরাসরি বিদেশি ক্রেতার কাছে যেতে পারেন তাহলে এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে দেশের রপ্তানি কাঠামো বদলাতে পারে। বাংলাদেশের ছোট ব্যবসাগুলো তখন শুধু দেশের বাজারের সরবরাহকারী নয়, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থারও অংশ হয়ে উঠতে পারে।

