আজ থেকে ঠিক আড়াই মাস পর, ২৪ নভেম্বর ২০২৬; এই তারিখটা গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ, রপ্তানিকারক আর নীতিনির্ধারকদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক উত্তরণের কথা ছিল এই দিনেই। কিন্তু মজার বিষয় হলো, এই লেখা যখন লিখছি, তখনো এই তারিখটা চূড়ান্ত নয়; কারণ বাংলাদেশ নিজেই তিন বছরের জন্য এই উত্তরণ পেছাতে চেয়ে জাতিসংঘে আবেদন করেছে, আর সেই আবেদনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা চলতি সেপ্টেম্বরের ২২-২৩ তারিখে, নিউইয়র্কে চলমান ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে। অর্থাৎ, একটা দেশ যেটা এত বছর ধরে “উন্নয়নশীল” হওয়ার স্বপ্ন দেখে এসেছে, সেই দেশই এখন সেই তকমা আরেকটু দেরিতে পরতে চাইছে। এই বৈপরীত্যটাই আসলে পুরো গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ; কারণ এটা বলে দেয়, উন্নয়নের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা আর সেই সিঁড়ির ওপরের ধাপে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত থাকা, দুটো এক জিনিস নয়।
পঞ্চাশ বছরের সদস্যপদ, তিন বছরের প্রস্তুতি
বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে এলডিসি তালিকায় ঢুকেছিল। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক আর অর্থনৈতিক-পরিবেশগত ঝুঁকি সূচক; এই তিনটি মানদণ্ডেই বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের পর্যালোচনায় ধারাবাহিকভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে, এবং তা প্রয়োজনীয় সীমার চেয়ে যথেষ্ট ব্যবধানে। এই অর্জন নিঃসন্দেহে গর্বের। দারিদ্র্য কমেছে, গড় আয়ু বেড়েছে, শিক্ষার হার বেড়েছে। কিন্তু জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী উত্তরণের সিদ্ধান্তের পর একটা প্রস্তুতিকাল দেওয়া হয়, যাতে দেশটি ধাক্কা সামলে নিতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই প্রস্তুতিকাল করোনা মহামারির কারণে একবার পিছিয়ে ২০২৬ সালে নির্ধারিত হয়েছিল। এখন সেই পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকালকে সরকার নিজেই “যথেষ্ট ছিল না” বলে দাবি করছে। করোনা-পরবর্তী ধাক্কা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম আর রিজার্ভের চাপ; এসব একসঙ্গে যোগ করে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের মনোযোগ সংস্কার থেকে সরিয়ে সংকট মোকাবিলায় নিয়ে গেছে। জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি (সিডিপি) অবশ্য এই আবেদনে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। তবে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা আর কাঠামোগত সংস্কারে অগ্রগতি ছাড়া শুধু সময় বাড়ানোটা অর্থবহ হবে না।
দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার কেন এত মূল্যবান
এখন প্রশ্ন হলো, উত্তরণে এত ভয় কীসের? উত্তরটা লুকিয়ে আছে একটামাত্র সংখ্যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় ছিল ৪৮.২৮ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে পোশাক খাত একাই এনেছে ৩৯.৩৫ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি। আর এই পোশাক রপ্তানির অর্ধেকই যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে – ১৯.৭১ বিলিয়ন ডলার, মোট আয়ের ৫০.১০ শতাংশ। এই বিশাল অংক সম্ভব হয়েছে মূলত ইইউর “এভরিথিং বাট আর্মস” (ইবিএ) প্রকল্পের কারণে, যা এলডিসিভুক্ত দেশগুলোকে অস্ত্র ছাড়া প্রায় সব পণ্যে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়। এলডিসি মর্যাদা হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই এই সুবিধা এমনিতে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা, তবে ইইউ, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া উত্তরণের পর তিন বছরের একটা রূপান্তরকাল দিতে সম্মত হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ যদি ২০২৬ সালেই উত্তরণ করে, তাহলে ২০২৯ সাল পর্যন্ত পুরনো সুবিধা মোটামুটি অক্ষুণ্ণ থাকবে। কিন্তু তারপর? বিভিন্ন গবেষণা ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা দিচ্ছে; কোনোটি বলছে রপ্তানি আয়ে বছরে দেড় থেকে সাত বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার একটি সতর্কবার্তা অনুযায়ী তা আট বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত, অর্থাৎ মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ১৪ শতাংশ পর্যন্ত ছুঁতে পারে। সংখ্যাগুলো ভিন্ন হলেও একটা বার্তা অভিন্ন; কোনো একক ছাড় হারানো নয়, বরং একটা গোটা অর্থনৈতিক মডেলের ভিত্তি নড়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
“বেশি সফল হওয়ার” আজব শাস্তি
এখানেই গল্পের সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশটা আসে, যেটা নিয়ে সাধারণ আলোচনায় খুব একটা কথা হয় না। ইইউ সম্প্রতি তার পুরনো জিএসপি কাঠামো (২০১২ সালের) বাতিল করে নতুন একটি নিয়ম-রেগুলেশন (ইইউ) ২০২৬/১৩৯৫ কার্যকর করেছে, যা ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে দশ বছরের জন্য প্রযোজ্য হবে। এলডিসি হিসেবে সুবিধা হারানোর পর বাংলাদেশের সামনে দুটো পথ খোলা থাকে; সাধারণ জিএসপি অথবা জিএসপি প্লাস। সাধারণ জিএসপিতে পোশাকের ওপর শুল্ক ১২ শতাংশ থেকে কমে ৯.৬ শতাংশ হয়, শূন্য নয়। আর জিএসপি প্লাসে শুল্ক শূন্যে নামে, কিন্তু শর্ত হলো দেশটিকে “ভালনারেবল” বা ঝুঁকিপূর্ণ প্রমাণ করতে হয় এবং ৩২টি আন্তর্জাতিক সনদ অনুসমর্থন ও বাস্তবায়ন করতে হয়। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে সবগুলো সনদ অনুসমর্থন করে ফেলেছে; ২০২৫ সালের নভেম্বরে এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে আইএলওর সবগুলো মৌলিক কনভেনশন অনুসমর্থন করার কৃতিত্বও অর্জন করেছে। কিন্তু নতুন নিয়মে একটা “সেফগার্ড মেকানিজম” আছে। কোনো দেশের কোনো এক পণ্যশ্রেণির রপ্তানি যদি ইইউর মোট জিএসপি আমদানির ৩৭ শতাংশের বেশি হয়ে যায়, তাহলে সে পণ্যের ক্ষেত্রে জিএসপি প্লাসের সুবিধা স্থগিত করে দেওয়া হয়। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ইইউর সংশ্লিষ্ট পণ্যশ্রেণির প্রায় অর্ধেক দখল করে আছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ এত বেশি পোশাক বিক্রি করে ফেলেছে যে এখন তাকেই এই সীমা অতিক্রম করার কারণে সুবিধাবঞ্চিত করার শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এক অর্থে, নিজের সাফল্যই তার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে “ডাবল ট্রান্সফরমেশন” নিয়ম-সুতা থেকে কাপড়, কাপড় থেকে পোশাক, দুই ধাপেই মূল্য সংযোজন দেশের ভেতরে হতে হবে, যেখানে ইবিএর অধীনে এক ধাপেই চলত। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় বোনা কাপড়ের প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি করে, ফলে এই নিয়ম মানতে গেলে দেশের ভেতরে বড় ধরনের বিনিয়োগ দরকার। ঢাকা তাই ইইউর কাছে এক-ধাপ রূপান্তর নিয়মের ব্যতিক্রম চেয়ে আলোচনা চালাচ্ছে।
ওষুধ শিল্পের এক গোপন সুবিধা
গল্পের আরেকটা দিক অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়, দেশের ওষুধ শিল্প। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস চুক্তির অধীনে এলডিসিভুক্ত দেশগুলো ওষুধের পেটেন্ট সুরক্ষা থেকে অব্যাহতি পায়, যার মেয়াদ ২০৩৩ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্ধারিত। তবে শর্ত হলো, “যেটা আগে আসে,” অর্থাৎ কোনো দেশ এলডিসি থেকে বেরিয়ে গেলে তার আগেই এই সুবিধা শেষ হয়ে যাবে। এই একটামাত্র ছাড়ের সুবাদে বাংলাদেশ আজ দেশের প্রায় ৯৭-৯৮ শতাংশ ওষুধের চাহিদা নিজেই মেটায় এবং প্রায় দেড় শতাধিক দেশে ওষুধ রপ্তানি করে; অথচ এসব ওষুধের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ অন্য দেশে এখনো পেটেন্টের আওতায়। উত্তরণের পর বাংলাদেশকে পণ্য পেটেন্ট মানতে হবে, যার অর্থ দাঁড়ায়; নতুন করে পেটেন্টধারী কোম্পানিগুলোর অনুমতি বা লাইসেন্স ফি ছাড়া জেনেরিক ওষুধ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়বে, বিশেষ করে ইনসুলিনের মতো জীবনরক্ষাকারী ওষুধে দাম বাড়ার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞরা বহুবার তুলে ধরেছেন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত ডব্লিউটিওর ত্রয়োদশ মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে গ্র্যাজুয়েটিং দেশগুলোর জন্য কিছু অতিরিক্ত সময়ের সংস্থান রাখা হলেও, বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের নেতারা; ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ অনেকে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, ২০৩৩ সাল পর্যন্ত এই ছাড় অন্তত বাংলাদেশের জন্য আলাদাভাবে বহাল রাখতে ডব্লিউটিওতে দেশ-নির্দিষ্ট আবেদন করা হোক। এখানেই একটা বাস্তবতা মেনে নেওয়া দরকার, এই আবেদন গৃহীত হবে কি না, তা পুরোপুরি সদস্য দেশগুলোর ঐকমত্যের ওপর নির্ভরশীল, আর ইতিহাস বলে, এ ধরনের ছাড় সহজে মেলে না।
নিয়মের জালটা আরও বড়
এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ যেসব সুবিধা ভোগ করে, তার পরিধি আসলে পোশাক আর ওষুধের চেয়েও অনেক বিস্তৃত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ১৬টি চুক্তিতে মোট ১৮৬টি “স্পেশাল অ্যান্ড ডিফারেনশিয়াল ট্রিটমেন্ট” বা এসঅ্যান্ডডি বিধান আছে, যার মধ্যে ২৬টি একচেটিয়াভাবে শুধু এলডিসির জন্য সংরক্ষিত। বাণিজ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিএফটিআইয়ের একটি সমীক্ষা স্পষ্ট করে বলেছে, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে এই বিধানগুলোর সর্বোচ্চ সুবিধা যেসব দেশ নিয়েছে, বাংলাদেশ তার মধ্যে শীর্ষে। আর তাই হারানোর তালিকাতেও সবচেয়ে ওপরে তার নাম। এর একটা বাস্তব উদাহরণ হলো রপ্তানি ভর্তুকি। ডব্লিউটিওর ভর্তুকি চুক্তি অনুযায়ী উন্নয়নশীল দেশগুলো সরাসরি নগদ রপ্তানি প্রণোদনা দিতে পারে না, যেটা বাংলাদেশ বছরের পর বছর ধরে পোশাক ও অন্যান্য রপ্তানি খাতে দিয়ে আসছে। উত্তরণের পর এই প্রণোদনার কাঠামো ভেঙে নতুন করে সাজাতে হবে, যাতে তা ডব্লিউটিওর নিয়মে “অ্যাকশনেবল” ভর্তুকি হিসেবে চিহ্নিত না হয়। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশীয় মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল (সাফটা) ও এশিয়া প্যাসিফিক বাণিজ্য চুক্তির (আপটা) অধীনেও বাংলাদেশ যেসব বাড়তি সুবিধা পেত, সেগুলোর কিছু অংশও খর্ব হবে। অর্থাৎ, উত্তরণ মানে শুধু একটা তকমা বদলানো নয়, এটা একসঙ্গে অনেকগুলো নিয়মের জাল একসাথে বদলে ফেলার প্রক্রিয়া।
জাপানের সঙ্গে চুক্তি
এত সব দুশ্চিন্তার মধ্যে একটা সুসংবাদও আছে, আর সেটা এসেছে বাংলাদেশের প্রথম দ্বিপক্ষীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তির হাত ধরে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে জাপানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) মাধ্যমে বাংলাদেশ নিশ্চিত করেছে যে এলডিসি মর্যাদা হারানোর পরও জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে বহাল থাকবে; শুধু সাময়িক দয়া হিসেবে নয়। প্রায় নয় হাজারের বেশি পণ্যের ক্ষেত্রে বারো বছরের একটা পর্যায়ক্রমিক সময়সীমায় শুল্ক প্রত্যাহার করা হবে, যার মধ্যে আছে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, প্লাস্টিক ও হালকা প্রকৌশল পণ্য। প্রায় ২.১ বিলিয়ন ডলারের একটা রপ্তানি বাজার এতে সুরক্ষিত থাকছে। এই চুক্তির গুরুত্ব শুধু শুল্ক ছাড়ে নয়, বরং এর কাঠামোতেও। এখানে পোশাকের ক্ষেত্রে “সিঙ্গেল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন” সুবিধা রাখা হয়েছে, যেটা ইইউর কড়াকড়ির তুলনায় অনেক বেশি নমনীয়। এই একটা চুক্তি আসলে প্রমাণ করে দেয়, প্রস্তুতির সঙ্গে সঠিক আলোচনার কৌশল যুক্ত হলে ফল পাওয়া সম্ভব। এই মডেল অনুসরণ করেই সরকার এখন একযোগে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, ভুটান, নেপাল, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, তুরস্ক, মরিশাস, নাইজেরিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ইইউ সহ প্রায় পনেরোটি দেশ ও জোটের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা চালাচ্ছে, এবং একই সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম মুক্তবাণিজ্য জোট আরসিইপিতে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াও এগিয়ে নিচ্ছে। তবে একটা বাস্তবতা মনে রাখা দরকার। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ এমনিতেই জিএসপি সুবিধা পায় না, বহু আগে থেকেই সাধারণ শুল্কহারে (এমএফএন) পোশাক রপ্তানি করে আসছে; তাই ওই একটা বাজারে অন্তত এলডিসি উত্তরণের কারণে নতুন করে বাড়তি ধাক্কা লাগার আশঙ্কা তুলনামূলক কম, যদিও সাম্প্রতিক শুল্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা একেবারেই আলাদা একটা প্রসঙ্গ।
স্থগিতের প্রশ্নে জাতীয় দ্বিধা
এখন ফিরে আসি শুরুর প্রশ্নে। বাংলাদেশ কেন উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দিতে চাইছে? ব্যবসায়ী মহল দীর্ঘদিন ধরেই এই দাবি তুলছিল, তাদের যুক্তি সরল; পোশাক শিল্প এখনো প্রস্তুত নয়, বিশেষ করে পশ্চাৎসংযোগ শিল্প (কাপড় উৎপাদন) দুর্বল, বন্দর ও লজিস্টিক ব্যয় বেশি, আর জিএসপি প্লাসের শর্ত পূরণে সময় দরকার। জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটিও এই যুক্তিতে সায় দিয়েছে, বলেছে অতীতে সলোমন দ্বীপপুঞ্জসহ পাঁচটি দেশ একই ধরনের সংকটকালীন যুক্তিতে বাড়তি সময় পেয়েছিল, তাই বাংলাদেশের আবেদনও নজিরবিহীন নয়। কিন্তু এর বিপরীত যুক্তিও কম জোরালো নয়। দ্য ডেইলি স্টারের একটি সম্পাদকীয়তে স্পষ্ট ভাষায় লেখা হয়েছে, যে দেশ এলডিসি উত্তরণের তিনটি মানদণ্ডই যথেষ্ট ব্যবধানে পূরণ করে, তার জন্য দীর্ঘায়িত অবস্থান আসলে উন্নয়নের সুফল পেতে দেরি করানো ছাড়া কিছু নয়। কমিটি নিজেও তার মূল্যায়ন প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে, সময় বাড়ানো যেন সংস্কারে গড়িমসির অজুহাত না হয়ে যায়, বরং তা সংস্কার ত্বরান্বিত করার একটা সুযোগ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া উচিত। এই দুই যুক্তির মধ্যে কোনটা সঠিক, তার চূড়ান্ত রায় হয়তো রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপরই নির্ভর করবে, তবে তথ্য-উপাত্ত একটা জিনিস স্পষ্ট করে দেয়; বিলম্বিত হোক বা না হোক, করণীয় তালিকাটা একই থাকছে।
স্থগিত হলে কী বদলাবে? সরাসরি উত্তর; এলডিসি হিসেবে টিকে থাকলে ইবিএ, ট্রিপস ছাড় আর ডব্লিউটিওর পূর্ণ বিশেষ সুবিধা ২০২৯ সাল পর্যন্ত নিজে থেকেই বহাল থাকবে, তার ওপর আলাদা করে কোনো তিন বছরের “রূপান্তরকাল” যোগ করার প্রয়োজনই পড়বে না কারণ ততদিন দেশটি প্রকৃতপক্ষেই এলডিসি থাকবে। কিন্তু এখানে একটা সতর্কতা জরুরি। জিএসপি প্লাসের জটিল শর্ত, পশ্চাৎসংযোগ শিল্পে বিনিয়োগের ঘাটতি, রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা, এই কাঠামোগত সমস্যাগুলোর কোনোটাই স্রেফ তিন বছর সময় পেলে আপনাআপনি সমাধান হয়ে যাবে না। সময়টা একটা সুযোগ মাত্র, সমাধান নয়। আর ঠিক এই জায়গাতেই আমার নিজের পর্যবেক্ষণ, আলোচিত সব প্রতিবেদন, নিয়মকানুন আর সরকারি নথি একসাথে রাখলে যেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হলো, বাংলাদেশের আসল চ্যালেঞ্জ তারিখ নয়, সক্ষমতা। জাপানের সঙ্গে চুক্তি যেভাবে তিন-চার বছরের নিবিড় আলোচনার ফসল, ইইউর জিএসপি প্লাসের জন্যও তেমনই দীর্ঘ, কারিগরি ও কূটনৈতিক প্রস্তুতি দরকার আর সেই প্রস্তুতির মূল স্তম্ভ তিনটি: দেশের ভেতরে কাপড় উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো (যাতে ডাবল ট্রান্সফরমেশনের শর্ত পূরণ হয়), রপ্তানি বাজার বহুমুখী করা (যাতে একটামাত্র বাজারের ওপর নির্ভরতা কমে), আর ডব্লিউটিওতে সক্রিয় কূটনীতি চালিয়ে যাওয়া (যাতে ওষুধ শিল্পের মতো সংবেদনশীল খাতে বিশেষ ছাড়ের সুযোগ তৈরি হয়)। এই তিনটি কাজের কোনোটাই তারিখনির্ভর নয়; এগুলো শুরু করতে আজই দেরি হয়ে গেছে, আর সেপ্টেম্বরের শেষে জাতিসংঘে যা-ই সিদ্ধান্ত হোক না কেন, এই হোমওয়ার্কটা বাংলাদেশকে করতেই হবে।

