ইলেকট্রনিকস থেকে বিদেশি বিনিয়োগ ভিয়েতনাম কয়েক দশকে এমন একটি শিল্পভিত্তি তৈরি করেছে, যেখানে একটি বড় কোম্পানির বিনিয়োগের সঙ্গে তৈরি হয়েছে সরবরাহকারী, দক্ষ জনশক্তি ও রপ্তানির নতুন দরজা। এখন দেখার বিষয়, বাংলাদেশ কি একই ধরনের বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের সুযোগ তৈরি করতে পারছে!
একসময় ভিয়েতনামও বাংলাদেশের মতোই একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতি ছিল, যেখানে শিল্পের ভিত্তি ছিল সীমিত এবং বৈদেশিক বিনিয়োগও ছিল খুব কম। আজ সেই দেশ বছরে প্রায় ৪৭৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। ২০২৫ সালে শুধু কম্পিউটার, ইলেকট্রনিক পণ্য ও যন্ত্রাংশ রপ্তানি থেকেই ভিয়েতনামের আয় হয়েছে ১০৭.৭৫ বিলিয়ন ডলার, যা দেশটির মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ২৩ শতাংশ। ফোন ও এর যন্ত্রাংশ মিলিয়ে প্রযুক্তিপণ্যের রপ্তানি আরও বড়। একই সময়ে বাংলাদেশের ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক পণ্যের রপ্তানি এখনো কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের স্তরে। অর্থাৎ ব্যবধানটি শুধু একটি খাতের নয়; এটি দেখায়, দুই দেশ বিশ্ব উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে নিজেদের অর্থনীতিকে কতটা ভিন্নভাবে যুক্ত করেছে।
ভিয়েতনাম কী করেছে, এর উত্তর কোনো একটি নীতিতে পাওয়া যাবে না। বরং দেশটি কয়েক দশক ধরে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে বিদেশি বিনিয়োগ, বাণিজ্য, শিল্পাঞ্চল, দক্ষতা, অবকাঠামো এবং স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা একে অন্যকে শক্তিশালী করেছে। ২০০৭ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগ দেওয়ার আগে থেকেই ভিয়েতনাম আঞ্চলিক বাণিজ্যে ঢুকতে শুরু করে। আসিয়ানের মুক্তবাণিজ্য কাঠামোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তি, পরে ডব্লিউটিও, সিপিটিপিপি এবং আরসিইপির মতো চুক্তিতে যুক্ত হয়েছে দেশটি। ফলে ভিয়েতনামে একটি কারখানা বসানো মানে শুধু ভিয়েতনামের বাজারে পণ্য বিক্রি করা নয়; উৎপাদকরা একাধিক আন্তর্জাতিক বাজার ও সরবরাহশৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
এখানেই বাংলাদেশের জন্য প্রথম বড় শিক্ষাটি আছে। রপ্তানি বাড়াতে হলে শুধু রপ্তানিকারককে সুবিধা দিলেই হয় না, তাকে বিশ্বের উৎপাদন নেটওয়ার্কের অংশ হওয়ার সুযোগও দিতে হয়। ইলেকট্রনিকসের একটি মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার তৈরি করতে অসংখ্য যন্ত্রাংশ লাগে। সবকিছু একটি দেশে তৈরি করার চেষ্টা করলে খরচ বাড়ে; বরং যে দেশ সহজে প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানি করতে পারে, দ্রুত উৎপাদন করতে পারে এবং আবার শুল্ক-সুবিধাসহ বড় বাজারে পণ্য পাঠাতে পারে, সেই দেশই বৈশ্বিক উৎপাদনকারীর কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ভিয়েতনাম এই বাস্তবতাটি অনেক আগে বুঝেছে। বাংলাদেশের বাণিজ্যব্যবস্থা এখনো তুলনামূলকভাবে বেশি সুরক্ষিত, আর আমদানি করা মধ্যবর্তী পণ্যের ওপর উচ্চ ব্যয় অনেক শিল্পের প্রতিযোগিতার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে আমরা রপ্তানি করতে চাই, কিন্তু যে বৈশ্বিক সরবরাহশৃঙ্খলের ভেতর ঢুকলে রপ্তানি বড় হতে পারে, সেখানে প্রবেশের পথ সবসময় সহজ রাখিনি।
বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও পার্থক্যটি স্পষ্ট। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তুলনীয় তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভিয়েতনামে নিট বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের প্রবাহ ছিল জিডিপির প্রায় ৪.২ শতাংশ; বাংলাদেশে তা ছিল মাত্র ০.৩ শতাংশ। এই ব্যবধানকে শুধু ‘বিনিয়োগকারীরা ভিয়েতনামকে পছন্দ করে’ বলে ব্যাখ্যা করলে আসল বিষয়টি ধরা পড়বে না। ভিয়েতনাম বিনিয়োগকারীকে একটি কারখানার জন্য জমি দেওয়ার পাশাপাশি তাকে রপ্তানির বাজার, শিল্পাঞ্চল, সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনের পরিবেশ দেওয়ার চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে, কিন্তু তা এখনো অর্থনীতির আকারের তুলনায় অনেক ছোট। ফলে বড় বৈশ্বিক কোম্পানির সঙ্গে স্থানীয় শিল্পের সংযোগও সীমিত রয়ে গেছে।
স্যামসাংয়ের গল্পটি এই পার্থক্য বোঝার সবচেয়ে ভালো উদাহরণগুলোর একটি। ২০০৮ সালে ভিয়েতনামে মাত্র ৬৭০ মিলিয়ন ডলারের একটি মোবাইল ফোন কারখানা দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল কোম্পানিটি। এরপর বিনিয়োগ বাড়তে বাড়তে ২০২৪ সালের শেষে ভিয়েতনামে স্যামসাংয়ের বাস্তবায়িত বিনিয়োগ দাঁড়ায় প্রায় ২৩.২ বিলিয়ন ডলারে। দেশটিতে এখন কোম্পানিটির ছয়টি উৎপাদন কারখানা ও একটি গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে। ২০২৪ সালে ভিয়েতনামে স্যামসাংয়ের ছয় কারখানার বিক্রয় ছিল ৬২.৫ বিলিয়ন ডলার এবং রপ্তানি ৫৪.৪ বিলিয়ন ডলার—যা দেশটির মোট রপ্তানির ১৩ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ প্রথম বিনিয়োগটি শুধু একটি কারখানা তৈরি করেনি; সময়ের সঙ্গে সেটি ভিয়েতনামের উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।
এখানে বাংলাদেশের একটি সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তৎকালীন নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেছিলেন, জমি-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে স্যামসাং বাংলাদেশে একটি বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা থেকে সরে গিয়ে ভিয়েতনামে গিয়েছিল। এই দাবির স্বাধীনভাবে সব আর্থিক বিবরণ যাচাই করা কঠিন, তাই এটিকে নিশ্চিতভাবে ‘বাংলাদেশে ২২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হারিয়েছে’ বলা ঠিক হবে না। তবে ঘটনাটি যে প্রশ্নটি সামনে আনে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ: একটি বৈশ্বিক কোম্পানি যখন কয়েক হাজার কোটি ডলারের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বিবেচনা করে, তখন জমির মালিকানা, শিল্পাঞ্চলের প্রস্তুতি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, বন্দর, কাস্টমস এবং অনুমোদনের সময় সবকিছুই বিনিয়োগের অংশ হয়ে যায়। বিনিয়োগকারীকে শুধু করছাড় দিয়ে ধরে রাখা যায় না; তাকে এমন একটি পরিবেশ দিতে হয় যেখানে কারখানা বসানোর পর উৎপাদন দ্রুত শুরু করা সম্ভব।
ভিয়েতনামের আরেকটি বড় সাফল্য এখানেই, তারা বিদেশি কোম্পানিকে শুধু রপ্তানিকারক হিসেবে দেখেনি, শেখার একটি কেন্দ্র হিসেবেও দেখেছে। স্যামসাংয়ের উপস্থিতির সঙ্গে দেশটিতে প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, স্থানীয় সরবরাহকারী ও গবেষণা সক্ষমতার চাহিদা তৈরি হয়েছে। হ্যানয়ে স্যামসাংয়ের গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র মোবাইল ও ট্যাবলেটের সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কোম্পানিটির গবেষণা কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ ভিয়েতনামের লক্ষ্য শুধু ‘মেড ইন ভিয়েতনাম’ লেখা পণ্য তৈরি করা নয়; ধীরে ধীরে সেই উৎপাদনের পেছনের দক্ষতা, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার অংশীদার হওয়াও।
বাংলাদেশ অবশ্য পুরোপুরি পিছিয়ে আছে এমনটাও বলা যাবে না। বরং পরিবর্তনের কিছু লক্ষণ ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে বাংলাদেশের প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি ৫৯৮ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক পণ্যের রপ্তানি হয়েছে ১৮৯.২৯ মিলিয়ন ডলার। এক দশক আগে এই খাতের রপ্তানি ছিল প্রায় ৯০ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ভিত্তিটা তৈরি হচ্ছে, কিন্তু তার আকার এখনো খুব ছোট। বাংলাদেশের মোট রপ্তানির তুলনায় প্রকৌশল খাতের অংশও মাত্র প্রায় ১.৩৭ শতাংশ।
সমস্যাটা তাই ‘আমরা কিছুই পারিনি’ এমন সরল নয়। বরং বাংলাদেশ কিছু জায়গায় এগিয়েছে, কিন্তু সেই অগ্রগতিকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাওয়ার মতো শিল্প-পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। তৈরি পোশাক খাতে আমরা যে অভিজ্ঞতা পেয়েছি, সেটিই এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। সত্তরের দশকে দক্ষিণ কোরিয়ার ডেইউয়ের সঙ্গে দেশ গার্মেন্টসের অংশীদারত্ব বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে নতুন দক্ষতা, উৎপাদন পদ্ধতি ও আন্তর্জাতিক ক্রেতার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তৈরি করেছিল। পরে সেই জ্ঞান ছড়িয়ে পড়ে নতুন নতুন উদ্যোক্তার মধ্যে। একটি কোম্পানির সঙ্গে তৈরি হওয়া সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও শেখাটা থেকে গিয়েছিল। এটাই শিল্পায়নের সবচেয়ে মূল্যবান দিক বিদেশি বিনিয়োগের আসল লাভ শুধু সেই কোম্পানি কত টাকা বিনিয়োগ করল, তা নয়; স্থানীয় অর্থনীতি তার কাছ থেকে কী শিখল।
সুতরাং ভিয়েতনামের কাছ থেকে বাংলাদেশের শেখার বিষয়টি ‘আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হবে’ এতটা সরল নয়। বিনিয়োগ আসার পর কী হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। একটি বড় কারখানার পাশে স্থানীয় সরবরাহকারী তৈরি হবে কি না, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষতা তৈরি করবে কি না, প্রকৌশলীরা নতুন প্রযুক্তি শিখবে কি না, দেশীয় কোম্পানি আন্তর্জাতিক মানের সরবরাহকারী হতে পারবে কি না এসবের ওপরই নির্ভর করবে একটি বিনিয়োগ সাময়িক উৎপাদনকেন্দ্র হবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি শিল্পভিত্তি তৈরি করবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সেই সুযোগ আবারও তৈরি হচ্ছে। চীন-নির্ভর সরবরাহশৃঙ্খল থেকে বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোর বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা, এশিয়ায় নতুন উৎপাদনকেন্দ্রের খোঁজ এবং প্রযুক্তিপণ্যের ক্রমবর্ধমান বাজার সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা কম নয়। কিন্তু সম্ভাবনা আর বিনিয়োগ এক জিনিস নয়। বিনিয়োগকারী যেখানে একবার সিদ্ধান্ত নেয়, সেখানে আমাদের কয়েক বছর ধরে একই নীতিতে কাজ করতে হবে। জমি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, বন্দর, কাস্টমস, করনীতি, মুনাফা প্রত্যাবাসন, দক্ষ কর্মী এবং স্থানীয় সরবরাহকারী সবকিছুকে একই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত ভিয়েতনাম আমাদের যে শিক্ষা দেয়, তা কোনো একক শিল্পের গল্প নয়। একটি দেশ একদিনে ইলেকট্রনিকস রপ্তানিকারক হয় না। প্রথমে একটি কোম্পানি আসে, তারপর আরও কোম্পানি আসে। তাদের জন্য সরবরাহকারী তৈরি হয়। দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় বদলায়। শিল্পাঞ্চল বড় হয়। বন্দর ব্যস্ত হয়। নতুন বাজার খুলে যায়। তারপর একসময় দেখা যায়, একটি বিদেশি কোম্পানির বিনিয়োগ আর আলাদা কোনো ঘটনা নয়, সেটি একটি অর্থনীতির রূপান্তরের অংশ।
বাংলাদেশের সামনে এখন প্রশ্নটি তাই ভিয়েতনাম কীভাবে স্যামসাংকে এনেছিল এটি নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, স্যামসাং এলে ভিয়েতনাম যা তৈরি করতে পেরেছিল, বাংলাদেশ তা কতটা তৈরি করতে পারবে? কারণ একটি কারখানা আনা সহজ সাফল্য; সেই কারখানাকে ঘিরে একটি শিল্প-পরিবেশ তৈরি করাই আসল সাফল্য। আমরা যদি এবারও শুধু বিনিয়োগের অঙ্ক গুনে থেমে যাই, তাহলে সুযোগটি আবারও একটি কারখানার গল্প হয়েই থাকবে। আর যদি বিনিয়োগ থেকে শেখা, স্থানীয় সক্ষমতা ও রপ্তানি বৈচিত্র্য এই তিনটিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে পারি, তখন হয়তো কয়েক বছর পর আমাদেরও কাউকে বলতে হবে না, ভিয়েতনাম কী করেছিল। তখন গল্পটা হবে বাংলাদেশ এবার কী করল।

