যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৪১ শতাংশ আইনজীবী মনে করেন আইন পেশা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। আমেরিকান বার অ্যাসোসিয়েশন এবং ক্রিল স্ট্র্যাটেজিসের এই গবেষণায় ৩৭ হাজারের বেশি আইনজীবীর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। উদ্বেগ, বিষণ্নতা, বার্নআউট এবং মদ্যপানের হার সেখানে আগের তুলনায় বেড়েছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশে আইনজীবীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এখনও বড় আকারের কোনো জাতীয় জরিপ হয়নি। তবে দেশের আইনি অঙ্গনের সংবাদ, গবেষণাপত্র এবং আইনজীবী সংগঠনের প্রতিবেদন থেকে হালক্যা ধারনা পাওয়া যায়। বাংলাদেশের আইনজীবীরাও নিজস্ব ধরনের মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। তবে সেই চাপের কারণগুলো যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন।
নবীন আইনজীবীদের সংকট
আইনজীবী ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বাংলাদেশের নবীন আইনজীবীদের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। নিবন্ধে বলা হয়েছে, পেশার প্রথম বছরে অনেক নবীন আইনজীবী হীনম্মন্যতা, উদ্বেগ এবং হতাশায় ভোগেন। তাদের ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক অস্থিরতা এই মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
নিবন্ধ অনুযায়ী, অনেক আইনি চেম্বারে জুনিয়র আইনজীবীদের ফটোকপি করা বা নোটিশ পাঠানোর মতো ছোটখাটো কাজে ব্যস্ত রাখা হয়। এতে তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতা তৈরির সুযোগ কমে যায়। সিনিয়র আইনজীবীরা নিজেদের কাজের চাপে জুনিয়রদের সময় দিতে পারেন না, যার ফলে শিক্ষানবিশির আসল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।
বার কাউন্সিল পরীক্ষার অনিশ্চয়তা এবং একটি বেদনাদায়ক ঘটনা
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বরগুনার এক শিক্ষানবিশ আইনজীবী বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট পরীক্ষার রিভিউয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও অসুস্থ হয়ে মারা যান। তার পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চলা পরীক্ষার অনিশ্চয়তা এবং মানসিক চাপ তার মৃত্যুর একটি বড় কারণ। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভুয়া তথ্যের কারণে তিনি আরও বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন বলেও পরিবার জানিয়েছে।
সদস্যভুক্তির ফি এবং আর্থিক চাপ
লইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলা আইনজীবী সমিতিতে সদস্যভুক্ত হতে নবীন আইনজীবীদের অনেক বেশি ফি দিতে হয়। বার কাউন্সিলের নির্ধারিত ফি ছাড়াও বিভিন্ন জেলা বার সমিতি নিজস্ব নিয়মে অতিরিক্ত ফি নির্ধারণ করে, যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে লাখ টাকা ছুঁয়ে যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ফি নির্ধারণের কোনো সুনির্দিষ্ট সীমা নেই।
নতুন আইনজীবীদের জন্য এই আর্থিক চাপ পেশার শুরুতেই বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। উপার্জন শুরু হওয়ার আগেই বড় অঙ্কের ফি পরিশোধ করতে হলে তা আর্থিক ও মানসিক দুই দিক থেকেই চাপ তৈরি করে।
আইনি কাঠামো কী বলে
বাংলাদেশে আইনজীবী পেশা নিয়ন্ত্রিত হয় বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২ এর মাধ্যমে। এই অর্ডারের অধীনে বার কাউন্সিল আইনজীবীদের তালিকাভুক্তি পরীক্ষা পরিচালনা করে, সনদ দেয় এবং আচরণবিধি পর্যবেক্ষণ করে। তবে এই অর্ডার বা এর অধীনে তৈরি বিধিমালায় আইনজীবীদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিয়ে সরাসরি কোনো বিধান নেই।
বার কাউন্সিলের আচরণবিধিতে বলা হয়েছে, একজন আইনজীবীকে ক্লায়েন্টের স্বার্থে সম্পূর্ণ নিবেদিত থাকতে হবে এবং কোনো ভয় বা জনরোষ তাকে তার দায়িত্ব থেকে বিরত রাখতে পারবে না। এই ধরনের ভাষা পেশাগত দায়বদ্ধতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটি পরোক্ষভাবে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং অতিরিক্ত কাজের একটি সংস্কৃতিকেও উৎসাহ দিতে পারে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য অধিকার সুরক্ষার জন্য মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৮ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইন সাধারণভাবে মানসিক স্বাস্থ্যকে মানুষের স্বাস্থ্য অধিকারের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু পেশাজীবী গোষ্ঠী হিসেবে আইনজীবীদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো নীতি এই আইনে নেই।
আন্তর্জাতিক গবেষণায় কী মিল পাওয়া যায়
ইন্টারন্যাশনাল বার অ্যাসোসিয়েশন ২০২১ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, বিশ্বজুড়ে আইন পেশায় মানসিক সুস্থতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিবেদনে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং কঠিন বিলিং লক্ষ্যমাত্রাকে এই সমস্যার একটি বড় কারণ বলে চিহ্নিত করা হয়।
সাইকিয়াট্রি, সাইকোলজি অ্যান্ড ল জার্নালে ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, বেশি কাজের চাপ এবং কম প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা আইনজীবীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং বার্নআউটের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
দক্ষিণ এশীয় প্রেক্ষাপটে, ভারতের সাংলি জেলায় পরিচালিত একটি পুরনো গবেষণায় (প্যাটেল, রাজদারকার এবং নায়েক, ২০১২) দেখা গেছে, পেশাগত চাপ ও বার্নআউট আইনজীবীদের কর্মসন্তুষ্টির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই গবেষণা প্রমাণ করে, বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশেও আইনজীবীদের মধ্যে একই রকম চাপ কাজ করে।
যেসব পরিবর্তন দরকার
বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার সংস্কার করে এতে আইনজীবীদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে সুনির্দিষ্ট নীতি যুক্ত করা যেতে পারে। বার কাউন্সিল এবং জেলা বার সমিতিগুলো একসঙ্গে কাজ করে নবীন আইনজীবীদের জন্য পরামর্শ কেন্দ্র বা মেন্টরশিপ কর্মসূচি চালু করতে পারে।
সদস্যভুক্তির ফি নির্ধারণে একটি জাতীয় নীতিমালা তৈরি করা জরুরি, যাতে আর্থিক দিক থেকে দুর্বল নবীন আইনজীবীরা অতিরিক্ত চাপে না পড়েন। পাশাপাশি বার কাউন্সিলের পরীক্ষা প্রক্রিয়া আরও নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী পরিচালিত হলে পরীক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা কমতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৮ এর আওতায় পেশাজীবী গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ নির্দেশনা তৈরি করার সুযোগ আছে। আইন পেশাকেও এই আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে ভবিষ্যতে আইনজীবীদের জন্য একটি কার্যকর মানসিক স্বাস্থ্য নীতি গড়ে উঠতে পারে।
এছাড়া আইনজীবীদের বিভিন্ন দুর্ঘটনা বা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে বার কাউন্সিল থেকে পর্যাপ্ত পরিমান সহায়তা প্রদান করতে হবে। অনেক সময় ঠিক মত সহায়তা না পাওয়ার কারনে অনেক আইনজীবী মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে যান।
এই প্রতিবেদনে উল্লেখিত মৃত্যুর ঘটনার মতো বিষয় সংবেদনশীল। কেউ যদি পেশাগত চাপ বা মানসিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যান, তাহলে নিকটজন, চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা উপকারী হতে পারে।

