ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ১৬ শতাংশের বেশি কমেছে। রপ্তানি কমার হার ইউরোপের সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমার তুলনায়ও অনেক বেশি। ফলে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮৬৪ কোটি ইউরো, যা গত বছরের একই সময়ের ১ হাজার ৩৪ কোটি ইউরোর তুলনায় ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মোট পোশাক আমদানি করেছে ৪ হাজার ১১০ কোটি ইউরোর, যা এক বছর আগের তুলনায় ৯ দশমিক ৭ শতাংশ কম। অর্থাৎ ইউরোপের বাজারে চাহিদা কমেছে ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ হারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যাটি শুধু অর্ডারের পরিমাণ কমে যাওয়ায় সীমাবদ্ধ নেই। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রথম ছয় মাসে ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ৮ দশমিক ২২ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে গড় রপ্তানি মূল্যও ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ কম পণ্য পাঠানোর পাশাপাশি প্রতি ইউনিট পণ্যের দামও কমেছে। ফলে আয় কমার চাপ তৈরি হয়েছে দুই দিক থেকেই। তবে জুন মাসে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে, এ মাসে রপ্তানি আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সামান্য বেড়ে ১৩৬ কোটি ইউরো হয়েছে।
রপ্তানিকারকেরা বলছেন, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ওপর একসঙ্গে কয়েকটি চাপ কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা। উৎপাদন ব্যাহত হলে সময়মতো পণ্য তৈরি ও জাহাজীকরণ কঠিন হয়ে পড়ে। ইউরোপের ক্রেতাদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ পোশাক ব্যবসায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছানো সরবরাহকারীর সক্ষমতার অন্যতম মাপকাঠি। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে, জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি ইউরোপের সঙ্গে ভারত ও ভিয়েতনামের বাণিজ্যিক সুবিধা এবং বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের পর বাজারসুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তাও ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
এখানে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় পরিবর্তন হচ্ছে প্রতিযোগিতার ধরন। এত দিন ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের অন্যতম সুবিধা ছিল শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এই সুবিধা ধরে রাখা নিয়ে আলোচনা চলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন জিএসপি কাঠামো অনুযায়ী, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও তিন বছরের একটি রূপান্তরকালীন সময়ে বর্তমান ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ সুবিধা পাবে, অন্তত ২০২৯ সালের শেষ পর্যন্ত। এরপর কী ধরনের সুবিধা থাকবে, সেটি বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি এবং জিএসপি প্লাসের মতো বিকল্প সুবিধা নিয়ে কাজ করছে।
অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্তবাণিজ্য চুক্তি এবং ভিয়েতনামের বিদ্যমান বাণিজ্যচুক্তি বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ আরও কঠিন করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আলোচনার ফলাফলে পোশাকসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতগুলোতে ভারতের বাজারসুবিধা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ভিয়েতনামের ক্ষেত্রেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির অধীনে ধাপে ধাপে শুল্ক কমছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য শুধু কম দামে পোশাক উৎপাদন করাই যথেষ্ট হবে না; সময়মতো সরবরাহ, পণ্যের মান, নকশা, উৎপাদন দক্ষতা এবং বাণিজ্যসুবিধা, সবকিছুর ওপর একসঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে।
প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর পরিসংখ্যানেও বাংলাদেশের চাপের বিষয়টি স্পষ্ট। বছরের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপে চীনের পোশাক রপ্তানি ৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ কমে ১ হাজার ১৮২ কোটি ইউরো হয়েছে। অন্যদিকে ভিয়েতনামের রপ্তানি সামান্য বেড়ে ২০৬ কোটি ইউরো হয়েছে। ইউরোপের বাজারে ভিয়েতনামের গড় ইউনিট মূল্যও ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়ে কেজিপ্রতি ২৯ দশমিক ৩২ ইউরো হয়েছে। অর্থাৎ দেশটি শুধু বেশি পণ্য বিক্রির ওপর নির্ভর করছে না, তুলনামূলক বেশি দামের পোশাকেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। একই সময়ে ভারতের রপ্তানি ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং তুরস্কের ১৪ দশমিক ৬০ শতাংশ কমেছে।
বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য তাই বর্তমান পতনকে শুধু ইউরোপের দুর্বল চাহিদার ফল হিসেবে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। ইউরোপের মোট আমদানি যেখানে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে, সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এই ব্যবধান বলছে, বাজার সংকোচনের পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিযোগিতা সক্ষমতার প্রশ্নও সামনে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের ইউরোপীয় বাজারে শুল্ক ও উৎপত্তির নিয়ম পরিবর্তনের কারণে পোশাক রপ্তানিতে প্রতিযোগিতার চাপ বাড়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
এখন বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই পরিবর্তনের সঙ্গে কত দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়া যায়। জ্বালানি সরবরাহ নির্ভরযোগ্য করা, উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা, পণ্যের মূল্য সংযোজন বাড়ানো এবং ইউরোপের সঙ্গে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যসুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পোশাকের বাজারও বৈচিত্র্যময় করতে হবে। কারণ ইউরোপ বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পোশাক বাজারগুলোর একটি; এই বাজারে প্রতিযোগিতায় সামান্য দুর্বলতাও দেশের মোট রপ্তানি আয়ে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

