বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশই চট্টগ্রাম বন্দরনির্ভর। তাই একটি জাহাজ বা কনটেইনার বন্দরে কয়েক দিন বেশি পড়ে থাকা শুধু আমদানিকারকের সমস্যা নয়; এর প্রভাব পড়ে কারখানার উৎপাদন, পণ্যের সরবরাহ, ব্যবসার নগদ প্রবাহ এবং শেষ পর্যন্ত বাজারদরের ওপরও। চলুন ব্যাপারটি বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা যাক।
চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি করা কনটেইনার কতক্ষণ পড়ে থাকে, তার হিসাব নিয়ে বিভিন্ন উৎসে কিছুটা পার্থক্য আছে। বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিকস পারফরম্যান্স সূচকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি কনটেইনারের গড় ‘ডুয়েল টাইম’ ছিল ৭ দশমিক ৮ দিন, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ৮ দশমিক ৩ দিনে দাঁড়ায়। আবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ২০২২ সালের ‘টাইম রিলিজ স্টাডি’তে সমুদ্রপথে পণ্য বন্দরে আসা থেকে খালাস পর্যন্ত গড় সময় পাওয়া যায় প্রায় ১১ দিন ৬ ঘণ্টা। সাম্প্রতিক তথ্যেও পরিস্থিতি খুব বেশি বদলায়নি; ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালেও চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনারের গড় ডুয়েল টাইম ১১ দিনের ওপরে ছিল। এখানে, শুধু কাস্টমসের একটি ধাপকে দায়ী করলে সমস্যাটির পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।
এখানেই সমস্যার আসল জায়গা নির্ণয় করা কঠিন কেননা, পণ্য খালাস একটি একক প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। জাহাজ বন্দরে আসার পর কনটেইনার নামানো, ইয়ার্ডে রাখা, আমদানিকারকের কাস্টমস ঘোষণা, পণ্যের মূল্য ও শুল্ক নির্ধারণ, প্রয়োজন হলে পরীক্ষা বা নমুনা সংগ্রহ, শুল্ক-কর পরিশোধ, শিপিং এজেন্টের ডেলিভারি অর্ডার, বন্দর কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিকতা, সব মিলিয়েই একটি কনটেইনার বাইরে আসে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ২০২২ সালের গবেষণায় চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে কাস্টমস ঘোষণার পর পণ্য ছাড়াতেই গড়ে প্রায় ৮ দিন ১ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। গবেষণাটি নিজেই বলেছে, বন্দর, কাস্টমস ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার কাজের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় ধাপ বাদ দেওয়া এবং পণ্য পরীক্ষার আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা জরুরি।
তবে সব দেরির জন্য কাস্টমসকে দায়ী করাও ঠিক হবে না। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, অনেক ক্ষেত্রে আমদানিকারক সময়মতো ‘বিল অব এন্ট্রি’ জমা না দেওয়ায় কাস্টমসের প্রক্রিয়াই শুরু হতে দেরি হয়। আবার শিপিং এজেন্টের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পেতে দেরি হলেও পুরো প্রক্রিয়া পিছিয়ে যায়। অর্থাৎ সমস্যা অনেকটা একটি শৃঙ্খলের মতো এক জায়গায় দেরি হলে পরের ধাপও আটকে যায়। একই প্রতিবেদনে কাস্টমস কর্মকর্তারা বলেছেন, বিল অব এন্ট্রি জমা দেওয়ার পর প্রক্রিয়াটি আগের তুলনায় অনেক দ্রুত হচ্ছে। ফলে শুধু কাগজপত্র ডিজিটাল করলেই হবে না; আমদানিকারক, শিপিং এজেন্ট, কাস্টমস, বন্দর এবং অন্যান্য সংস্থার কাজ একই গতিতে এগোতে হবে।
এর সঙ্গে আছে বন্দরের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার হলেও বড় সমুদ্রগামী জাহাজ সরাসরি সেখানে ঢোকার ক্ষেত্রে গভীরতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশের ৯০ শতাংশের বেশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিমাণ এবং প্রায় ৯৮ শতাংশ কনটেইনার বাণিজ্য চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। অথচ বর্তমান বন্দরে নির্দিষ্ট সময় ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে তুলনামূলক ছোট ফিডার জাহাজই বেশি ব্যবহার করতে হয়। এ কারণে বড় জাহাজ থেকে আঞ্চলিক হাবে পণ্য নামিয়ে পরে ছোট জাহাজে বাংলাদেশে আনার প্রয়োজন হয়, যা সময় ও পরিবহন খরচ দুটিই বাড়াতে পারে।
এখন আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে এই দেরির দাম কে দেয়? প্রথম ধাক্কা পড়ে আমদানিকারকের ওপর। কনটেইনার নির্ধারিত সময়ের বেশি বন্দরে থাকলে স্টোরেজ বা ডেমারেজ খরচ বাড়ে। বাংলাদেশ কাস্টমসের ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় চট্টগ্রাম বন্দরের স্টোরেজ ভাড়ার কাঠামোতে দেখা যায়, ২০ ফুট কনটেইনারের ক্ষেত্রে প্রথম চার দিন কোনো স্টোরেজ ভাড়া নেই; পঞ্চম থেকে সপ্তম দিনে প্রতিদিন ৬ ডলার, অষ্টম থেকে ২০তম দিনে ১২ ডলার এবং ২১তম দিন থেকে প্রতিদিন ২৪ ডলার হারে ভাড়া প্রযোজ্য। ৪০ ফুট কনটেইনারে এই হার দ্বিগুণ। অর্থাৎ কয়েক দিন অতিরিক্ত আটকে থাকা একটি কনটেইনারের খরচ দ্রুত বাড়তে পারে।
কিন্তু ব্যবসার প্রকৃত ক্ষতি শুধু ডেমারেজের টাকায় শেষ হয় না। কোনো পোশাক কারখানার কাপড় বা আনুষঙ্গিক পণ্য বন্দরে আটকে থাকলে উৎপাদন পিছিয়ে যেতে পারে। কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল সময়মতো না এলে তাকে অতিরিক্ত মজুত রাখতে হয়, বিকল্প উৎস থেকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হতে পারে অথবা উৎপাদন কমাতে হয়। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো অনিশ্চিত সরবরাহ ও দীর্ঘ লিড টাইমের কারণে বেশি মজুত ধরে রাখতে বাধ্য হয়; ফলে ইনভেন্টরি ধরে রাখার খরচ লজিস্টিকস ব্যয়ের বড় অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
আর শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি খরচের একটা অংশ ব্যবসায়ীর লাভ কমিয়ে দেয়, আরেকটা অংশ পণ্যের দামে চলে যেতে পারে। অর্থাৎ বন্দরে একটি কনটেইনারের অতিরিক্ত কয়েক দিনের অপেক্ষা সরাসরি দোকানের তাক পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। আমদানিকৃত শিল্পের কাঁচামালের ক্ষেত্রে প্রভাব আরও বড় উৎপাদন ব্যাহত হলে শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের আয় নয়, শ্রমিকের কাজ, সরবরাহকারীর অর্ডার এবং রপ্তানি চালানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশ্বব্যাংক তাই বন্দর ও লজিস্টিকসের দক্ষতাকে শুধু পরিবহন খাতের বিষয় হিসেবে দেখছে না; এর সঙ্গে বাংলাদেশের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি প্রতিযোগিতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
তবে চিত্রের অন্য দিকও আছে। চট্টগ্রাম বন্দর গত কয়েক বছরে কনটেইনার ও পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে রেকর্ড করেছে। ২০২৫ সালে বন্দরটি ৩৪ লাখের বেশি টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডল করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৭ শতাংশের মতো বেশি; একই সময়ে মোট কার্গো হ্যান্ডলিংও বেড়েছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে একাধিক দিনে জাহাজের অপেক্ষার সময় শূন্যেও নেমে এসেছিল। অর্থাৎ বন্দর কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বাড়ছে এবং সব সময় একই মাত্রার জট থাকে এমনও নয়। কিন্তু বাণিজ্যের পরিমাণ যত দ্রুত বাড়ছে, সেই তুলনায় অবকাঠামো, কাস্টমস, ইয়ার্ড, সড়ক-রেল সংযোগ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে সাময়িক উন্নতি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে না।
এ কারণেই শুধু নতুন ক্রেন কেনা বা কাস্টমস ডিজিটাল করাকে সমাধান হিসেবে দেখলে হবে না। প্রয়োজন পুরো সরবরাহব্যবস্থাকে একসঙ্গে দ্রুত করা। আমদানিকারক যাতে আগেই প্রয়োজনীয় ঘোষণা দিতে পারেন, কাস্টমস যাতে ঝুঁকির ভিত্তিতে কম ঝুঁকির চালান দ্রুত ছাড়তে পারে, পরীক্ষাগার ও স্ক্যানিং সুবিধা বাড়ে, শিপিং এজেন্টের কাগজপত্র দ্রুত পাওয়া যায় এবং বন্দর থেকে কনটেইনার বের করে সড়ক, রেল বা নৌপথে দ্রুত গন্তব্যে নেওয়া যায় সবগুলো ধাপকে একই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিজস্ব কৌশলগত পরিকল্পনাতেও চট্টগ্রামে কাস্টমসের গড় ছাড়পত্রের সময় মাপা, বিভিন্ন ধাপের তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডোর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তনের আশা করা হচ্ছে বে টার্মিনাল থেকেও। বিশ্বব্যাংক ৬৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ন অনুমোদন করেছে এই প্রকল্পে। গভীর সমুদ্রবন্দর সুবিধা তৈরি হলে বড় জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারবে, জাহাজের ঘুরে দাঁড়ানোর সময় কমবে এবং পরিবহন ব্যয়ও কমার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, উন্নত সুবিধার কারণে অর্থনীতিতে দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে। তবে নতুন অবকাঠামো একা সমস্যার সমাধান করবে না। বন্দরের বাইরে কাস্টমস, শিপিং এজেন্ট, আমদানিকারক, পরিবহন, গুদাম ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার কাজ যদি আগের গতিতেই চলে, তাহলে নতুন বন্দরের সক্ষমতার পুরো সুফল পাওয়া যাবে না।
বাংলাদেশের জন্য তাই বন্দরে পণ্য খালাসের সময়কে শুধু ‘কয়েক দিন দেরি’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিটি অতিরিক্ত দিন মানে কোথাও বাড়তি ডেমারেজ, কোথাও বাড়তি সুদ, কোথাও কারখানায় কাঁচামালের অপেক্ষা, আবার কোথাও পণ্যের দাম বাড়ার চাপ। বিশ্ববাজারে যেখানে ক্রেতারা দ্রুত সরবরাহ ও নির্ভরযোগ্য লিড টাইমকে গুরুত্ব দেন, সেখানে বন্দর থেকে পণ্য দ্রুত বের করতে না পারা বাংলাদেশের ব্যবসার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকেও দুর্বল করে।

