বাজারদর কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রেখে সাধারণ ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে নতুন এক পরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ। বর্তমানে চালু থাকা স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডভিত্তিক পণ্য বিতরণ ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে এবার খোলাবাজারে নির্দিষ্ট কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির একটি পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে সংস্থাটি। এই পরিকল্পনার আওতায় বিদেশ থেকে তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে সংগৃহীত পণ্য কোনোরকম সরকারি ভর্তুকি ছাড়াই বাজারদরের চেয়ে কিছুটা কম দামে বিক্রি করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান।
তিনি জানান, এটি সম্পূর্ণ নতুন একটি উদ্যোগ, যার সূত্রপাত হয়েছে বর্তমান সরকারের চিন্তা থেকে। প্রাথমিকভাবে ভোজ্যতেল দিয়ে এই পাইলট কার্যক্রম শুরু হবে। প্রায় বিশ হাজার মেট্রিক টন ভোজ্যতেলের প্রথম চালান আগামী সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
চেয়ারম্যান বলেন, তেল দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও ভবিষ্যতে ডাল ও চিনির মতো অন্যান্য পণ্যও কম দামে সংগ্রহ করা গেলে সেগুলোও একইভাবে বিক্রির আওতায় আনা হবে। এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো, স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধাভোগীদের মধ্যে বিক্রি সীমাবদ্ধ না রেখে সব শ্রেণির ভোক্তাকেই নির্বাচিত পণ্য কেনার সুযোগ করে দেওয়া। তার ভাষায়, খোলাবাজারে যে কেউ চাইলেই এসব পণ্য কিনতে পারবেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে তিন থেকে চার মাস এই কার্যক্রম পরীক্ষামূলকভাবে চালিয়ে বাজারের প্রতিক্রিয়া যাচাই করা হবে। প্রথম চালানকে একটি ‘পাইলট লট’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, আর এই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে সংগৃহীত পণ্য কার্যকরভাবে বিক্রি করা যায় কি না তার ওপর। চেয়ারম্যানের ভাষায়, পণ্য এনে যদি তা বিক্রি করা না যায়, তাহলে কার্যক্রম টেকসই হবে না; বিক্রি সফল হলেই এটি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই খোলাবাজার বিক্রয় কার্যক্রমে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ভর্তুকি দেওয়া হবে না। বরং প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সংগ্রহ করে অপেক্ষাকৃত কম মুনাফায় তা বিক্রি করার মাধ্যমে ভোক্তাদের উপকৃত করার চেষ্টা করা হবে। তার হিসাব অনুযায়ী, পণ্যভেদে ও সংগ্রহমূল্যের তারতম্য অনুযায়ী প্রচলিত বাজারদরের তুলনায় প্রতি ইউনিটে প্রায় দশ থেকে বারো টাকা পর্যন্ত কম দামে পণ্য বিক্রি করা সম্ভব হতে পারে।
তিনি আরও জানান, এটি কোনো মৌসুমভিত্তিক কার্যক্রম হবে না। বরং পরীক্ষামূলক পর্যায়ের ফলাফল পর্যালোচনা করে সফল হলে ভবিষ্যতে এর পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে ভোজ্যতেলের দাম তুলনামূলক বেশি এবং বাজারে এর চাহিদাও যথেষ্ট শক্তিশালী থাকায় প্রাথমিকভাবে এই পণ্য দিয়েই কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
সামনের দিনগুলোতে চিনি ও ডালসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যও প্রতিযোগিতামূলক দামে সংগ্রহ করা সম্ভব হলে সেগুলোও ধীরে ধীরে খোলাবাজার বিক্রির আওতায় আনা হতে পারে বলে জানান তিনি। তবে সব পণ্যের ক্ষেত্রেই বাজারে হস্তক্ষেপ করা হবে না—সরবরাহ বা মূল্যে চাপ তৈরি হলে প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট পণ্য বাজারে ছাড়া হবে বলে তিনি স্পষ্ট করেন।
উল্লেখ্য, প্রস্তাবিত এই খোলাবাজার বিক্রয় কার্যক্রম বিদ্যমান ভর্তুকিমূল্যে স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে পণ্য বিতরণ ব্যবস্থার বিকল্প নয়, বরং এটি হবে তার পাশাপাশি চলা একটি বাড়তি কার্যক্রম। চেয়ারম্যান জানান, এই কার্যক্রম পরিচালিত হবে সংস্থাটির বিদ্যমান দায়িত্ব-কাঠামোর আওতাতেই, এর জন্য আলাদা কোনো নাম বা নতুন কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে না।
অর্থায়ন প্রসঙ্গে তিনি জানান, এই পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে বাড়তি কোনো বাজেট বরাদ্দের প্রয়োজন হবে না, কারণ চলতি অর্থবছরের বাজেটেই প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা আছে।
সবশেষে তিনি আশা প্রকাশ করেন, পাইলট কার্যক্রম সফল হলে ভবিষ্যতে এর পরিধি আরও বাড়ানো হবে। প্রতিযোগিতামূলক দামে সংস্থাটির উপস্থিতি খোলাবাজারে বৃদ্ধি পেলে তা সামগ্রিক বাজারদর কমাতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন। তার ভাষায়, বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য সরবরাহ করা গেলে স্বাভাবিকভাবেই দাম কমতে শুরু করবে।
সব মিলিয়ে নতুন এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো একটি বিকল্প পণ্য সংগ্রহ ও বিক্রয় ব্যবস্থার মাধ্যমে সাধারণ ভোক্তাদের কাছে নির্বাচিত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য তুলনামূলক কম দামে পৌঁছে দেওয়া। প্রাথমিক পর্যায়ে সীমিত পরিসরে এই ব্যবস্থা যাচাই করে পরবর্তীতে এর সফলতার ভিত্তিতে বৃহত্তর পরিসরে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

