ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের ঝামেলা কমাতে পাঁচ বছরের মেয়াদের সুবিধা আরও সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নবায়নের সময় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দেওয়া ৩ হাজার টাকার কর কমানোর জন্য ব্যবসায়ীদের সরকারের কাছে দাবি জানানোর পরামর্শ দিয়েছেন ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আবদুস সালাম।
১৬ আগস্ট ঢাকায় ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) ও ডিএসসিসির যৌথ আয়োজনে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, আইনশৃঙ্খলা, যানজট ও ট্রেড লাইসেন্স নবায়নসংক্রান্ত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। আবদুস সালাম জানান, ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের জন্য সেবা আরও সহজ করতে ট্রেড লাইসেন্সের নবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ চলছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একবার নবায়ন করে দীর্ঘ সময়ের জন্য লাইসেন্স কার্যকর রাখার সুযোগকে আরও কার্যকর করা হবে, যাতে ব্যবসায়ীদের প্রতিবছর একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে না হয়। তবে তথ্যের দিক থেকে মনে রাখা দরকার, ডিএসসিসিতে এক থেকে পাঁচ বছরের জন্য ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া ও নবায়নের ব্যবস্থা ২০২৩ সাল থেকেই চালু রয়েছে। সে সময় ডিএসসিসি জানিয়েছিল, ডিজিটাল ব্যবস্থায় পাঁচ বছর পর্যন্ত ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করা যাবে।
ব্যবসায়ীদের জন্য মূল সুবিধাটি হলো, প্রতিবছর লাইসেন্স নবায়নের প্রশাসনিক ঝামেলা কমানো। ছোট ও মাঝারি ব্যবসার ক্ষেত্রে একটি লাইসেন্স নবায়নের জন্য সময়, কাগজপত্র ও অফিসে যোগাযোগের প্রয়োজন তৈরি হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি নবায়নের সুযোগ থাকলে ব্যবসায়ীরা এসব কাজে কম সময় দিয়ে মূল ব্যবসায় বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন। ২০২৩ সালে পাঁচ বছরের ব্যবস্থা চালুর সময়ও ব্যবসায়ীদের বার্ষিক নবায়নের ঝামেলা কমানো এবং ব্যবসার পরিবেশ সহজ করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল।
আবদুস সালাম বলেন, ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের সময় এনবিআরের জন্য যে ৩ হাজার টাকা দেওয়া হয়, সেটি সিটি করপোরেশনের রাজস্বের অংশ নয়। এ কারণে ব্যবসায়ীদের এই অর্থের বিষয়টি সরকারের কাছে তুলে ধরে কমানোর দাবি জানানো উচিত। ৩ হাজার টাকার এই অর্থ নিয়ে ব্যবসায়ীদের আপত্তি অবশ্য নতুন নয়। এর আগে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ কয়েকটি এলাকায় ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অগ্রিম আয়কর বাড়ানোর পর ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো আপত্তি জানিয়েছিল। ২০১৯ সালে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ব্যবসায়ীদের জন্য এই কর ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার টাকা করা হয়েছিল।
ডিএসসিসি প্রশাসক আরও বলেন, আবেদন করার দিনই ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং কোনো ধরনের অযথা বিলম্ব তিনি মেনে নেবেন না। সিটি করপোরেশন এরই মধ্যে অনলাইন ও ডিজিটাল সেবা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, যাতে ব্যবসায়ী ও নাগরিকেরা ঘরে বসেই কর পরিশোধ এবং ট্রেড লাইসেন্সসংক্রান্ত কাজ করতে পারেন। তবে জাল ট্রেড লাইসেন্স তৈরির ঘটনায় ডিজিটাল সেবা ব্যবস্থায় সাময়িক জটিলতা তৈরি হয়েছিল বলেও তিনি জানান। ব্যবসার অনুমোদন ও নবায়নের মতো নিয়মিত সেবায় এমন জটিলতা কমানো জরুরি, কারণ সময়মতো লাইসেন্স না পাওয়া ছোট ব্যবসার জন্য বাড়তি খরচ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
আলোচনায় পুরান ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের ঐতিহ্য নিয়েও কথা বলেন ডিএসসিসি প্রশাসক। তাঁর মতে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি ধীরে ধীরে উত্তরা বা রাজধানীর অন্য এলাকায় চলে যায়, তাহলে পুরান ঢাকার দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক গুরুত্ব কমে যেতে পারে। তাই পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীদের ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা বাড়ানো এবং ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাকেন্দ্রগুলোর পরিবেশ উন্নত করার ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন বাজারগুলোর বকেয়া ভাড়া, কর ও ট্রেড লাইসেন্সসংক্রান্ত পুরোনো জটিলতা ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও করপোরেশন কর্মকর্তাদের আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের প্রস্তাব দেন।
রাজধানীর যানজট ও ফুটপাত দখলের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। আবদুস সালাম ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এবং ফুটপাতের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসাকে নগর ব্যবস্থাপনার বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে মানবিক কারণে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের একেবারে উচ্ছেদ না করে তাদের নিবন্ধনের আওতায় এনে নিয়ন্ত্রণে আনার কথা জানান তিনি। নির্দিষ্ট সংখ্যক রিকশা ও হকারের তথ্যভিত্তিক ডেটাবেজ তৈরি করে শহরের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী লাইসেন্স দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও তিনি বলেন। অর্থাৎ ট্রেড লাইসেন্সকে শুধু রাজস্ব আদায়ের বিষয় হিসেবে না দেখে ব্যবসা ও নগর ব্যবস্থাপনার একটি নিয়মিত কাঠামোর অংশ হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে ডিএসসিসি।
ব্যবসায়ীদের জন্য পাঁচ বছরের ট্রেড লাইসেন্সের সুবিধা চালু হওয়া নতুন বিষয় না হলেও এই সুবিধা বাস্তবে কতটা সহজ, দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত করা যাচ্ছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ সালে পাঁচ বছরের লাইসেন্স চালুর সময়ও ডিএসসিসি জানিয়েছিল, ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা এই সেবা নিতে পারবেন। এখন যদি আবেদন থেকে নবায়ন, কর পরিশোধ এবং লাইসেন্স পাওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি আরও দ্রুত করা যায় এবং এনবিআরের ৩ হাজার টাকার করের চাপ কমানো যায়, তাহলে ছোট ব্যবসার জন্য এর বাস্তব সুফল আরও বাড়বে। এতে প্রতিবছর লাইসেন্স নবায়নের প্রশাসনিক ব্যস্ততা কমার পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশও কিছুটা সহজ হতে পারে।

