বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। দেশের মোট আমদানি-রপ্তানির ৮০ ভাগই এই বন্দর দিয়ে পরিচালিত হয়। ফলে বন্দরের কার্যক্রমে সামান্য ধীরগতিও শুধু জাহাজ বা কনটেইনারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পুরো ব্যবসা ও অর্থনীতিতে। পণ্য খালাসে দেরি হলে বাড়ে জাহাজের অপেক্ষার খরচ, কনটেইনার পড়ে থাকলে গুনতে হয় অতিরিক্ত অর্থ, আবার নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বিদেশি জাহাজ মালিক ও ব্যবসায়ীদের আস্থাতেও চাপ পড়ে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে একসঙ্গে কয়েকটি সমস্যা সামনে এসেছে। খালি কনটেইনারের চাপ, কনটেইনারের অবস্থান শনাক্ত করতে না পারা, জাহাজে জাহাজে সংঘর্ষ, নৌপথে জেলেদের জাল ফেলা, বহির্নোঙরে জলদস্যুতার অভিযোগ এবং বন্দরের বিভিন্ন কার্যক্রমে সমন্বয়ের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এসব সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে দেশের বাণিজ্যিক ব্যয় আরও বাড়বে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হবে।
ব্যবসায়ীদের মূল দাবি, বন্দরের প্রতিটি ধাপকে আরও দ্রুত ও সমন্বিত করতে হবে। জাহাজ থেকে পণ্য নামানো, শুল্ক যাচাই ও ছাড়পত্র দেওয়া, কনটেইনার সরিয়ে নেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত আমদানিকারকের কাছে পণ্য পৌঁছানোর পুরো প্রক্রিয়ায় কোথাও দীর্ঘসূত্রতা থাকলে তার আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীর ওপরই পড়ে। বহির্নোঙরে একটি জাহাজকে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হলে যেমন অতিরিক্ত ব্যয় হয়, তেমনি বন্দরের ইয়ার্ডে কনটেইনার দীর্ঘদিন পড়ে থাকলেও তৈরি হয় নতুন খরচ।
এই বাস্তবতায় ব্যবসায়ীরা বন্দরে নতুন স্ক্যানার যন্ত্র যুক্ত করা, নিরাপত্তা জোরদার করা এবং শুল্কসংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত কমানোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, শুধু বন্দরের অবকাঠামো থাকলেই হবে না, সেটিকে কার্যকর রাখতে পুরো ব্যবস্থাপনাকে একই গতিতে কাজ করতে হবে। একটি জায়গায় গতি বাড়িয়ে অন্য জায়গায় ধীরগতি থাকলে সামগ্রিকভাবে বন্দরের সক্ষমতা বাড়বে না।
খালি কনটেইনারেই বাড়ছে বন্দরের চাপ
চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতরে খালি কনটেইনারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াও এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন্দরের জায়গা সীমিত। সেখানে প্রয়োজনীয় পণ্যবাহী কনটেইনারের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক খালি কনটেইনার দীর্ঘ সময় পড়ে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই ইয়ার্ডের ওপর চাপ তৈরি হয়।
এই চাপ কমাতে গত ২৬ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে একটি চিঠি দেয়। সেখানে বন্দর ও অফডকের মতো বন্ডেড এলাকায় থাকা খালি কনটেইনার সরিয়ে নন-বন্ডেড এলাকায় রাখার অনুমতি চাওয়া হয়।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্দরের অভ্যন্তরে আমদানি করা সব এলসিএল কনটেইনার আনস্টাফিংসহ ৭০ শতাংশ এফসিএল কনটেইনার খুলে পণ্য সরবরাহ করা হয়। ফলে পণ্য খালাস হয়ে যাওয়ার পর খালি কনটেইনারের স্তূপ তৈরি হচ্ছে। এভাবে খালি কনটেইনার জমতে থাকলে পণ্যবাহী কনটেইনার রাখার জায়গাও সংকুচিত হয়ে আসে।
একই সমস্যা নিয়ে গত ৩০ জুলাই অর্থমন্ত্রীকে চিঠি দেয় চট্টগ্রাম চেম্বার। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা খালি কনটেইনার সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা না গেলে বন্দরের উৎপাদনশীলতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেওয়া কঠিন হবে।
এর পেছনে কনটেইনারের আকারের চাহিদার পার্থক্যও ভূমিকা রাখছে। ২০ ফুট কনটেইনারের তুলনায় ৪০ ফুট কনটেইনারের চাহিদা বেশি হওয়ায় অনেক ২০ ফুট খালি কনটেইনার দীর্ঘ সময় ব্যবহার ছাড়াই পড়ে থাকে। ফলে এগুলো একদিকে জায়গা দখল করছে, অন্যদিকে বন্দরের স্বাভাবিক পণ্য ব্যবস্থাপনায়ও বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু খালি কনটেইনার সরিয়ে ফেলার নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কনটেইনার ব্যবস্থাপনা, বন্দর ইয়ার্ডের ব্যবহার এবং পণ্য পরিবহনের সামগ্রিক পরিকল্পনা। দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যার সমাধান করতে হলে খালি কনটেইনার কোথায়, কত দিন এবং কীভাবে রাখা হবে—সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থাপনা দরকার।
কনটেইনার গায়েব হওয়ার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে
বন্দরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্নের আরেকটি কারণ একটি কনটেইনার খুঁজে না পাওয়ার ঘটনা। চলতি বছর ঢাকার খিলক্ষেত সুপার মার্কেটের ফাহিম অ্যাটায়ার অ্যান্ড কম্পোজিট লি. নামে একটি প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা ফেব্রিক্স পণ্যবাহী একটি কনটেইনারের অবস্থান নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।
এজাহার অনুযায়ী, চীন থেকে আসা ৪০ ফুট দীর্ঘ কনটেইনারটি ২১ জানুয়ারি টার্মিনাল পরিচালনাকারী মেসার্স সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের মাধ্যমে জাহাজ থেকে নামিয়ে চিটাগং কন্টেইনার টার্মিনালে রাখা হয়। পরে ২৮ এপ্রিল কাস্টমসের পণ্য যাচাইয়ের জন্য কনটেইনারটি নির্ধারিত ছিল। কিন্তু টার্মিনালের ইয়ার্ডের নথি অনুযায়ী, তখন কনটেইনারটির অবস্থান খুঁজে পাওয়া যায়নি।
একটি বন্দর ব্যবস্থাপনায় পণ্যবাহী কনটেইনারের অবস্থান শনাক্ত করতে না পারা স্বাভাবিকভাবেই বড় প্রশ্ন তৈরি করে। কারণ আমদানি করা পণ্য শুধু ব্যবসায়ীর অর্থের সঙ্গে যুক্ত নয়, এর সঙ্গে শুল্ক, সরবরাহব্যবস্থা এবং পরবর্তী উৎপাদন প্রক্রিয়াও জড়িত। ফলে এমন ঘটনায় ব্যবসায়ীর আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বন্দরের ব্যবস্থাপনা নিয়েও আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।
বিদেশিদের কাছে টার্মিনাল ইজারা নিয়েও বিরোধ
চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ও সিসিটি টার্মিনাল দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার বিষয়টিও বিতর্ক তৈরি করেছে। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি এবং শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বন্ধ এবং বন্দরকে জাতীয় মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে রাখার দাবি জানিয়ে আসছে।
এ নিয়ে চলমান আন্দোলন বন্দরের ভবিষ্যৎ পরিচালনা কাঠামো নিয়েও একটি বড় বিতর্ক সামনে এনেছে। একদিকে বন্দরের সক্ষমতা ও পরিচালনায় আধুনিক ব্যবস্থাপনা আনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, অন্যদিকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনায় বিদেশি অংশগ্রহণ কতটা উপযোগী—সেটি নিয়েও বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
এই বিতর্কের মধ্যেই বন্দরের দৈনন্দিন কার্যক্রমে যদি নিরাপত্তা, জাহাজ চলাচল ও পণ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন সমস্যা তৈরি হয়, তাহলে পুরো বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠতে পারে।
আগস্টেই একাধিক জাহাজ সংঘর্ষ
চট্টগ্রাম বন্দরের নৌপথের নিরাপত্তা নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চলতি মাসেই একাধিক জাহাজ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
গত ৩ আগস্ট দুপুরে মাল্টার পতাকাবাহী কনটেইনার জাহাজ ‘এমভি সিএনসি ইউরেনাস’ চট্টগ্রাম বন্দরের প্রবেশমুখে পৌঁছালে তার স্টিয়ারিং ব্যবস্থা বিকল হয়ে যায়। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে জাহাজটি প্রথমে ২ নম্বর লাল সংকেত বয়ায় ধাক্কা দেয়। পরে ভাসতে ভাসতে নৌবাহিনীর স্থাপনার পাশের পাথরের বাঁধে গিয়ে আটকে পড়ে।
এরপর গত ১৪ আগস্ট দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পাশাপাশি নোঙর করে থাকা ৩৩ হাজার টন ডিজেলবাহী ট্যাংকার ‘এমটি সি স্পাইক’ ও গমবাহী বাল্ক ক্যারিয়ার ‘এমভি সানশাইন’-এর মধ্যে সংঘর্ষ হয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এর মাত্র দুই দিন পর, গত ১৬ আগস্ট রাতে আরও একটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বহির্নোঙরে থাকা স্ল্যাগবাহী জাহাজ ‘এমভি আনাসসা’ প্রবল স্রোতের কারণে পাশের ‘এমভি জাহাব জাহান’-এর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
একই সময়ে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটায় স্বাভাবিকভাবেই বন্দরের নৌনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রতিটি দুর্ঘটনার কারণ আলাদা হতে পারে। কোথাও যান্ত্রিক ত্রুটি, কোথাও স্রোতের প্রভাব কাজ করতে পারে। কিন্তু দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নৌপথের সার্বিক ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
জেলেদের জালেও ঝুঁকিতে নৌযান
বন্দর চ্যানেল ও আশপাশের নৌপথে জেলেদের জাল ফেলা নিয়ে লাইটারেজ শ্রমিকদের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। তাদের দাবি, পতেঙ্গা জেলেপাড়া থেকে পারকি বিচ, শিপ চ্যানেল আলফা থেকে কুতুবদিয়া এবং পতেঙ্গা থেকে ভাসানচর পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় সাগরে ভাসমান ও বিন্দি জাল পেতে রাখা হচ্ছে।
নৌযানের চলাচলের পথে এসব জাল আটকে গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে জাহাজের পাখায় জাল জড়িয়ে গেলে নৌযানের নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি হতে পারে। আবার জাল কেটে সরানোর প্রয়োজন হলে জেলে ও নাবিকদের মধ্যে সংঘাতের পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
লাইটারেজ শ্রমিকদের দাবি, জাল সরাতে গেলে অনেক সময় জেলেরা হামলাত্মক আচরণ করেন এবং নাবিকদের লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে। সম্প্রতি ভাসানচর এলাকা থেকে দুই লাইটার জাহাজের দুই নাবিককে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে তাদের উদ্ধার করা হয়।
এই পরিস্থিতিতে গত ১০ আগস্ট বন্দর চেয়ারম্যানকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ন। চিঠিতে আগামী ২৫ আগস্টের মধ্যে নেভিগেশন চ্যানেল থেকে জাল সরানোর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়। তা না হলে বহির্নোঙরে লাইটার জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের সিনিয়র সহ-সভাপতি নবী আলমের ভাষ্য, বন্দরের চ্যানেলে জাল ফেলার কারণে শ্রমিকদের নিয়মিত ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এমনকি নিজেদের উদ্যোগে ডুবুরি নামিয়ে জাল সরানোর ঘটনাও ঘটছে। কিন্তু জাল সরাতে গেলে জেলেদের কাছ থেকে পাথর নিক্ষেপ ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
তবে জেলেদের পক্ষ থেকেও ভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। পতেঙ্গা ও পারকি এলাকার জেলেদের প্রতিনিধি এবং বোট মালিক মো. এরশাদ আলী বলেন, লাইটার জাহাজগুলো অনেক সময় নির্ধারিত সংকেত বা আলোর দিকে গুরুত্ব না দিয়ে জালের ওপর দিয়ে চলে যায়। এতে জাল নষ্ট হলেও জেলেরা ক্ষতিপূরণ পান না।
ফলে এখানে শুধু একটি পক্ষকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। নৌপথ কোথায় থাকবে, কোথায় মাছ ধরার জাল ফেলা যাবে এবং কোন এলাকায় বড় ও ছোট নৌযান চলাচল করবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট সীমারেখা ও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
জলদস্যুতার অভিযোগে বিদেশি জাহাজ মালিকদের উদ্বেগ
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে জলদস্যুতার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গত এক মাসের ব্যবধানে বহির্নোঙরে তিনটি বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজে জলদস্যুতার ঘটনা ঘটেছে বলে চট্টগ্রাম চেম্বার জানিয়েছে।
এ ঘটনায় কয়েক কোটি টাকার মালামাল, জাহাজের সরঞ্জাম এবং মূল্যবান যন্ত্রাংশ লুট হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এতে বিদেশি জাহাজ মালিক, নৌপরিবহন প্রতিষ্ঠান এবং নাবিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বহির্নোঙরের নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে গত ২২ আগস্ট নৌপরিবহন মন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর টহল বাড়ানোর পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি জোরদারের দাবি জানানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা সংস্থা রিজিওনাল কো-অপারেশন এগ্রিমেন্ট অন কমবেটিং পাইরেসি অ্যান্ড আর্মড রবারি এগেইনস্ট শিপস ইন এশিয়ার সর্বশেষ প্রতিবেদনে অবশ্য দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাস অর্থাৎ জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরে কোনো ধরনের দস্যুতা বা চুরির ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ভবিষ্যতের প্রতিবেদনে বন্দরের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণেই এখন শুধু ঘটে যাওয়া ঘটনা তদন্ত করলেই হবে না। কোথায় ঝুঁকি বেশি, কোন সময়ে নৌযান বেশি অসুরক্ষিত থাকে এবং কীভাবে দ্রুত নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়া যায়—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বহির্নোঙরের নিরাপত্তা কাঠামো নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন রয়েছে।
সমস্যা শুধু বন্দরের নয়, পুরো অর্থনীতির
চট্টগ্রাম বন্দরের এসব সমস্যাকে আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখলে মূল ঝুঁকিটা বোঝা কঠিন। একটি কনটেইনার কয়েক দিন বেশি পড়ে থাকা, একটি জাহাজকে বহির্নোঙরে অপেক্ষা করতে হওয়া, পণ্য খালাসে বিলম্ব, নৌপথে দুর্ঘটনা কিংবা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ—সবকিছুর শেষ প্রভাব গিয়ে পড়ে ব্যবসার ব্যয়ের ওপর।
ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানি করে শুধু বন্দরে রেখে দেওয়ার জন্য নয়। কাঁচামাল সময়মতো কারখানায় না পৌঁছালে উৎপাদন ব্যাহত হয়। তৈরি পণ্য সময়মতো জাহাজে উঠতে না পারলে রপ্তানির সময়সূচি নষ্ট হয়। জাহাজ অপেক্ষা করলে অতিরিক্ত খরচ হয়। কনটেইনার পড়ে থাকলে বাড়তি অর্থ গুনতে হয়। আর এসব ব্যয়ের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তার ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে বিদেশি জাহাজ মালিকদের উদ্বেগ বাড়তে থাকলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ভাবমূর্তিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিদেশি ব্যবসায়ীরা কোনো বন্দরে পণ্য পাঠানোর আগে শুধু অবকাঠামো দেখেন না, নিরাপত্তা, দ্রুত পণ্য খালাস, নির্ভরযোগ্যতা এবং পরিচালনার দক্ষতাও বিবেচনা করেন।
এই জায়গাতেই চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান সমস্যাগুলোকে বড় অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
দ্রুত সমাধান ছাড়া সামনে চাপ আরও বাড়তে পারে
চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ মনে করেন, বন্দর চ্যানেল বা বহির্নোঙরে জাহাজের সংঘর্ষ, নৌযান চলাচলের পথে জেলেদের জাল ফেলা এবং বহির্নোঙরে জলদস্যুতার মতো সমস্যার সমাধানে বন্দর কর্তৃপক্ষকেই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে বন্দরের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম অবশ্য জানিয়েছেন, প্রাকৃতিক কারণ বা স্রোতের টানে জাহাজ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার তদন্ত চলছে এবং তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত কারণ জানা যেতে পারে। নৌযান চলাচলের পথে জেলেদের জাল ফেলার বিষয়েও কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে বলে তিনি জানান। জেলেদের সচেতন করতে গণবিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে এবং বন্দরের বহির্নোঙরে সার্বিক নিরাপত্তা বাড়াতে নিয়মিত অভিযানও চলছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজন সমন্বিত ব্যবস্থা। বন্দরের ভেতরে পণ্য ব্যবস্থাপনা যেমন দ্রুত করতে হবে, তেমনি বহির্নোঙরে জাহাজ চলাচলও নিরাপদ করতে হবে। খালি কনটেইনারের চাপ কমাতে হবে, কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি বাড়াতে হবে এবং শুল্ক ছাড়পত্রের প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশের ৮০ ভাগ আমদানি-রপ্তানি যে বন্দরের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে কোনো একটি সমস্যাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ বন্দরের গতি কমে গেলে শুধু জাহাজ থামে না, থেমে যেতে পারে উৎপাদনের কাঁচামাল, রপ্তানির পণ্য এবং ব্যবসার অর্থপ্রবাহও।
চট্টগ্রাম বন্দর তাই এখন শুধু একটি অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানের জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। এটি দেশের ব্যবসার খরচ, আমদানি-রপ্তানির গতি, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বন্দরের প্রতিটি ঘণ্টার অদক্ষতা শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। আর সেই চাপ কমাতে হলে নিরাপত্তা, নৌচলাচল, কনটেইনার ব্যবস্থাপনা, শুল্ক কার্যক্রম এবং পণ্য খালাস—সবকিছুকে একই পরিকল্পনার আওতায় এনে দ্রুত কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি।

