উত্তরবঙ্গের অন্যতম বড় শিল্প এলাকা হিসেবে পরিচিত সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কে গ্যাস-সংযোগ নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা কাটছে না। প্রায় ৭৬ কোটি টাকা অগ্রিম পরিশোধ করার পরও গ্যাসলাইন স্থাপনের কাজ চার বছর ধরে ঝুলে থাকায় শিল্পপার্কে বিনিয়োগ করা উদ্যোক্তারা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলী, পশ্চিম মোহনপুর, বনবাড়িয়া, বেলটিয়া ও মোরগ্রাম—এই পাঁচটি মৌজা জুড়ে প্রায় ৪০০ একর জমিতে গড়ে তোলা হয়েছিল এই শিল্পপার্ক। ২০১০ সালের জুলাই মাসে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল এবং ২০১৪ সালের জুনের মধ্যে তা শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই সময়সীমা সাতবার বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্পের ব্যয়ও বহুগুণ বেড়ে গেছে—শুরুতে ৩৭৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা ধরা হলেও পরবর্তীতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭১৯ কোটি ২১ লাখ টাকায়। খাতাকলমে ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটি সম্পন্ন দেখানো হলেও মাঠপর্যায়ে অনেক কাজই এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
শিল্পপার্কের প্লট বরাদ্দ ব্যবস্থাপনায় দেখা যায়, মোট ২৭৫ একর জমিতে তিনটি শ্রেণিতে ৮২৯টি প্লট তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫০টি প্লট বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য এবং ২৭৯টি প্লট দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য নির্ধারিত। আয়তনের দিক থেকে একটি শ্রেণির প্লট ২০ হাজার বর্গফুট, আরেকটির ১০ হাজার বর্গফুট, আর সবচেয়ে ছোট শ্রেণির প্লটগুলো ৬ থেকে ২৬ হাজার বর্গফুট পর্যন্ত। এ পর্যন্ত দুই ধাপে মোট ২৭২টি প্লট দেশীয় উদ্যোক্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
মূল সমস্যা তৈরি হয়েছে গ্যাস-সংযোগ নিয়ে। শিল্পপার্কে ব্যবহারের জন্য অভ্যন্তরীণ গ্যাসলাইন স্থাপনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল একটি সরকারি গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন ২০২২ সালের ২০ জুন প্রায় ৭৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা অগ্রিম হিসেবে ওই প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, শিল্পপার্কের মূল ফটক পর্যন্ত পাইপলাইন টানার পর কাজ থমকে আছে। ভেতরের অংশে গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় লাইন স্থাপনের কাজ এখনো শুরুই হয়নি।
এই দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি প্রশাসনিক পর্যায়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে। সম্পূর্ণ অর্থ পাওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর বাণিজ্যিক নিরীক্ষা অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট অনিয়ম চিহ্নিত করে একটি আনুষ্ঠানিক নোটিশ জারি করে। এরপর চলতি বছরের ৪ এপ্রিল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগ থেকে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বরাবর কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য একটি তাগিদপত্র পাঠানো হয়। এর কয়েক দিন পর, ২০ এপ্রিল, শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিসিক শাখা থেকেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে একই ধরনের তাগাদা দেওয়া হয়। তবে এত দফা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের পরও বাস্তবে কাজের অগ্রগতি খুব একটা চোখে পড়েনি।
শিল্পপার্কের প্রধান কর্মকর্তা হিরণ্ময় বর্দ্ধন জানান, গ্যাসলাইন স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠান কাজ শেষ না করায় উদ্যোক্তারা ক্রমাগত বিসিককে চাপ দিচ্ছেন। তিনি বলেন, বিষয়টি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে জানানো হয়েছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও তাগিদপত্র পাঠিয়েছে। প্রয়োজনে বিসিক আবারও তাগাদা দেবে বলে তিনি জানান। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, জ্বালানি ও গ্যাস-সংযোগের পুরো বিষয়টি এখন সম্পূর্ণভাবে ওই গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
এদিকে গ্যাসের অনিশ্চয়তার প্রভাব সরাসরি পড়ছে উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনায়। একজন কাগজ কারখানার মালিক জানান, তিনি এই শিল্পপার্কে চারটি প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন, কিন্তু প্লট উন্নয়নের কাজও যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি গ্যাসলাইনও স্থাপিত হয়নি। ফলে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে তিনি দ্বিধায় রয়েছেন। আরেকজন ভোজ্যতেল কারখানার মালিক বলেন, তাঁর ছয়টি প্লটেই মাটি ভরাটের কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় নিজের টাকা খরচ করে তা সম্পন্ন করতে হয়েছে। বর্তমানে যন্ত্রপাতি বসানোর কাজ চলছে এবং গ্যাস সংযোগ পেলেই দ্রুত উৎপাদনে যাওয়ার পরিকল্পনা তাঁর।
খাদ্য ও পানীয় প্রস্তুতকারী একটি প্রতিষ্ঠানের একজন পরিচালক জানান, সমবায় সমিতির মাধ্যমে দুটি প্লটের জন্য টাকা পরিশোধ করার পর এখন তিনি জানতে পারছেন যে গ্যাস সরবরাহ নেই। তাঁর মতে, গ্যাসলাইন না থাকলে ব্যাংক থেকে বিনিয়োগ ঋণ পাওয়াও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। আরেকজন উদ্যোক্তা জানান, গ্যাস-সংযোগ থাকবে ধরে নিয়েই তিনি প্লট বরাদ্দ নিয়েছিলেন, কিন্তু এখন লাইন স্থাপিত না হওয়ায় নতুন করে বিনিয়োগ করতে সাহস পাচ্ছেন না।
পরিস্থিতির চাপে স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তা মালিক সমিতি এখন কড়া অবস্থান নিয়েছে। সমিতির সভাপতি জানিয়েছেন, জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো উদ্যোক্তাই এখানে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন না, এবং গ্যাস না থাকলে ব্যাংকও ঋণ দিতে রাজি হবে না। দ্রুত গ্যাসলাইন স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় সব সেবা নিশ্চিত করা না হলে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের কিস্তি জমা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন উদ্যোক্তারা—এমনটাই জানানো হয়েছে সমিতির পক্ষ থেকে।
অন্যদিকে গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে পাইপলাইন স্থাপনের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর সরকারিভাবে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হলেই সংযোগ দেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, প্রশাসনিক তাগাদা, নিরীক্ষা অধিদপ্তরের নোটিশ এবং মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও বাস্তবে গ্যাসলাইন স্থাপনের অগ্রগতি সীমিত। এতে একদিকে যেমন কোটি কোটি টাকা অগ্রিম দিয়েও প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছেন না উদ্যোক্তারা, তেমনি সরকারের জাতীয় শিল্পায়ন লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু প্রশাসনিক চিঠি চালাচালির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এই দীর্ঘসূত্রতা কাটার সম্ভাবনা কম। উদ্যোক্তাদের কিস্তি বন্ধের হুঁশিয়ারি প্রমাণ করে, বিষয়টি এখন কেবল প্রশাসনিক সমস্যা নয়—শিল্পপার্কের ভবিষ্যৎ টিকে থাকার প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।

