বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গত দুই বছরে একের পর এক বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপের পরও দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। তবে এর প্রভাবে বাণিজ্যের পথ ও ব্যয় বদলে গেছে। সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় একই জায়গায় রয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশ ১০ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। আগের অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ৯ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। বিপরীতে, ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের অর্থবছরের ১ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় সামান্য কম।
এর ফলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি আরও বেড়েছে। বর্তমানে ভারত থেকে বাংলাদেশে যে পরিমাণ পণ্য আসে, দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি তার ছয় ভাগের এক ভাগেরও কম। চীনের পর ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার।
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের বাণিজ্যে বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এর মধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ ছিল স্থলবন্দরকেন্দ্রিক, যেসব পথ দিয়ে আগে দুই দেশের বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন হতো। ফলে পণ্য পরিবহনের পথ বদলেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়ও বেড়েছে।
২০২৫ সালের মার্চে স্থানীয় সুতা উৎপাদনকারীদের সুরক্ষার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানি সীমিত করার অনুরোধ জানায়। এরপর ভারত থেকে সুতা আমদানির ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরকে প্রধান পথ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
এর পরের মাসে ভারত বাংলাদেশি তৈরি পোশাক তৃতীয় দেশে পাঠানোর জন্য দেশটির বিমানবন্দর ব্যবহার করে যে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা চালু ছিল, তা বন্ধ করে দেয়। মে মাসে ভারত স্থলবন্দর দিয়ে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক পণ্য, কাঠের আসবাব এবং ফলভিত্তিক পানীয় প্রবেশের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করে। জুনে এর আওতায় আসে পাট ও বোনা কাপড়। আগস্টে পাটজাত পণ্য ও দড়ির ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা বাড়ানো হয়। এসব পণ্যের জন্য কলকাতা ও নাভা শেভা সমুদ্রবন্দরকে নির্ধারিত পথ হিসেবে রাখা হয়েছে।
তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল এসব বিধিনিষেধের বাইরে থাকায় ভারত থেকে আমদানি পুরোপুরি বাধাগ্রস্ত হয়নি। ব্যবসায়ীদের মতে, ভারতীয় সুতা, তুলা, কাপড় ও শিল্পের বিভিন্ন কাঁচামালের চাহিদা এখনো রয়েছে। এর একটি কারণ এসব পণ্যের তুলনামূলক কম দাম ও দ্রুত সরবরাহ। আবার কিছু আন্তর্জাতিক ক্রেতা নির্দিষ্ট উৎসের কাঁচামাল ব্যবহারের শর্তও দিয়ে থাকেন।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল সম্প্রতি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে সুতা আমদানির পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। তাঁর মতে, সমুদ্রবন্দর দিয়ে সুতা আমদানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়াই বর্তমানে ভারত থেকে আমদানির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে। তাঁর দাবি, আগে এর বড় একটি অংশ স্থলপথে অনানুষ্ঠানিকভাবে দেশে আসত।
স্থানীয় সুতা উৎপাদনকারীরা ইতোমধ্যে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও আমদানি করা সুতার সঙ্গে প্রতিযোগিতার চাপের কথা বলছেন। এ কারণে স্থলবন্দরের বিধিনিষেধ শিথিল করার বিরোধিতা করেছেন শওকাত আজিজ রাসেল।
অন্যদিকে, রপ্তানিকারকদের ওপর বিধিনিষেধের প্রভাব ভিন্ন। স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য পাঠানোর সুযোগ সীমিত হওয়ায় তৈরি পোশাক, কৃষিপণ্য ও পাটজাত পণ্যসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্যের পরিবহন ব্যয় বেড়েছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে কৃষিপণ্য রপ্তানি করতে গেলে সময় ও খরচ—দুই দিক থেকেই চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় রপ্তানিকারকদের মুনাফায় প্রভাব ফেলছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতে তাদের পণ্যের রপ্তানি প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা শুরুর জন্য তারা সরকারের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছে।
ভারত বাংলাদেশের পোশাকের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার। একই সঙ্গে ভারতীয় বাজারের জন্য বাংলাদেশ থেকেই পোশাক সংগ্রহ করে দেশটির কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান। টাটা গ্রুপের ট্রেন্ট লিমিটেড এ ধরনের বড় ক্রেতাদের একটি। এই বাজারে এইচঅ্যান্ডএম, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার, পুমা, ইউনিক্লো ও বেস্টসেলারও বাংলাদেশ থেকে পোশাক নেয়।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য রপ্তানি বন্ধ থাকায় ভারতে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে। অন্যদিকে স্থানীয় বাজারে সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় ভারত থেকে সুতার আমদানি বাড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তাঁর মতে, আমদানি-রপ্তানির পরিসংখ্যানই দেখাচ্ছে যে বর্তমান বিধিনিষেধ বাণিজ্যের পরিমাণে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। বরং পণ্য পরিবহনের পথ ও খরচে পরিবর্তন এসেছে। তাই দুই দেশের আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
ব্যবসায়ীদের একটি অংশের মতে, বাণিজ্যকে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের বাইরে রাখা গেলে দুই দেশেরই লাভ হতে পারে। ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মো. আবদুল ওয়াহেদ বলেন, বিধিনিষেধ তুলে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পণ্যগুলোর স্বাভাবিক পরিবহন আবার চালু করা গেলে দুই দেশের বাণিজ্য আরও বাড়তে পারে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি পর্যায়ে কিছুটা আলোচনার পরিবেশ তৈরি হওয়ার ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। গত ১৮ আগস্ট ঢাকায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির একটি প্রতিনিধিদল। তারা দুই দেশের ব্যবসায়িক সহযোগিতা বাড়াতে দুটি যৌথ কার্যদল গঠনের প্রস্তাব দেয়। এর একটি ডিজিটাল রূপান্তর ও নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করবে, অন্যটি অবকাঠামো বিনিয়োগ ও অর্থায়ন নিয়ে কাজ করবে।
ভারতীয় প্রতিনিধিদল একই সঙ্গে বেনাপোল বন্দরে পণ্য খালাসের গতি বাড়ানোর বিষয়টিও তুলে ধরে। বৈঠকের পর বাণিজ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, দুই দেশের বাণিজ্যকে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে বিধিনিষেধ নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হতে পারে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সব মিলিয়ে, সাম্প্রতিক দুই বছরের বিধিনিষেধ বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের মূল চিত্র বদলাতে পারেনি। বরং রপ্তানি পণ্যের পরিবহন ব্যয় ও সময় বেড়েছে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও পণ্যের চাহিদার কারণে ভারত থেকে আমদানি অব্যাহত রয়েছে। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি আরও বড় হয়েছে। এখন দুই দেশের আলোচনার মাধ্যমে স্থল ও সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের বাধা কতটা কমানো যায়, তার ওপর ভবিষ্যতের বাণিজ্য প্রবাহ অনেকটাই নির্ভর করছে।

