আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরে চাহিদা বাড়ার কারণে গত অর্থবছরে জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানির পেছনে দেশের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বা ১০৭ শতাংশ। এতে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে শিল্প ও উৎপাদন খাতেও বাড়ছে ব্যয়ের বোঝা।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানিতে প্রায় ১০ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। অথচ আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ এ খাতে আমদানি ব্যয় ছিল ৫ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারেরও কম। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বাংলাদেশের সামগ্রিক আমদানি ব্যয়ের চিত্রেও বড় প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭৫ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে যা ছিল ৬৮ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে মোট আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার বা ১০ দশমিক ৭ শতাংশ।এই বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে জ্বালানি আমদানি থেকে।
তথ্য বিশ্লেষণ করলে জ্বালানি আমদানির ভেতরেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। গত অর্থবছরে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশ ব্যয় করেছে ৯ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এই ব্যয় ছিল ৪ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার।অর্থাৎ এক বছরে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়েছে ১০৯ শতাংশেরও বেশি।
অপরদিকে অপরিশোধিত তেল আমদানিতেও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ছিল ৬২০ মিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরে অপরিশোধিত তেল আমদানির ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৯২ শতাংশ।সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় এর আগেও বড় ধাক্কা দেখেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে করোনা মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়ে ৭ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল। সেটিই এতদিন সর্বোচ্চ ব্যয় হিসেবে বিবেচিত ছিল।
এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যয় কমে ৫ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আবার তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলারে।
কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসে সেই আগের রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে। এবার জ্বালানি আমদানির ব্যয় পৌঁছেছে ১০ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলারে।অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি আমদানির ব্যয় শুধু বাড়েনি, বরং আগের সর্বোচ্চ রেকর্ডের তুলনায়ও উল্লেখযোগ্যভাবে ওপরে উঠেছে।
জ্বালানি আমদানির এই ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বড় ভূমিকা রেখেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা অস্থিরতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি করেছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের ওপর।
এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় জুন মাসের হিসাবে।শুধু জুন মাসেই বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানিতে ১ দশমিক ৬০৩৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। অথচ পুরো অর্থবছরে প্রতি মাসে জ্বালানি আমদানিতে গড় ব্যয় ছিল ৮৮৬ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ জুন মাসের ব্যয় ছিল স্বাভাবিক মাসিক গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য কতটা বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, এই হিসাব তারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
জ্বালানি আমদানির পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হলেও দেশের অভ্যন্তরে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য সহজ হচ্ছে না।এখানেই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা।
একদিকে আমদানির খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্প ও উৎপাদন খাতে জ্বালানির ব্যয়ও বাড়ছে। কোনো কোনো এলাকায় উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার খবরও রয়েছে। ফলে জ্বালানির বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত পণ্য উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
অর্থাৎ জ্বালানির দাম শুধু আমদানি হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পুরো অর্থনীতিতে।
কারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। পরিবহন ব্যয় বাড়লে বাজারে সরবরাহ করা পণ্যের খরচও বেড়ে যায়। ফলে জ্বালানি আমদানির উচ্চ ব্যয় মূল্যস্ফীতির ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।তবে সব ধরনের পণ্যের আমদানি ব্যয় বাড়েনি। কিছু ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে বরং ব্যয় কমেছে।
গত অর্থবছরে ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, মসলা, দুধ ও দুধজাত পণ্যসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য আমদানিতে বাংলাদেশ ব্যয় করেছে ৫ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এই ব্যয় ছিল ৫ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ এসব পণ্যে আমদানি ব্যয় কমেছে প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ডলার বা ১১ দশমিক ৪ শতাংশ।
চাল আমদানিতেও ব্যয় কমেছে। গত অর্থবছরে চাল আমদানিতে ব্যয় ৫৩০ মিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে। আগের অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ৬৮০ মিলিয়ন ডলারের বেশি। ফলে চাল আমদানির ব্যয় কমেছে প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ।
তবে গমের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। গত অর্থবছরে গম আমদানিতে বাংলাদেশ ব্যয় করেছে ২ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এ ব্যয় ছিল ১ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। ফলে গম আমদানির ব্যয় বেড়েছে ২৬ দশমিক ১ শতাংশ।
আমদানি ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়লেও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে আপাতত বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ধরে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২২ থেকে ১২৪ টাকার মধ্যে রয়েছে।
বর্তমানে ডলার সংগ্রহেও বড় ধরনের সমস্যা নেই। প্রবাসী আয় বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আমদানি ব্যয় এতটা বাড়ত না। সে ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত আরও বাড়ানো সম্ভব হতো বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা।
গত সোমবার পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ছিল ৩৭ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবপদ্ধতি অনুযায়ী মজুত ছিল ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে গিয়েছিল। এর আগে ২০২১ সালের আগস্টে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল।আমদানি ব্যয়ের এই চিত্রের পাশাপাশি দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতিও উদ্বেগ তৈরি করছে।
ব্যাংকারদের মতে, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদের হার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশে বিনিয়োগ প্রত্যাশার তুলনায় কম। এর প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতেও।
বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা রেকর্ডের সর্বনিম্ন।
এর অর্থ হলো, একদিকে জ্বালানি আমদানির ব্যয় দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে দেশীয় উৎপাদন ও বিনিয়োগের গতি সেই অনুযায়ী বাড়ছে না। এমন পরিস্থিতিতে আমদানির পেছনে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হলেও অর্থনীতিতে তার প্রত্যাশিত উৎপাদনশীল প্রভাব তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যান্য আমদানি খাতেও মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে।গত অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাতসংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানি প্রায় ৪ শতাংশ কমে ১৭ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তবে অন্যান্য মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি প্রায় ৯ শতাংশ বেড়ে ১৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। একই সময়ে মূলধনি পণ্যের আমদানি ৭ শতাংশের বেশি বেড়ে ১০ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
অন্যান্য পণ্যের আমদানিও ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে ৯ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, দেশের আমদানি কাঠামোতে একই সময়ে একাধিক ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। কোথাও চাহিদা কমেছে, কোথাও উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের প্রয়োজনীয়তায় আমদানি বেড়েছে।
বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও এর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো দুর্বল বিনিয়োগ চাহিদা। অর্থাৎ আমদানির বড় একটি অংশ বাড়লেও বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা এখনো শক্তিশালী হয়নি।
এর সঙ্গে অর্থপাচার ও অবৈধভাবে মূলধন স্থানান্তরের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা।
তবে দীর্ঘমেয়াদে শুধু আমদানি নিয়ন্ত্রণ বা বৈদেশিক মুদ্রার বাজারকে সাময়িকভাবে স্থিতিশীল রাখলেই সমস্যার সমাধান হবে না। অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন উৎপাদন বাড়ানো, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং রপ্তানি আয় বাড়ানো।
কারণ জ্বালানি আমদানির মতো প্রয়োজনীয় খাতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতেই হবে। এই ব্যয়ের বিপরীতে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা আয় না বাড়লে ভবিষ্যতে আবারও চাপ তৈরি হতে পারে।বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে দুটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরছে।
প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে দেশের আমদানি ব্যয়ের চাপ কীভাবে সামাল দেওয়া হবে?
দ্বিতীয়ত, জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও উচ্চ সুদের মতো সমস্যার কারণে বিনিয়োগ যদি দুর্বলই থাকে, তাহলে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন কীভাবে বাড়ানো হবে?
ব্যাংকারদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় রপ্তানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি প্রবাসী আয় ধরে রাখা জরুরি। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে হবে, যাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ে।
এর পাশাপাশি অর্থপাচার ও অবৈধ মূলধন পাচার বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ অব্যাহত রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
সব মিলিয়ে জ্বালানি আমদানির ব্যয় এক বছরে ১০৭ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার ঘটনাটি শুধু একটি আমদানি পরিসংখ্যান নয়। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর আন্তর্জাতিক বাজারের ঝুঁকি, জ্বালানিনির্ভরতা, দুর্বল বিনিয়োগ এবং মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য চাপ—সবকিছুর একটি সম্মিলিত চিত্র।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বর্তমানে আগের তুলনায় স্বস্তিদায়ক অবস্থায় থাকলেও জ্বালানি আমদানির মতো অপরিহার্য খাতে ব্যয় যদি একই গতিতে বাড়তে থাকে, তাহলে সেই স্থিতিশীলতা ধরে রাখা ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

