চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদারদের একটি। দেশের শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল এবং বিভিন্ন মধ্যবর্তী পণ্যের বড় অংশ আসে চীন থেকে। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম বড় ভোক্তা বাজার চীন বাংলাদেশের পণ্যের জন্যও একটি বিশাল সম্ভাবনার জায়গা তৈরি করেছে।
তবে বাস্তবতা হলো, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্ক এখনো অনেকটা একমুখী। বাংলাদেশ চীন থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করলেও সেই তুলনায় চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের উপস্থিতি খুবই সীমিত।
প্রশ্ন হলো, চীনের বাজারে শুল্ক সুবিধা পাওয়ার পরও বাংলাদেশ কেন প্রত্যাশিত পরিমাণে রপ্তানি বাড়াতে পারছে না? বাজারের দরজা খোলা থাকলেও সেখানে প্রবেশের জন্য যে সক্ষমতা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থা প্রয়োজন, বাংলাদেশ এখনো সেই জায়গায় পুরোপুরি প্রস্তুত হতে পারেনি।
এই বাস্তবতা বোঝার জন্য বাংলাদেশের কাঁঠাল রপ্তানির উদাহরণটি গুরুত্বপূর্ণ। চীন বাংলাদেশি কাঁঠাল আমদানির অনুমোদন দিলেও শুধু ফল উৎপাদন করলেই হবে না। রপ্তানির জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম মানতে হবে। গাছে থাকা অবস্থায় কাঁঠালকে বিশেষ ধরনের বাতাস প্রতিরোধী, পানি প্রতিরোধী ও বায়ু চলাচল উপযোগী ব্যাগে ঢাকতে হবে। ফল সংগ্রহ, প্যাকিং এবং পরীক্ষার ক্ষেত্রেও মান বজায় রাখতে হবে।
চীনের শুল্ক কর্তৃপক্ষ ২০২৬ সালের ২৭ জুলাই বাংলাদেশি তাজা কাঁঠাল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। অর্থাৎ বাজার আনুষ্ঠানিকভাবে খুলেছে। কিন্তু প্রথম বাণিজ্যিক চালান এখনো পাঠানো সম্ভব হয়নি।
এই ব্যবধানই বাংলাদেশের চীনমুখী বাণিজ্যের বড় বাস্তবতা। সুযোগ তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানোর প্রস্তুতি এখনো অসম্পূর্ণ।চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার হলেও রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে।
২০২৬ সালের প্রথম ১১ মাসে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় হয়েছে ৭৪২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি। তবে এই অগ্রগতি সত্ত্বেও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ভারসাম্য এখনো বড় ধরনের ঘাটতিতে রয়েছে।
বাংলাদেশি ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, দুই দেশের মোট বাণিজ্য প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি হলেও বাংলাদেশ বছরে চীনে ১ বিলিয়ন ডলারেরও কম পণ্য রপ্তানি করে।
তবে এই ঘাটতির পুরো দায় শুধু চীনের নয়। কারণ বাংলাদেশ যে পণ্যগুলো চীন থেকে আমদানি করে, তার বড় অংশই দেশের নিজস্ব উৎপাদন ও রপ্তানি খাতকে চালাতে প্রয়োজন হয়। শিল্পের যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক উপাদান এবং বিভিন্ন কাঁচামাল দেশের উৎপাদন ব্যবস্থার অংশ হয়ে যায়।
তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে চীন বাংলাদেশি পণ্যের জন্য বড় বাজার খুলে দিয়েছে। দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় বাংলাদেশি পণ্যের জন্য ১০০ শতাংশ শুল্কমুক্ত সুবিধার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ বাজারের সুযোগ তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানোর মতো উৎপাদন সক্ষমতা ও সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
অনেক সময় মনে করা হয়, কোনো দেশের বাজারে শুল্ক কমে গেলে রপ্তানি স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়।
একটি পণ্য বিদেশে বিক্রি করতে হলে শুধু কম শুল্ক থাকলেই হয় না। পণ্যের মান, পরীক্ষার সার্টিফিকেট, স্বাস্থ্যবিধি, প্যাকেজিং, লেবেলিং এবং সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হয়।
চীনের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বড় বাধা এখন এই অশুল্ক বিষয়গুলো।
কাঁঠালের উদাহরণেই বিষয়টি পরিষ্কার। বাংলাদেশে প্রচুর কাঁঠাল উৎপাদন হলেও রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় বাগান ব্যবস্থাপনা, প্যাকিং হাউস, কৃষি মান নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থা এখনো পর্যাপ্ত নয়।
বাংলাদেশ ২০২৫ অর্থবছরে প্রায় ১৮ লাখ ৩৫ হাজার টন কাঁঠাল উৎপাদন করেছে। কিন্তু রপ্তানির পরিমাণ খুবই কম। ২০২৩ অর্থবছরে যেখানে ২ হাজার ২৩১ টনের বেশি কাঁঠাল রপ্তানি হয়েছিল, ২০২৫ অর্থবছরে তা কমে প্রায় ১ হাজার ১৯৯ টনে দাঁড়িয়েছে।
আমের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। বাংলাদেশ ২০২৫ সালের ২৮ মে প্রথমবারের মতো চীনে আম পাঠায়। কিন্তু বছরে প্রায় ২৫ লাখ টন আম উৎপাদন করলেও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের আম রপ্তানি এখনো মাত্র ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টনের মধ্যে রয়েছে।চীনের বাজার বাংলাদেশের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার আগেই বাংলাদেশকে উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ হতে পারে চীনা বিনিয়োগকে শুধু কারখানা স্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রপ্তানির সেতু হিসেবে ব্যবহার করা।
চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বের বিভিন্ন বাজার, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ক্রেতাদের সম্পর্কে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রাখে। বাংলাদেশে থাকা চীনা কোম্পানিগুলো যদি স্থানীয় উৎপাদকদের নিজেদের বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তাহলে রপ্তানি দ্রুত বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলমের মতে, বাংলাদেশি পণ্য আন্তর্জাতিক মানের হলেও চীনা ক্রেতা, বাজারের চাহিদা এবং বিতরণ ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ এখনো সীমিত।
তার মতে, শুধু শুল্কমুক্ত সুবিধা রপ্তানি বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট নয়। ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ, পণ্যের মান এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহ—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের কৌশল হওয়া উচিত আগে চীনের বাজারে কোন পণ্যের চাহিদা বেশি তা নির্ধারণ করা, এরপর সেই অনুযায়ী উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা।
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধের কাঁচামাল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পাটজাত পণ্য এবং প্রযুক্তি খাতে চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে শুধু বিনিয়োগ আনলেই হবে না, সেই বিনিয়োগ কতটা স্থানীয় শিল্পকে শক্তিশালী করছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি কারখানা যদি শুধু কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য তৈরি করে আবার রপ্তানি করে, তাহলে কর্মসংস্থান তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা সীমিত থাকে। কিন্তু যদি সেই কারখানা স্থানীয় সরবরাহকারী তৈরি করে, দক্ষ জনবল গড়ে তোলে এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর করে, তাহলে দেশের শিল্প ভিত্তি শক্তিশালী হয়।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত চীনের বাজারে প্রবেশের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। তবে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা না করে বরং চীনা ব্র্যান্ড ও কোম্পানির সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হওয়াই বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে।
চামড়া ও জুতা শিল্পেও বড় সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ১ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারের জুতা ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই খাত ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রাখে।
মূল চ্যালেঞ্জ হলো কাঁচামাল থেকে তৈরি পণ্যে যাওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো। শুধু চামড়া রপ্তানি নয়, উন্নত মানের জুতা ও মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনের দিকে যেতে হবে।
প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিকস খাতেও সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশে ইলেকট্রনিকস, স্মার্ট ডিভাইস এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যের উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ছে। চীনা প্রযুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে শুধু সংযোজনকারী দেশ নয়, বরং উপাদান উৎপাদনকারী দেশ হিসেবেও এগোতে পারে।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ১৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাণিজ্য ঘাটতি অনেকের কাছে উদ্বেগের বিষয় মনে হতে পারে। তবে সব আমদানিই নেতিবাচক নয়।
যদি চীন থেকে আনা যন্ত্রপাতি বাংলাদেশের উৎপাদন বাড়ায় এবং সেই উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি আয় তৈরি করে, তাহলে সেটি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বিনিয়োগ।
মূল বিষয় হলো, প্রতি ডলার আমদানির মাধ্যমে বাংলাদেশ কতটা মূল্য তৈরি করতে পারছে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু আমদানি-নির্ভর বাণিজ্য হিসেবে না দেখে উৎপাদন, প্রযুক্তি এবং রপ্তানির অংশীদারত্বে পরিণত করতে হবে।
বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু চীনের কাছ থেকে পণ্য কেনা নয়, বরং চীনের প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও বাজার ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে চীনের বাজারে এবং বিশ্বের অন্যান্য বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করা।
বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক গত পাঁচ দশকে মূলত বাণিজ্য, অবকাঠামো ও যোগাযোগের ওপর গড়ে উঠেছে। এখন প্রয়োজন এটিকে শিল্প সহযোগিতার নতুন পর্যায়ে নেওয়া।
সফলতার মাপকাঠি শুধু কতগুলো চুক্তি হলো বা কত বিনিয়োগ ঘোষণা করা হলো, তা হওয়া উচিত নয়। বরং দেখতে হবে কত নতুন বাংলাদেশি পণ্য চীনের বাজারে প্রবেশ করছে, কত স্থানীয় প্রতিষ্ঠান চীনা সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হচ্ছে, কত দক্ষ কর্মী তৈরি হচ্ছে এবং কত বিনিয়োগ বাস্তবে উৎপাদনে যাচ্ছে।
চীনের বাজার বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে শুধু দরজা খোলার অপেক্ষায় থাকলে হবে না, সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করার সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে।
বাণিজ্য ঘাটতিকে সমস্যা হিসেবে দেখার পাশাপাশি এটিকে উৎপাদন, প্রযুক্তি ও রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগে পরিণত করাই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশল।

