বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রস্তাবিত ১০টি এয়ারবাস কেনার পরিকল্পনা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। উড়োজাহাজের ধরন, সংখ্যা, দাম এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক শর্ত নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চুক্তি সই করা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
সরকারের পরিকল্পনা ছিল ৩১ আগস্টের মধ্যে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি করা। তবে বিমানের কারিগরি ও আর্থিক কমিটি এখনো প্রস্তাবিত উড়োজাহাজগুলোর বাণিজ্যিক যৌক্তিকতা যাচাই করছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করা কঠিন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
বিমান সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এয়ারবাসের প্রস্তাবে রয়েছে চারটি এ৩৫০-৯০০ ধরনের বড় আকারের উড়োজাহাজ এবং ছয়টি এ৩২১নিও ধরনের তুলনামূলক ছোট উড়োজাহাজ। তবে আলোচনার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে এই সংখ্যা পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চারটি এ৩৫০ ও ছয়টি এ৩২১নিওর বর্তমান প্রস্তাবই শেষ পর্যন্ত বহাল থাকবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। আলোচনার ভিত্তিতে সংখ্যার অনুপাত ৩:৭ বা অন্য কোনো কাঠামোতেও পরিবর্তিত হতে পারে।
শুধু উড়োজাহাজের সংখ্যা বা ধরন নিয়েই আলোচনা থেমে নেই। দাম নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে এখনো সমঝোতা হয়নি। বিমানের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত উড়োজাহাজগুলোর সামগ্রিক বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। কেনার পর ব্যয়, পরিচালনাগত সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি লাভজনকতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এয়ারবাসের প্রস্তাবটি বিমানের কারিগরি ও আর্থিক কমিটির কাছে পাঠানো হয় এর আগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার জন্য ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছিল। গত এপ্রিল মাসে ওই চুক্তি সই হয়।
বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তির পর এয়ারবাসের উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনাটি বিমানের বহরে দুই নির্মাতার উড়োজাহাজ রাখার বৃহত্তর কৌশলের অংশ। দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্মাতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বহরে বৈচিত্র্য আনার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিমানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আলোচনা এখনো চলছে। তবে কবে নাগাদ আলোচনা শেষ হবে বা চুক্তি সই হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাননি।
কারিগরি ও আর্থিক কমিটি তাদের মূল্যায়ন শেষ করার পর এয়ারবাসের সঙ্গে চূড়ান্ত প্রস্তাবটি বিমানের পরিচালনা পর্ষদের সামনে উপস্থাপন করা হবে। পর্ষদ সেটি অনুমোদন করতে পারে। আবার প্রয়োজন মনে করলে আরও যাচাইয়ের জন্য নতুন কমিটিও গঠন করতে পারে।
বিমানের প্রকৌশল বিভাগের পরিচালক এই কারিগরি ও আর্থিক কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কমিটিতে করপোরেট পরিকল্পনা ও অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারাও রয়েছেন। তাদের মূল্যায়নের পরই উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাবটি পরবর্তী ধাপে যাবে।
চুক্তি সইয়ের আগে প্রস্তাবিত সমঝোতাটি একজন আন্তর্জাতিক আইনজীবীর মাধ্যমে যাচাই করার পরিকল্পনাও রয়েছে বিমানের। এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি সইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এসব ধাপ বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট একজন বলেছেন, ৩১ আগস্টের মধ্যে চুক্তি সই করা কঠিন হতে পারে।
এদিকে বিমান সম্প্রতি বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে। ওই চুক্তির আওতায় রয়েছে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ এবং চারটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স। এসব উড়োজাহাজ ২০৩১ সাল থেকে বিমানের বহরে যুক্ত হওয়ার কথা এবং সবগুলো উড়োজাহাজ সরবরাহ শেষ হওয়ার কথা ২০৩৫ সালের মধ্যে।
বিমানের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৪-৩৫ অর্থবছরের মধ্যে বহরের সংখ্যা বর্তমান ১৯টি থেকে বাড়িয়ে ৪৭টি করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বোয়িং ও এয়ারবাস—দুই নির্মাতার উড়োজাহাজ যুক্ত করেই এই সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা ভাবা হচ্ছে।
বিমান কর্তৃপক্ষের যুক্তি, দেশের মানুষের আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বাড়ছে এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের বিস্তারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আকাশপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সম্ভাবনাও বাড়ছে। ফলে বড় বহর গড়ে তুলে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের পরিধি বাড়ানো বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হতে পারে।
তবে শুধু উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়ালেই বিমানের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে না বলে সতর্ক করেছেন বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনাগত দক্ষতা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক রুট ব্যবস্থাপনা, যাত্রীসেবা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায়ও বড় ধরনের উন্নতি প্রয়োজন।
বিমানের তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানের পেছনে এসব ক্ষেত্রের ঘাটতিও ভূমিকা রেখেছে। তাই বহর সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী না করা গেলে নতুন উড়োজাহাজগুলো থেকে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহনের চাহিদা বাড়ার এই সময়ে বিমানের সামনে তাই একই সঙ্গে বড় সুযোগ ও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে আধুনিক উড়োজাহাজ দিয়ে বহর বড় করার পরিকল্পনা, অন্যদিকে সেই বহরকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করে লাভজনক রুট ও উন্নত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা—দুই দিকেই সফল হতে হবে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থাটিকে।

