দেশের গাড়ি বাজারটা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। পেট্রোল-ডিজেলের পাশাপাশি এখন আলোচনায় ইলেকট্রিক গাড়ি। আর এই বাজারে বড় একটি নাম যোগ হতে যাচ্ছে, চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা বিওয়াইডি (BYD)। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত রানার অটোমোবাইলস পিএলসি সম্প্রতি বিওয়াইডির সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। এর আওতায় তারা বাংলাদেশে বিওয়াইডির গাড়ি আমদানি ও বিতরণ করবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে স্থানীয়ভাবে গাড়ি তৈরির সম্ভাবনাও খোলা রাখা হয়েছে।
গত ২০ আগস্ট রানার অটোমোবাইলসের পরিচালনা পর্ষদের এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কোম্পানিটি জানিয়েছে, তারা বিওয়াইডির সঙ্গে থাকা ‘মাস্টার সাপ্লাই অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাগ্রিমেন্ট’ (এমএসএমএ)-এর অধীনে পরবর্তী কার্যক্রম অনুমোদন করেছে। এর অংশ হিসেবে রানার বিওয়াইডির সঙ্গে একটি ‘টেকনিক্যাল লাইসেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ (টিএলএ) স্বাক্ষর করবে এবং সম্পূর্ণ তৈরি (সিবিইউ) অবস্থায় বিওয়াইডির গাড়ি আমদানি করে বাজারজাত করবে। কোম্পানির ভাষ্য, এই উদ্যোগ প্রস্তাবিত প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বিতরণ নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা ও প্রস্তুতির লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
বিওয়াইডি কিন্তু শুধু একটি গাড়ি কোম্পানি নয়। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই চীনা প্রতিষ্ঠানটি এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রস্তুতকারক। টেসলার মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে তারা। শুধু গাড়ি নয়, ব্যাটারি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমাধানেও তাদের সুনাম রয়েছে। এশিয়া, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকায় তাদের বিস্তৃতি বাড়ছে। বাংলাদেশের বাজারে তাদের পদার্পণ মানে দেশের পরিবহন খাতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
শুধু আমদানি নয়, রানার অটোমোবাইলসের পরিকল্পনা অনেক বড়। শিল্পসূত্র বলছে, ইতিমধ্যেই তারা ময়মনসিংহের ভালুকায় নিজেদের কারখানার কাছে, সেই সাথে মাগুরা ও শ্রীপুরে জমি অধিগ্রহণ করেছে। সেখানে তারা একটি গাড়ি উৎপাদন প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। রানারের কিন্তু অটোমোবাইল উৎপাদনের অভিজ্ঞতা আছে। তারা ইতিমধ্যেই বাজাজ থ্রি-হুইলার তৈরি করতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এছাড়া আইশার ট্রাক ও বাস, কেটিএম মোটরসাইকেল ও ভেসপা স্কুটারের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর বাজারজাতও করে থাকে তারা।
এই সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থায়নেরও ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কোম্পানিটি ২৫০ কোটি টাকার পছন্দের শেয়ার (প্রেফারেন্স শেয়ার) ইস্যু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি কোম্পানিটির অনুমোদিত শেয়ার মূলধন দ্বিগুণ করে ২০০ কোটি টাকা থেকে ৪০০ কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত দুটি আগামী ৮ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় এক্সট্রাঅর্ডিনারি জেনারেল মিটিং-এ (ইজিএম) শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। অবশ্য বিওয়াইডি প্রকল্পে কত টাকা বিনিয়োগ করা হবে, তা এখনও প্রকাশ করেনি রানার।
বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রানারের এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের উদীয়মান বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বাংলাদেশে এখনও ইভি অবকাঠামো, পণ্যের প্রাপ্যতা ও বিক্রয়োত্তর সেবা, এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ। রানার-বিওয়াইডি অংশীদারিত্ব এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে।
আর্থিক দিক থেকেও রানার অটোমোবাইলস ভালো অবস্থানে আছে। ২০২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে তাদের সমন্বিত আয় ১৮ শতাংশ বেড়ে ৮৭৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই সময়ে তাদের সমন্বিত নিট মুনাফা হয়েছে ১৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আগের বছর একই সময়ে তারা লোকসানে ছিল। ২০২৫ অর্থবছরে ১০ কোটি ২৩ লাখ টাকা মুনাফা করার পর তারা শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল। ২০১৯ সালে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত হওয়া রানার এখনও পর্যন্ত মূলত মোটরসাইকেল ও অটোমোবাইল পণ্যকেন্দ্রিক ছিল। বিওয়াইডি অংশীদারিত্ব তাদের আয়ের ভিত্তি আরও বিস্তৃত করবে এবং দেশের পরিবর্তনশীল অটোমোবাইল বাজারে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করবে।
বাংলাদেশের সড়কে এখনও বৈদ্যুতিক গাড়ির সংখ্যা হাতে গোনা। কিন্তু চার্জিং স্টেশন, সরকারি নীতি সহায়তা ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর আগ্রহ ধীরে ধীরে বাড়ছে। রানার-বিওয়াইডি এই অংশীদারিত্ব হয়তো সেই বদলের সূচনা মাত্র।

