দেশের মোট মাছের পোনার চাহিদার ৭০ শতাংশের জোগান আসে যশোরের চাঁচড়া মোকাম থেকে। ফাল্গুন থেকে কার্তিক, আট মাস ধরে এখানে চলে পোনার উৎপাদন ও বেচাকেনা। প্রতিদিন ৫০-৬০টি ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে রুই, কাতলা, মৃগেল, শিং, টেংরা, পাবদাসহ ইলিশ বাদে প্রায় সব প্রজাতির মাছের রেণু ও পোনা। এই বিশাল বাজারের দৈনিক লেনদেন দেড় থেকে দুই কোটি টাকা। অথচ এই বিরাট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে মহাসড়কের পাশে ঝুঁকি আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যে।
যশোর জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় ৯৭ হাজার ৬০০ হেক্টর জলাশয়ে বছরে ২ লাখ ৪১ হাজার টনের বেশি মাছ উৎপাদিত হয়। বর্তমানে জেলার ৪২টি হ্যাচারিতে বছরে ৭২ হাজার কেজি রেণু এবং ৪ হাজার ৩২৭টি নার্সারিতে ২২৭ কোটি ১৩ লাখের বেশি পোনা উৎপাদিত হচ্ছে, যার মোট বাজারমূল্য ৭০০ কোটি টাকারও বেশি। শুধু চাঁচড়া মোকামেই প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ মণ মাছের পোনা হাতবদল হয়। এই মোকামকে ঘিরে প্রায় ২ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, বর্ষায় চাঁচড়ার মহাসড়ক ও গ্রামীণ সড়কের দুই পাশে বসে এই বিশাল হাট। ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণায় মুখরিত এলাকাটি। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকারি ক্রেতারা নিজের চোখে মান আর দাম যাচাই করে পোনা কিনছেন। বাগেরহাটের পাইকারি ক্রেতা আক্কাস আলী বলেন, ‘চাঁচড়ার রেণু পোনার মান অনেক ভালো। এলাকায় ব্যাপক চাহিদা থাকায় এখান থেকে কিনে নিয়ে বিক্রি করি।’ শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ থেকে আসা আল আমিন সরকার বলেন, ‘এখানকার পোনার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। মান ও দাম যাচাই করে কিনি, নিজের খামারে চাষ করি এবং এলাকায় বিক্রি করি।’
কিন্তু এই সফল বাজারটির অবকাঠামো বেহাল। ২০১৯ সালে যশোর শহরের মাগুরপট্টিতে ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় আধুনিক মাছের পোনা বিক্রয়কেন্দ্র। অথচ সেই কেন্দ্রটি আজ কার্যত পরিত্যক্ত। কেন? হ্যাচারি মালিক পল্লব বর্মণ বলেন, ‘প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার পোনা বিক্রি হয়, অথচ মোকামের অবস্থা বেহাল। কাঁদা-জলে নাস্তানাবুদ অবস্থায় আছি আমরা। মহাসড়কের পাশে ঝুঁকি নিয়ে বেচাকেনা হচ্ছে।’
আরেক হ্যাচারি মালিক মোহাম্মদ আলমগীরের অভিযোগ, ‘পোনা বিক্রয় কেন্দ্র নির্মাণ সঠিক জায়গায় হয়নি। সেখানকার পরিবেশ ব্যবসাবান্ধব নয়। মাছের পোনা সংরক্ষণের জন্য হাপা (পোনা সংরক্ষণ পুকুর) দরকার হয়, হাপায় রেখেই মোকামে বিক্রি করতে হয়, যে সুবিধা এই কেন্দ্রে নেই।’
মৎস্য বিভাগও এই সমস্যা চিহ্নিত করেছে। যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন বলেন, ‘দেশের চাহিদার সিংহভাগ রেণু পোনা সরবরাহ করছে চাঁচড়ার খামারিরা। তাদের জন্য আধুনিক কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু খামারিদের সেখানে আনা সম্ভব হচ্ছে না। তারা ঝুঁকি নিয়েই মহাসড়কের পাশে বিক্রি করছেন। তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে বিক্রয় কেন্দ্রে আনার চেষ্টা চলছে।’
মৎস্য খাতের অর্থনীতির এই বিশাল অংশটাকে সঠিক অবকাঠামোর আওতায় আনা সময়ের দাবি। মহাসড়কের পাশে ঝুঁকিপূর্ণ এই হাট যেমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, তেমনি মানসম্মত পোনা সংরক্ষণেও বাধা তৈরি হচ্ছে। অথচ ১৬ কোটি টাকার আধুনিক কেন্দ্রটি পড়ে রয়েছে অপচয়ের প্রতীক হয়ে। যশোরের চাঁচড়ার এই মোকাম যদি একটু যত্ন ও সঠিক পরিকল্পনা পায়, তাহলে এটি দেশের মৎস্য খাতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

