টানা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশের বস্ত্রখাত এক ভয়াবহ গ্যাস–সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাবে দেশজুড়ে অন্তত ৬৬০টি বস্ত্রকলের উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। শিল্প মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্যাসের অপ্রতুল সরবরাহের কারণে কারখানাগুলো তাদের স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতার সিংহভাগই ব্যবহার করতে পারছে না, ফলে প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে বিপুল আর্থিক ক্ষতি।
গাজীপুর সদর উপজেলার ভবানীপুর এলাকার একটি সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। সাধারণ সময়ে প্রতিষ্ঠানটি দৈনিক প্রায় ১৭০ টন সুতা উৎপাদন করতে সক্ষম হলেও, গ্যাস–সংকটের কারণে গত এক মাসের বেশি সময় ধরে তাদের উৎপাদন নেমে এসেছে সক্ষমতার মাত্র ৩০ শতাংশে। এই সময়টাতে পল্লী বিদ্যুৎ সংযোগ এবং ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর ভরসা করে কোনোমতে সীমিত পরিসরে কারখানা চালু রাখতে হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোয় গ্যাসের চাপ কিছুটা বেড়ে ৩ থেকে ৪ পিএসআই পর্যন্ত উঠলেও তাতে উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, গত এক মাসে কম উৎপাদনের কারণে প্রতিষ্ঠানটির ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় পাঁচ কোটি টাকায়, যা শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধের ক্ষেত্রেও আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে যে, গত জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে দেশের ৬৬০টি বস্ত্রকলের উৎপাদন আংশিকভাবে বন্ধ রয়েছে। এর বাইরে ২০১৯ সাল থেকে আরও ২৪৪টি কারখানা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। সংগঠনটি বর্তমানে কারখানাগুলোর প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই-বাছাই করছে এবং শিগগিরই এসব কারখানাকে পুনরায় সচল করতে প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য মন্ত্রণালয়ে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।
এই সংকটের সূত্রপাত হয় গত ২১ জুলাই, যখন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির সঙ্গে যুক্ত একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এবং টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় একই সময়ে আরেকটি এলএনজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের টার্মিনাল থেকেও সরবরাহ ব্যাহত হয়। পরে ১৫ আগস্ট প্রথম টার্মিনালটি আংশিকভাবে এবং দ্বিতীয়টি পুরোপুরি চালু হলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। এর মধ্যেই কার্গোজনিত জটিলতার কারণে প্রথম টার্মিনাল থেকে ফের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, যা তিন দিন পর ২২ আগস্ট আবার সচল হয়। এরপর থেকে কিছু কিছু এলাকায় শিল্পে গ্যাস সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে।
জেলাভিত্তিক চিত্রেও এই টানাপোড়েনের প্রতিফলন স্পষ্ট। নরসিংদী শহরের একটি কাপড় প্রক্রিয়াকরণ কারখানা গ্যাস–সংকটের কারণে টানা ২২ দিন সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। উৎপাদন সম্প্রতি শুরু হলেও দিনের বেলা গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে যাওয়ায় কেবল রাতের সময়েই কারখানা চালানো সম্ভব হচ্ছিল। প্রতিষ্ঠানের একজন পরিচালক জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বিকেলের পর থেকে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে এবং দৈনিক ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টা নিয়মিত সরবরাহ পেলেই উৎপাদন স্বাভাবিক গতিতে চালানো সম্ভব হবে।
তুলনামূলকভাবে নারায়ণগঞ্জের পরিস্থিতি আরও নাজুক। ফতুল্লার একটি শিল্পপার্কে অবস্থিত রং করার (ডাইং) একটি কারখানায় ১৮ আগস্ট থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ, ফলে উৎপাদনও সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে আছে। প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়ে কারখানাটি দৈনিক ১১০ টন কাপড় রং করতে পারে এবং প্রতি কেজিতে নির্ধারিত মজুরি হিসাব করলে এই বন্ধের কারণে ক্ষতির অঙ্ক অনেক বড়। একই সঙ্গে পোশাক তৈরির কারখানাগুলোতেও চাহিদামাফিক কাপড় সরবরাহ করা যাচ্ছে না, যার প্রভাব পড়ছে পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে।
সংগঠনটির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা তথা সংসদ সদস্য জানান, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠানেও গ্যাস–সংকটের কারণে উৎপাদন নেমে এসেছে সক্ষমতার ৪০ শতাংশে। তাঁর মতে, গত এক মাস ধরে অধিকাংশ বস্ত্রকলের অবস্থাই মোটামুটি একই রকম। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের কারণে বস্ত্রকলগুলো আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতির লক্ষণ দেখা যাওয়ায় তিনি কিছুটা আশাবাদী।
গাজীপুরেও চিত্র মিশ্র। শ্রীপুর এলাকার একটি কারখানার মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাঁর কারখানায় গ্যাসের চাপ এখনো ২ পিএসআইয়ের নিচে থাকায় উৎপাদন সক্ষমতার ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশের বেশি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে একই এলাকার আরেকটি সুতা কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, সাম্প্রতিক দুই দিনে গ্যাসের চাপ ৩ থেকে ৭-৮ পিএসআই পর্যন্ত উঠেছে, যার ফলে তাঁরা উৎপাদন সক্ষমতার ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারছেন। এই পার্থক্য থেকেই স্পষ্ট হয়, একই জেলার মধ্যেও গ্যাস সরবরাহের তারতম্য কতটা তীব্র।
সংগঠনটির তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে মোট ১ হাজার ৮০০টির বেশি বস্ত্রকল রয়েছে, যার মধ্যে ৫২৭টি সুতা উৎপাদনকারী কারখানা। তুলনামূলকভাবে হবিগঞ্জ ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ সন্তোষজনক থাকায় সেখানকার উৎপাদন প্রায় স্বাভাবিক গতিতেই চলছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটিমাত্র জ্বালানি স্থাপনার প্রযুক্তিগত বিপর্যয় কীভাবে পুরো একটি রপ্তানিমুখী শিল্পখাতের সরবরাহ শৃঙ্খলকে নাড়িয়ে দিতে পারে। স্বল্পমেয়াদে বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস আমদানি অবকাঠামোতে বৈচিত্র্য আনা ছাড়া এ ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। শিল্প মালিকদের প্রত্যাশা, সরবরাহ পরিস্থিতির সাম্প্রতিক উন্নতি ধারাবাহিকভাবে বজায় থাকলে আসন্ন সময়ে উৎপাদন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরবে এবং বিদেশি ক্রেতাদের উদ্বেগও প্রশমিত হবে।

