বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গত চার বছরে অন্তত ১৫০ কোটি ডলারের চিহ্নিত শিল্প বিনিয়োগ পরিকল্পনা নানা কারণে থেমে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ ঋণ ব্যয়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এবং সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে জ্বালানি সংকট।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকাশিত তথ্য ও প্রকল্প পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অন্তত ১০টি বড় প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারত।
বাংলাদেশি মুদ্রায় এই বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী কারখানা সম্প্রসারণ, নতুন উৎপাদন লাইন চালু কিংবা নতুন শিল্প স্থাপন সম্ভব না হওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে দেশের উৎপাদন, রপ্তানি এবং কর্মসংস্থানে।
কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা পুরোপুরি বাতিল করেছে, কিছু প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ কমিয়ে এনেছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান কারখানা তৈরি করেও উৎপাদন শুরু করতে পারছে না।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দুর্বল চাহিদা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ঋণের ব্যয় বৃদ্ধির সময়ে নতুন বিনিয়োগে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা।
পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান নিউএজ গ্রুপ গত বছর প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে কারখানা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার কারণে প্রতিষ্ঠানটি সেই পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত করেছে।
নিউএজ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম বলেন, ব্যবসার জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা সুযোগের অভাব নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশের অভাব।
তিনি বলেন, বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে ব্যবসায়ীদের নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, প্রতিযোগিতামূলক অর্থায়ন, স্থিতিশীল নীতি এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা প্রয়োজন।
তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও জ্বালানি সংকট একক কোনো সমস্যা নয়, বরং কয়েক বছর ধরে জমে থাকা বিভিন্ন বাধার ফল।
টিকে গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মাফ শুজ ২০২৩ সালে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছিল।
এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল রপ্তানিমুখী জুতা উৎপাদন এবং স্থানীয় জুতা শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল উৎপাদন করা।
মাফ শুজের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ শাহাদাত উল্লাহ বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সংঘাত, উচ্চ ঋণ ব্যয় এবং দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকটের কারণে প্রকল্পটি স্থগিত রাখতে হয়েছে।
তবে প্রতিষ্ঠানটি ছোট পরিসরে প্রকল্পটি আবার শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন পরিকল্পনা চূড়ান্ত না হলেও আগামী দুই বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।তিনি বলেন, সম্প্রসারণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ।
বিনিয়োগ প্রকল্প দীর্ঘদিন পিছিয়ে গেলে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে প্রকল্প ব্যয়ের ওপর। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্মাণ খরচ, অর্থায়ন ব্যয় এবং যন্ত্রপাতির দাম বেড়ে যায়।
চট্টগ্রামের এন মোহাম্মদ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এন মোহাম্মদ প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রি ২০২২ সালে ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সম্প্রসারণ পরিকল্পনা নেয়।
কিন্তু করোনা মহামারির প্রভাব, বৈশ্বিক সংকট এবং দেশের ডলার সংকটের কারণে প্রকল্পটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে যায়।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নজরুল হক জানান, প্রকল্পের ব্যয় ৬০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ১০ একর জমির উন্নয়নে তারা ৬০ কোটির বেশি টাকা খরচ করেছেন। কিন্তু নির্ভরযোগ্য গ্যাস সরবরাহ না থাকায় পরবর্তী বিনিয়োগ আটকে আছে।তিনি বলেন, পর্যাপ্ত গ্যাস ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে প্রকল্প চালানো সম্ভব নয়।
একই ধরনের সমস্যায় পড়েছে বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সালে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বছরে ১২ লাখ ৫০ হাজার টন উৎপাদন ক্ষমতার একটি ইস্পাত কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করেছিল।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৭ হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা ছিল।
প্রকল্পের জন্য আটটি ব্যাংক ২ হাজার ৩০৫ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করেছিল, যার মধ্যে ৫৪০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়।
কিন্তু গ্যাস সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে প্রকল্পটি থেমে যায়। বর্তমানে কয়েকশ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি অসম্পূর্ণ কারখানায় পড়ে আছে।
বিলম্ব, অর্থায়ন ব্যয় বৃদ্ধি এবং টাকার অবমূল্যায়নের কারণে প্রকল্প ব্যয় ৪ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৭ হাজার ১১৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
দেশের শিল্প খাতে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো, অনেক প্রতিষ্ঠান অবকাঠামো তৈরি করেও উৎপাদন শুরু করতে পারছে না।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলের তিনটি কারখানা গত চার বছর ধরে বন্ধ অবস্থায় রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি ইস্পাত কারখানা, কাচ কারখানা এবং পেপারবোর্ড কারখানায় প্রায় ৭০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ না পাওয়ায় উৎপাদন শুরু করতে পারেনি।
কারখানা বন্ধ রেখেও প্রতিষ্ঠানটিকে প্রতি বছর প্রায় ৮০ কোটি টাকা খরচ করতে হচ্ছে।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ গ্রিড উন্নয়ন এবং গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের জন্য তারা প্রায় ১০০ কোটি টাকা করে সহায়তাও দিয়েছে।
বাংলাদেশের প্রথম বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডও একই সমস্যায় পড়েছে।
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রতিষ্ঠানটি কারখানা প্রস্তুত করেছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মাসুদ কবির বলেন, কারখানা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। শুধু গ্যাস সংযোগ পেলেই সাত দিনের মধ্যে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব।তিনি জানান, বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রকল্পে তাদের বিনিয়োগ প্রায় ৭০০ কোটি টাকা।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রায় ৫০০টি শিল্প গ্যাস সংযোগের আবেদন অপেক্ষমাণ রয়েছে।
তবে গ্যাস সংকটের কারণে নতুন শিল্প সংযোগ দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই সীমিত। তিতাসের কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান জানিয়েছেন, ২০৩০ সালের আগে নতুন শিল্প গ্যাস সংযোগ দেওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে।
তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে তিতাসেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব দেখা যাচ্ছে ব্যাংক ঋণের চাহিদাতেও। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া আসলে দুর্বল ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন।
তার মতে, রপ্তানি না বাড়লে এবং বাজারে চাহিদা দুর্বল থাকলে উদ্যোক্তারা নতুন কারখানা তৈরির জন্য ঋণ নিতে আগ্রহী হবেন না।
দক্ষিণ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ১৫০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ পিছিয়ে যাওয়া অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
তার মতে, বিনিয়োগ বিলম্বিত হলে কারখানা চালু হয় না, উৎপাদন বাড়ে না, রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয় এবং সম্ভাব্য কর্মসংস্থান তৈরি হয় না।
পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল চাহিদা, জ্বালানি সমস্যা এবং উচ্চ ঋণ ব্যয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থায়ন সুবিধা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, নিয়মকানুন এবং নীতির স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নতুন শিল্প স্থাপন ও সম্প্রসারণ যদি দীর্ঘদিন ধরে বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে এর প্রভাব শুধু ব্যবসায় নয়, দেশের উৎপাদন, রপ্তানি এবং কর্মসংস্থানের ওপরও পড়বে।

