বেকারি পণ্যের দাম শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) থেকে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে যাচ্ছে। ঘোষণাটি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট অ্যান্ড কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি। কাঁচামালের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং তীব্র বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, এই দুই চাপে নাভিশ্বাস উঠেছে বেকারি শিল্পের। সংগঠনটির ভাষ্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা এবং লোকসান সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়ায় এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা।
বেকারি ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা ও চিনির মতো প্রধান চারটি কাঁচামালের দাম গত এক মাসে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। খোলা ও প্যাকেটজাত চিনির দাম কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা এবং আটা-ময়দার দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারে প্রতি কেজি চিনি এখন ১১৫ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা দুই সপ্তাহ আগেও ছিল ১০৫ থেকে ১১০ টাকা। ময়দার কেজি ৫৮ থেকে বেড়ে ৮০ টাকা, আটার প্যাকেট ৬০ থেকে বেড়ে ৭০ টাকা, খোলা সয়াবিন তেল ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকা; এই দামের তালিকা যত লম্বা হচ্ছে, বেকারি মালিকদের কপালের ভাঁজও তত গভীর হচ্ছে।
কিন্তু শুধু কাঁচামালের দাম নয়, সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এসেছে জ্বালানি সংকট থেকে। গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে অনেক বেকারি কারখানা দিনের দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকছে। সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন কমেছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। আবার কাঁচামাল ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাবে উৎপাদন খরচ বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে খরচ বাড়ছে; এই দুই চাপে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ জালাল উদ্দিনের ভাষায়, “কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতিটি পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে আগের দামে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।” তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত সবাই মিলেই নেওয়া হয়েছে। কেউ যদি ২০ শতাংশ বাড়ে, কেউ বাড়বে কম। আবার কিছু ক্ষেত্রে দাম না বাড়িয়ে ওজন কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যেমন ১০ টাকার রুটি ১০ টাকাই থাকবে, কিন্তু যেটা আগে ৪০০ গ্রাম ছিল, সেটা হয়তো ৩৫০ গ্রাম বা ৩২০ গ্রাম হয়ে যাবে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে তাঁর যুক্তি, “আমরা টিকতে পারছি না। আমার কর্মচারী না খেয়ে থাকবে?”
এদিকে, বাজারে সরবরাহও কমে এসেছে। আগে যে দোকান পাঁচ বস্তা ময়দার কাজ করত, সে এখন তিন বস্তায় চলে আসছে। সারা দেশে ক্ষুদ্র বেকারির সংখ্যা প্রায় সাত হাজার, যার মধ্যে রাজধানীতেই রয়েছে সাত শতাধিক। সংগঠনের নেতারা বলছেন, চলমান সংকট দীর্ঘ হলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে বেকারি খাত বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত সহযোগিতা না পাওয়া গেলে এই খাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পথে বসে যাবেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সমিতির নেতারা।
আসলে বেকারি পণ্যের দাম বৃদ্ধি শুধু একটি খাতের সংকট নয়। এটি প্রমাণ করে, কাঁচামালের বাজারে অস্থিরতা এবং জ্বালানি সংকট একসঙ্গে কাজ করলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে প্রভাব পড়ে। সকালের নাশতা থেকে সন্তানের টিফিন; সবখানেই এই দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়বে। সীমিত আয়ের মানুষের জন্য এটি বাড়তি বোঝা। বেকারি শিল্পের এই সংকট কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়া এবং কাঁচামালের বাজার স্থিতিশীল হওয়ার ওপর। আপাতত, শনিবার থেকে রুটির দাম বাড়লে হতাশ হবেন না, কারণ পেছনে রয়েছে জ্বালানি সংকট ও কাঁচামালের ঊর্ধ্বমুখী দামের এক জটিল সমীকরণ।

