গ্যাস সংকটে জর্জরিত বাংলাদেশের জন্য বড় সুখবর আসতে পারে মার্কিন জ্বালানি জায়ান্ট শেভরনের পক্ষ থেকে। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে দেশে বিদ্যমান ও পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে আগ্রহের কথা জানিয়েছে শেভরনের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির বেস অ্যাসেটস ও উদীয়মান দেশবিষয়ক প্রেসিডেন্ট জাভিয়ার লা রোসা। এই সাক্ষাৎ এমন এক সময়ে হলো, যখন দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি, অথচ সরবরাহ মিলছে মাত্র ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্রমাগত কমছে, আর এলএনজি আমদানিতে হরমুজ সংকট তৈরি হয়েছে নতুন চাপ। এই বাস্তবতায় শেভরনের বিনিয়োগ প্রস্তাব কেবল একটি কর্পোরেট সিদ্ধান্ত নয়, এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ।
শেভরন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম বিদেশি বিনিয়োগকারী। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে তিনটি প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট (পিএসসি) স্বাক্ষরের মাধ্যমে তাদের যাত্রা শুরু। বর্তমানে তারা দেশের তিনটি গ্যাসক্ষেত্র; বিবিয়ানা, জালালাবাদ ও মৌলভীবাজার, পরিচালনা করছে। কোম্পানির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, বিবিয়ানা বাংলাদেশের বৃহত্তম গ্যাস উৎপাদনকারী ক্ষেত্র, যা থেকে দেশের মোট গ্যাস উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং কনডেনসেটের ৮৩ শতাংশ আসে। প্রায় ২ হাজার ৩০০ কর্মী নিয়ে শেভরন দেশের মোট প্রাকৃতিক গ্যাস চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশ সরবরাহ করে। গত তিন দশকে তারা বাংলাদেশে ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি直接投资 (এফডিআই) করেছে। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, শেভরন বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের গ্যাস সংকট এখন সর্বজনীন। পেট্রোবাংলার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৬ সেপ্টেম্বর দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২ হাজার ৩৩৩ মিলিয়ন ঘনফুট, যার মধ্যে পুনঃগ্যাসীকৃত এলএনজি থেকে এসেছে ৭০৩ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। সরকারের ১৫০-কূপ খনন কার্যক্রমের আওতায় গত চার বছরে মাত্র ১২৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যোগ হয়েছে, অথচ রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোর পরিচালিত ক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন কমেছে ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০২২ সালের ৬ জুলাই যেখানে উৎপাদন ছিল ৮৪৯ মিলিয়ন ঘনফুট, সেখানে ২০২৬ সালের ৭ জুলাই তা নেমে এসেছে ৭০৯ মিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ, নতুন কূপ থেকে যা যোগ হচ্ছে, পুরনো ক্ষেত্র থেকে তার চেয়ে বেশি কমছে। এই ঘাটতিই শেভরনের মতো বিদেশি বিনিয়োগকে আরও জরুরি করে তুলেছে।
সূত্র অনুযায়ী, শেভরন গত কয়েক বছর ধরে দেশের ১১টি অনশোর ব্লকে অনুসন্ধান সমীক্ষা চালিয়েছে। এর মধ্যে ব্লক-১১ ও ব্লক-১২-এ নতুন হাইড্রোকার্বন অনুসন্ধানের প্রস্তাব দিয়েছে তারা। এনড্রেমি মন্ত্রণালয় পেট্রোবাংলাকে এই প্রস্তাব পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছে। শেভরনের বিনিয়োগের পরিমাণ ৫০০ মিলিয়ন ডলারের কম হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ৩০ মাসের মধ্যে অনুসন্ধান কাজ শেষ করে ২০২৮ সালের মধ্যে নতুন গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ করা সম্ভব হবে। বর্তমানে শেভরন জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের কাছে প্রায় ৬৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি কম্প্রেশন স্টেশন স্থাপন করছে, যা থেকে আগামী বছর ৫০ থেকে ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর আগে বিবিয়ানা ক্ষেত্রের উত্তরে ৬০ বর্গকিলোমিটার ‘ফ্ল্যাঙ্ক’ এলাকায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে দুইটি নতুন কূপ খনন করেছে শেভরন।
তবে শেভরনের বিনিয়োগ প্রস্তাবে সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয় হলো গ্যাসের দাম। সংস্থাটি প্রস্তাব করেছে, গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হোক আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দামের ১০ শতাংশ হিসেবে, যা পরিবর্তনশীল হবে। বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৯০ ডলার ধরে হিসাব করলে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম দাঁড়ায় ৯ ডলার; যা শেভরন বর্তমানে পেট্রোবাংলাকে যে দামে গ্যাস বিক্রি করছে তার প্রায় তিন গুণ। শেভরন আগেও এই দাবি তুলেছিল এবং দাম না বাড়ালে বাংলাদেশ থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের হুমকিও দিয়েছিল। ২০২৬ সালের এপ্রিলে সরকার দাম বাড়ানোর শর্তে শেভরনকে বাংলাদেশে থাকতে রাজি করায়। এখন নতুন বিনিয়োগের প্রস্তাবেও একই শর্ত সামনে এসেছে। প্রশ্ন হলো, সরকার কি দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেবে? দাম না বাড়ালে শেভরন বিনিয়োগ করবে না, আর দাম বাড়ালে সেই খরচ শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়বে।
শেভরনের বিনিয়োগ প্রস্তাব গ্যাস সংকট সমাধানে তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নয়, নতুন ক্ষেত্র থেকে গ্যাস পেতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ততদিনে সংকট আরও গভীর হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া এলএনজি আমদানির ব্যয় কমানোর কোনো পথ নেই। ২০২৬ সালের আগস্টে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে প্রতি ইউনিটে ২৮ ডলারের বেশি খরচ হয়েছে, আর পেট্রোবাংলা প্রতি মাসে গড়ে ৫০০ কোটি টাকা লোকসান করছে। শেভরনের মতো অভিজ্ঞ কোম্পানির বিনিয়োগ দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হবে তবে তার জন্য সরকারকে দাম, শুল্ক ও চুক্তির শর্তে নমনীয় হতে হবে। অন্যথায়, গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও কৃষি—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আর সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি বোঝা আসবে।

