চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। দেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে পোশাকের চাহিদা বাড়ায় সামগ্রিক রপ্তানি আয়ও বেড়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৭৫০ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আয় হয়েছিল ৭১৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরে রপ্তানি বেড়েছে ৫ দশমিক ১২ শতাংশ।
এর মধ্যে নিট পোশাক রপ্তানি ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১৯ কোটি ডলারে। আর ওভেন পোশাক রপ্তানি ৩ দশমিক ৮১ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৩৩০ কোটি ডলার।
ইপিবি বলছে, বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হলেও বড় বাজারগুলোতে চাহিদা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের ওপর ক্রেতাদের আস্থা বাড়ায় এই প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, গত বছরের জুলাই-আগস্টে পাল্টা শুল্কের প্রভাব থাকায় রপ্তানির ভিত্তি তুলনামূলক দুর্বল ছিল। সেই কারণে এবার প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা বেশি দেখা যাচ্ছে।
ইউরোপে রপ্তানি বেড়েছে
বাংলাদেশের পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩৪৯ কোটি ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের ৩৪১ কোটি ডলারের চেয়ে ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেশি।
এই সময়ে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৪৬ দশমিক ৬১ শতাংশ গেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নে।
ইউরোপের বড় বাজারগুলোর মধ্যে জার্মানি, ইতালি, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, সুইডেন ও পোল্যান্ডে রপ্তানি বেড়েছে। তবে ফ্রান্স, ডেনমার্ক ও অস্ট্রিয়ায় রপ্তানি কমেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় বাজার জার্মানিতে রপ্তানি ০ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেড়ে ৮০ কোটি ৫০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। স্পেনে রপ্তানি বেড়েছে ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ, নেদারল্যান্ডসে ৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং সুইডেনে ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ।
অন্যদিকে ফ্রান্সে রপ্তানি ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ কমে ৩০ কোটি ৪০ লাখ ডলারে নেমেছে। ডেনমার্কে কমেছে ১৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং অস্ট্রিয়ায় ১৪ দশমিক ৬২ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেড়েছে ১১ শতাংশের বেশি
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একক বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্রেও রপ্তানি ভালো হয়েছে। জুলাই-আগস্টে দেশটিতে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১৬১ কোটি ডলার, যা আগের বছরের ১৪৫ কোটি ডলারের তুলনায় ১১ দশমিক ৪২ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ। শুল্ক ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও দেশটিতে রপ্তানি বাড়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
কানাডায় রপ্তানি ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ২৫ কোটি ডলার। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে রপ্তানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ, দাঁড়িয়েছে ৯১ কোটি ৬০ লাখ ডলারে। মোট পোশাক রপ্তানিতে যুক্তরাজ্যের অংশ ১২ দশমিক ২২ শতাংশ।
অপ্রচলিত বাজারেও ফিরেছে প্রবৃদ্ধি
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বাংলাদেশের পোশাকের প্রচলিত বাজার হিসেবে ধরা হয়। এর বাইরে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ব্রাজিল ও মেক্সিকোসহ বিভিন্ন দেশকে অপ্রচলিত বাজার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
দীর্ঘ সময় কমতির পর জুলাই-আগস্টে এসব অপ্রচলিত বাজারে পোশাক রপ্তানি আবার বেড়েছে। এই সময়ে রপ্তানি হয়েছে ১২২ কোটি ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের ১১৫ কোটি ডলারের তুলনায় ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ বেশি। মোট পোশাক রপ্তানিতে অপ্রচলিত বাজারগুলোর অংশ দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৩২ শতাংশ।
তবে ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও রাশিয়ায় রপ্তানি কমেছে। বিপরীতে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, তুরস্ক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও মেক্সিকোয় রপ্তানি বেড়েছে।
টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য নীতিসহায়তা চান উদ্যোক্তারা
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, গ্যাস সংকট, উচ্চ সুদের হার ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও প্রথম দুই মাসের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি পোশাকশিল্পের সক্ষমতা ও ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তির প্রমাণ।
তার মতে, সাম্প্রতিক কিছু সরকারি নীতিগত উদ্যোগও শিল্পকে সহায়তা করেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, সুদের হার কমানো এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানোর মতো বিষয়ে আরও নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহিউদ্দিন রুবেল বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বড় বাজারগুলোর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হলেও রপ্তানির এই প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক সংকেত।
তিনি বিশেষভাবে অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের পাশাপাশি এসব বাজারের চাহিদা ও প্রবণতা বিশ্লেষণ করে নতুন কৌশলে এগোতে হবে। একই সঙ্গে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন, পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরজুড়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের ৩ হাজার ৯৩৫ কোটি ডলারের তুলনায় এই আয় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম ছিল।

