দীর্ঘ ১৬ বছর পর বদলে গেল বাংলাদেশের বাণিজ্য মানচিত্র। ভৌগোলিক নৈকট্য, স্থলপথে পণ্য পরিবহনের সুবিধা এবং তুলনামূলক কম খরচের কারণে এতদিন ভারত ছিল বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। কিন্তু গত অর্থবছরে সেই অবস্থান থেকে পিছিয়ে পড়েছে ভারত। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৬৭ কোটি ডলারে, আর ভারতের সঙ্গে তা ১ হাজার ৭২ কোটি ডলার। অর্থাৎ আমদানি ও রপ্তানি মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ভারতের চেয়ে প্রায় ১৯৫ কোটি ডলার বেশি। তবে বড় ব্যবধানে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে চীন।
এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি বৃদ্ধি। এক বছরের ব্যবধানে মার্কিন পণ্য আমদানি ২৪৯ কোটি ডলার থেকে ৪৩ শতাংশ বেড়ে ৩৫৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। বিপরীতে ভারত থেকে আমদানি কমেছে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ এবং ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেড়েছে মাত্র প্রায় ৪ শতাংশ। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মোট বাণিজ্য বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে আমদানি, রপ্তানি নয়। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের ভাষায়, ‘বিশেষ করে সরকারি কেনাকাটায় এই বৃদ্ধি বেশি। তবে পোশাক রপ্তানিতে প্রতিশ্রুত বিশেষ শুল্কসুবিধা এখনো কার্যকর হয়নি।’
ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য কমার পেছনে রয়েছে কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও পাল্টাপাল্টি বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ। ২০২৫ সালের মার্চে বাংলাদেশ ভারত থেকে সুতা আমদানি বন্ধ করে দেয়। জবাবে ভারত বাংলাদেশি পণ্যের ট্রানজিট সুবিধা প্রত্যাহার করে এবং তৈরি পোশাক, খাদ্যপণ্য, পাটজাত পণ্য, প্লাস্টিক ও কাঠের আসবাবসহ বিভিন্ন খাতে বিধিনিষেধ আরোপ করে। মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, ‘দুই দেশের আরোপ করা অশুল্ক বাধায় আমদানি ও রপ্তানি কমেছে।’ এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি)’। এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি ও ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা আমদানি বৃদ্ধিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য সম্পর্কের গভীরতা বাড়লেও এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন কম নয়। এআরটি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে ১৫ বছরে ২২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কিনতে হবে এবং মার্কিন তুলা ও সিন্থেটিক ফাইবার দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের তুলার চাহিদার ৯৮ শতাংশ আমদানি করতে হয়, আর আমেরিকান তুলার দাম চীন বা ভারতের তুলনায় বেশি। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য আরও বাড়বে, তবে তা আমদানি নির্ভর। আর এই আমদানি নির্ভর বাণিজ্য বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে দেশের বাণিজ্য ঘাটতিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। এখন দেখার বিষয়, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে বাণিজ্যের চিত্র আবার বদলায় কিনা, নাকি যুক্তরাষ্ট্র স্থায়ীভাবে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখে।

