গাজীপুরের কাশিমপুরে বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শুধু কর্মসংস্থানই হারাননি শ্রমিকেরা, বদলে গেছে তাঁদের জীবনের হিসাবও। একসময় নিয়মিত বেতন পাওয়া এসব শ্রমিকের কেউ এখন চা বিক্রি করছেন, কেউ সবজির ব্যবসা করছেন, আবার কেউ অটোরিকশা চালিয়ে সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। আগের তুলনায় আয় কমেছে অনেকের, বেড়েছে অনিশ্চয়তা।
প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের শ্রমিকদের এমনই বাস্তবতার চিত্র। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজীপুরের সারাবো এলাকায় অবস্থিত শিল্পপার্কটির প্রধান ফটক এখন বন্ধ। একসময় যেখানে ভোর থেকেই শ্রমিকদের ভিড় জমত, উৎপাদনের ব্যস্ততায় মুখর থাকত আশপাশের এলাকা, সেখানে এখন নেমে এসেছে নীরবতা। বড় বড় ভবন ও যন্ত্রপাতি পড়ে আছে অলস। কোথাও কোথাও অল্পসংখ্যক প্রশাসনিক কর্মী ও নিরাপত্তাকর্মী দিয়ে স্থাপনা পাহারা দেওয়া হচ্ছে।
শিল্পপার্কের ১৪টি কারখানা ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এর আগে ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে ধাপে ধাপে কারখানাগুলোতে লে-অফ ও ছাঁটাই শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানে ৩১ হাজার ৬৭৯ জন শ্রমিক এবং ১ হাজার ৫৬৫ জন কর্মচারী কাজ করতেন। অর্থাৎ কারখানা বন্ধের প্রভাব পড়েছে ৩৩ হাজারের বেশি মানুষের জীবনে। সরকারি সহায়তায় তাঁদের বকেয়া পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না হওয়ায় অনেকেই আগের পেশায় ফিরতে পারেননি।
কারখানা বন্ধের পর শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে সরকার ৫২৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। ২০২৫ সালের মার্চে এই অর্থের চেক হস্তান্তর করা হয় এবং পর্যায়ক্রমে শ্রমিক-কর্মচারীদের পাওনা পরিশোধ শুরু হয়। তবে পাওনা পাওয়া আর নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা ফিরে পাওয়া এক বিষয় নয়। বেতন-ভাতার বকেয়া মিটলেও নতুন চাকরি না থাকায় অনেক শ্রমিককে জীবিকার জন্য অনানুষ্ঠানিক খাতে নামতে হয়েছে।
বেক্সিমকোর সাবেক শ্রমিক মো. সোলাইমান এখন চক্রবর্তী বাজারে চা বিক্রি করেন। কারখানায় চাকরির সময় নিয়মিত বেতন পাওয়ার পাশাপাশি বাড়তি কাজ করে আয় বাড়ানোর সুযোগ ছিল তাঁর। এখন সেই নিশ্চয়তা নেই। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বেক্সিমকোতে চাকরি করার সময় সংসার ভালোভাবেই চলত। কারখানা বন্ধের পর অনেক চেষ্টা করেও নতুন চাকরি পাননি। বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাজারে ফল বিক্রি করছেন। এই আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কারখানা খুললে তিনি আবার আগের কাজে ফিরতে চান।
একই বাজারে সবজি বিক্রি করছেন ওসমান আলী। তিনিও আগে বেক্সিমকোর কারখানায় কাজ করতেন। নতুন চাকরির সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেও স্থায়ী কাজ না পেয়ে প্রায় তিন মাস আগে সবজির ব্যবসা শুরু করেন। তাঁর ভাষ্য, আগের কাজের তুলনায় এখন আয় অনেক কম। পরিবার চালাতে তাঁকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জের খাইরুল ইসলামও আগে বেক্সিমকো এলাকার কর্মচাঞ্চল্যের ওপর নির্ভর করে আয় করতেন। এখন তিনি অটোরিকশা চালান। কারখানা চালু থাকার সময় হাজার হাজার শ্রমিকের যাতায়াতের কারণে পরিবহনসংশ্লিষ্ট মানুষের আয় ভালো হতো। কিন্তু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর যাত্রী কমেছে, কমেছে আয়ও। খাইরুলের নিজের চাকরিও হারিয়েছে, তাই বাধ্য হয়ে অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন তিনি।
বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের সংকট শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরো এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। শ্রমিকদের পাশাপাশি পরিবহনচালক, দোকানি, ভাসমান ব্যবসায়ী, বাসাবাড়ির মালিক এবং ছোট সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোও শিল্পপার্কের কর্মচাঞ্চল্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কারখানা বন্ধের ফলে তাঁদের আয়েও প্রভাব পড়েছে। ফলে একটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্থবিরতা আশপাশের স্থানীয় অর্থনীতিতেও দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি করেছে।
বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২৫ সালে জাপানের রিভাইভাল এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইকোমিলির অর্থায়নে বেক্সিমকো টেক্সটাইলের ১৪টি কারখানা চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে প্রায় ২ কোটি ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে ২৫ হাজারের বেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থান ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত এগোয়নি।
বেক্সিমকো কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, শিল্পপার্কের সংকটের পেছনে রয়েছে বিপুল ঋণ, অর্থসংকট এবং নানা আইনি জটিলতা। বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের মহাব্যবস্থাপক মো. আবদুল লতিফ প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, কারখানাগুলো পুনরায় চালুর বিষয়ে বেক্সিমকো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছেন। তাঁর আশা, আলোচনার মাধ্যমে একটি কার্যকর সমাধান বের হবে। তবে শ্রমিকদের জন্য সেই সমাধান যত দ্রুত হবে, তাঁদের জীবনে অনিশ্চয়তার সময়ও তত দ্রুত কমবে।
কারখানা বন্ধের পর শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধ করা জরুরি ছিল, কিন্তু সেটিই শেষ সমাধান নয়। দীর্ঘদিনের কর্মসংস্থান হারানো মানুষের জন্য নতুন কাজ, পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবনের কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন। কারণ, একটি শ্রমিকের হাতে এককালীন পাওনা তুলে দেওয়া যায়, কিন্তু তাঁর পরিবারের নিয়মিত আয় ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ফিরিয়ে দিতে হলে কর্মসংস্থানের বিকল্প তৈরি করতেই হবে।

