রপ্তানি খাতকে আরও বহুমুখী করার লক্ষ্যে হালাল পণ্যকে একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে তুলে ধরে একটি স্বতন্ত্র “বাংলাদেশ হালাল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি” গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের হালাল সনদ ব্যবস্থা, স্বীকৃত পরীক্ষাগার, দক্ষ কর্মী তৈরি এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে হালাল সনদের পারস্পরিক স্বীকৃতি চুক্তির সুপারিশও করেছে সংগঠনটি।
সোমবার ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এক বৈঠকে বিসিআইয়ের সভাপতি হালাল পণ্যের সম্ভাবনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিফ করেন এবং এই বিষয়ে তৈরি একটি প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন। মঙ্গলবার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিসিআই এই তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনটি ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব এবং বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানদের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
বিসিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী হালাল পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। চলতি বছরের হিসাবে এই বাজারের আকার পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি, এবং বার্ষিক প্রায় সাড়ে বারো শতাংশ প্রবৃদ্ধির হার বজায় থাকলে ২০৩৪ সাল নাগাদ এই বাজার সাড়ে নয় ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনো অত্যন্ত সীমিত— দেশ থেকে বর্তমানে প্রায় পঁচানব্বই কোটি ডলারের হালাল পণ্য রপ্তানি হয়, যা মোট সম্ভাবনার তুলনায় নগণ্য।
দেশের রপ্তানি এখনো তৈরি পোশাকের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধা কমে যাওয়ার সম্ভাবনার মধ্যে রপ্তানি বহুমুখীকরণকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করছে বিসিআই, এবং এই প্রেক্ষাপটেই হালাল পণ্যকে একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প খাত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বের প্রায় দুইশ কোটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি অন্য ধর্মের মানুষের মধ্যেও হালাল পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মুসলিম-জনবহুল দেশগুলোতে বাংলাদেশের জন্য নতুন বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছে সংগঠনটি। বর্তমানে দেশের কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান— যার মধ্যে রয়েছে কিছু খ্যাতনামা খাদ্য ও কৃষিপণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান— হালাল পণ্য রপ্তানিতে যুক্ত রয়েছে, তবে এই খাতের সূচনা মূলত বেসরকারি উদ্যোগেই হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে হালাল সনদ প্রদানের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় প্রায় দুই দশক আগে। পরবর্তীতে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মালয়েশিয়ার একটি স্বীকৃত সংস্থার সহায়তায় হালাল সনদ দেওয়া শুরু করে, আর সম্প্রতি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউটও (বিএসটিআই) আন্তর্জাতিক অনুমোদন নিয়ে এই সনদ প্রদান শুরু করেছে।
তবে দেশে একক ও মানসম্মত হালাল সনদ প্রদানকারী কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ না থাকায় উদ্যোক্তারা বিভিন্ন জটিলতার মুখে পড়ছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগারের অভাবে সনদ পেতে সময় ও খরচ দুটোই বেড়ে যাচ্ছে, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের হালাল পণ্যের জন্য স্বতন্ত্র কোনো ব্র্যান্ড পরিচিতিও গড়ে উঠছে না।
এই সমস্যা কাটাতে একটি একক ও স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে বিসিআই, যার মাধ্যমে হালাল সনদ প্রদান থেকে শুরু করে এই খাতের সব কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালিত হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ যেসব দেশে হালাল পণ্য রপ্তানি করে, তাদের চাহিদা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মানের সনদ ও স্বীকৃত পরীক্ষাগার গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো সম্ভাবনাময় বাজারের সঙ্গে হালাল সনদের পারস্পরিক স্বীকৃতি চুক্তি করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া হালাল পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কারিগরি সহায়তা নেওয়া, সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার স্থাপন এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। রপ্তানি পরিসংখ্যান পৃথকভাবে চিহ্নিত করতে সুনির্দিষ্ট “হালাল কোড” তৈরির প্রস্তাবও রয়েছে প্রতিবেদনে, সঙ্গে দেশে-বিদেশে হালাল মেলায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুপারিশ।
প্রতিবেদনে শিল্প, বাণিজ্য, পররাষ্ট্র, ধর্ম, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে একটি জাতীয় হালাল নীতিমালা প্রণয়ন করে দীর্ঘমেয়াদি একটি পূর্ণাঙ্গ হালাল বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে, যেখানে বিনিয়োগকারীদের জন্য দশ থেকে পনেরো বছরের নীতি সহায়তা ও প্রণোদনার প্রস্তাবও রয়েছে। পাশাপাশি ২০৩৪ ও ২০৪০ সালকে সামনে রেখে রপ্তানির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে একটি দীর্ঘমেয়াদি ভিশন প্রণয়নের কথাও বলা হয়েছে।
বিসিআই জানিয়েছে, গত কয়েক বছর ধরে হালাল পণ্যের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে সংগঠনটি। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অংশীজনদের নিয়ে একটি গোলটেবিল আলোচনা এবং একটি দিনব্যাপী কর্মশালা আয়োজন করা হয়েছিল, যার আলোচনা ও মতামতের ভিত্তিতেই এই নীতিগত সুপারিশমালা তৈরি করা হয়েছে।

