বিশেষ বিশ্লেষণ
আপনার হাতে যদি একটা ব্যবসায়িক ঋণ থাকে, বা সদ্য একটা বাড়ি কেনার জন্য ব্যাংক লোনের কিস্তি গুনছেন, তাহলে গত দুই-তিন বছরে একটা জিনিস নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, সুদের হার আর নামছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২ সালের মে থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত টানা এগারো দফায় নীতি সুদহার বাড়িয়ে নিয়ে গেছে ১০ শতাংশে, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। তার আগে ২০০৯ সালে এই হার নেমেছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশে, আর ২০০৮ সাল থেকে গড় হার ছিল প্রায় ৭ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক সত্যিকার অর্থেই কঠোর পথ বেছে নিয়েছিল। যুক্তিটা ছিল সহজ; টাকা ধার করা ব্যয়বহুল করে দিলে মানুষ কম খরচ করবে, ব্যবসায়ীরা কম ঋণ নেবে, বাজারে টাকার প্রবাহ কমবে, আর চাহিদা কমলে দাম এমনিতেই নিয়ন্ত্রণে আসবে। প্রশ্ন হলো, দুই বছর পার হয়ে গেলেও এই সমীকরণ বাংলাদেশে কতটা মিলেছে, আর কতটা মেলেনি, সেই হিসাবটাই আজ খুলে দেখা দরকার।
সংখ্যাটা কমছে, কিন্তু সংসারের হিসাব মিলছে কই
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যেখানে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৭ শতাংশের কাছাকাছি, সেখান থেকে এটি ধারাবাহিকভাবে নেমে ২০২৬ সালের আগস্টে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে। সংখ্যাটা দেখতে স্বস্তিদায়ক মনে হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব লক্ষ্যমাত্রা হলো এটিকে ৭ শতাংশের নিচে নামানো, এবং টানা ৪১ মাস ধরে মূল্যস্ফীতি সেই ৮ শতাংশের ঘরের ওপরেই ঘুরপাক খাচ্ছে। আরেকটা জিনিস লক্ষণীয়, খাদ্য মূল্যস্ফীতি আগস্টে নেমে এসেছে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে, অথচ খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি উল্টো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে। এই বিভাজনটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকেই বোঝা যায় সুদহার বাড়ানোর প্রভাব সব জায়গায় সমানভাবে পড়ছে না। বাসাভাড়া, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন খরচের মতো খাতগুলোতে দাম একবার বাড়লে তা আর সহজে নামতে চায় না, কারণ এসব দাম নির্ধারণ হয় চাহিদা-জোগানের সরল হিসাবে নয়, বরং ব্যবসায়িক আচরণ আর বাজার কাঠামোর ওপর নির্ভর করে।
যেখানে সুদহার সত্যিই কাজ করেছে
নিরপেক্ষভাবে বললে, সুদহার বৃদ্ধির নীতি সম্পূর্ণ ব্যর্থ, এই দাবিও ঠিক নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব মুদ্রানীতি বিবৃতি অনুযায়ী, কঠোর মুদ্রানীতি এবং ২০২৫ সালের মে মাসে বাজারভিত্তিক নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা চালুর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে সত্যিকারের স্থিতিশীলতা এসেছে। রেমিট্যান্স আর রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি সুদহার বাড়িয়ে আমানতের প্রকৃত রিটার্ন ইতিবাচক রাখার কৌশল রিজার্ভ পুনর্গঠনে সহায়ক হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে যেখানে রিজার্ভ ছিল ২৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে। এটি অর্থনীতির একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি, সুদহার বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ (এক্সচেঞ্জ রেট চ্যানেল) সাধারণত স্থিতিশীল হয়, কারণ উচ্চ সুদহার বিনিয়োগকারীদের কাছে টাকা রাখা তুলনামূলক লাভজনক করে তোলে এবং আমদানি ব্যয়কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এই জায়গাটায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কৌশল কার্যত সফল বলা যায়।
তাহলে দ্রব্যমূল্যে ওষুধ কাজ করল না কেন
এখানেই আসল প্রশ্নটা। মুদ্রানীতির মৌলিক তত্ত্ব বলে, সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানোর কৌশল তখনই সবচেয়ে কার্যকর হয়, যখন মূল্যস্ফীতির উৎস হয় অতিরিক্ত চাহিদা অর্থাৎ মানুষের হাতে বেশি টাকা, বেশি ঋণ, বেশি খরচ। কিন্তু মূল্যস্ফীতি যদি জোগান-কেন্দ্রিক বা কাঠামোগত সমস্যা থেকে আসে, তাহলে সুদহার বাড়িয়ে চাহিদা কমানো ওই আগুনে পানি ঢালার বদলে অন্য ঘরে পানি ঢালার মতো হয়ে যায়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন সরাসরি বলেছেন, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি মূলত কাঠামোগত সমস্যা থেকে উদ্ভূত; বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, পর্যাপ্ত গুদামজাতকরণ সুবিধার অভাব, ফসল নষ্ট হওয়া, বেশি পরিবহন ব্যয় আর নিয়ন্ত্রক তদারকির ঘাটতি। সিপিডির হিসাব অনুযায়ী প্রতি বছর প্রায় ২১ মিলিয়ন টন খাদ্য নষ্ট হয়; যেখানে ধানের প্রায় ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ, গমের ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ, ফল-সবজির ১৭ থেকে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত অপচয় হচ্ছে ফসল কাটার পরই। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) হিসাবে, শুধু কোল্ড-চেইন আর গুদামজাতকরণ সুবিধার অভাবে প্রতি বছর প্রায় ২৪০ কোটি ডলার মূল্যের ফল ও সবজি বাজারে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজারে সীমিত সংখ্যক ব্যবসায়ীর হাতে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ থাকার প্রবণতা, যাকে সাধারণ ভাষায় আমরা “সিন্ডিকেট” বলি; যেখানে উৎপাদন খরচ না বাড়লেও দাম বাড়িয়ে রাখা হয়, আবার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও তার সুফল ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছায় না।
যে মূল্য এর জন্য দিতে হলো
সুদহার বাড়ানোর প্রকৃত প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট বোঝা যায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের চিত্রে। করোনার আগে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ শতাংশের ওপরে। ২০২১-২২ অর্থবছরে সরকারি প্রণোদনার সুবাদে তা ছিল ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ, এরপর ধারাবাহিকভাবে নেমেছে; ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ, আর কঠোর মুদ্রানীতির প্রভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে, এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে অর্থাৎ চলতি বছরের জুনে তা রেকর্ড সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগে। জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগ ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৩০ দশমিক ৯৫ শতাংশ থেকে নেমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে, আর এর পাশাপাশি জিডিপি প্রবৃদ্ধিও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ব্যাংকের সুদহার বাড়ার প্রভাবে বাণিজ্যিক ঋণের সুদ এখন প্রায় ১৫ শতাংশ ছুঁয়েছে, যা ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা চালিয়ে যাওয়াই কঠিন করে তুলেছে। অর্থাৎ চাহিদা কমানোর কৌশল কাজ করেছে বটে, কিন্তু সেই চাহিদা কমেছে মূলত উৎপাদনশীল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির খাতে, খাদ্যপণ্যের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত বাজারে নয়।
আমার পর্যবেক্ষণ
মুদ্রানীতির একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো, সুদহার সমন্বয়ের প্রভাব অর্থনীতিতে পৌঁছায় মূলত তিনটি পথে; সুদের হার নিজেই, ব্যাংক ঋণ প্রবাহ, আর বিনিময় হার। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এই তিনটি পথের মধ্যে বিনিময় হারের পথটিতেই বাংলাদেশ ব্যাংকের কৌশল সবচেয়ে বেশি ফল দিয়েছে, রিজার্ভ বেড়েছে, বাজারে ডলারের অস্থিরতা কমেছে। কিন্তু ঋণ প্রবাহ কমিয়ে চাহিদা সংকোচনের যে পথ, সেটি কাজ করেছে ঠিকই তবে যেখানে চাহিদা কমানোর দরকার ছিল না, সেই উৎপাদনশীল খাতেই এর আঘাত পড়েছে বেশি, আর যেখানে দরকার ছিল অর্থাৎ সিন্ডিকেট-নিয়ন্ত্রিত নিত্যপণ্যের বাজারে, সেখানে সুদহারের কোনো ভূমিকাই নেই, কারণ মজুতদার বা মধ্যস্বত্বভোগী কখনো ব্যাংক থেকে বাড়তি সুদের ঋণ নিয়ে দাম বাড়ায় না, বরং বাজারে প্রতিযোগিতার ঘাটতি আর তদারকির অভাবকে কাজে লাগায়। এখান থেকে একটা সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়, মূল্যস্ফীতি যদি একই সঙ্গে চাহিদাজনিত ও কাঠামোগত দুই কারণেই হয়, তাহলে শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে তার পুরো সমাধান খোঁজা বাস্তবসম্মত নয়। কৃষিপণ্যের সংরক্ষণাগার, পরিবহন অবকাঠামো, বাজার তদারকি সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানো আর প্রতিযোগিতা আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া শুধু সুদহার দিয়ে দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে আনার প্রত্যাশা, বাস্তবতার নিরিখে অতিরিক্ত আশাবাদী হয়ে যায়। আগামী দিনে মূল্যস্ফীতি সাত শতাংশের ঘরে নামবে কি না, তা নির্ভর করবে বাংলাদেশ ব্যাংক কতদিন সুদহার ধরে রাখে তার ওপর যতটা, তার চেয়ে বেশি নির্ভর করবে সরকার সরবরাহ শৃঙ্খলের সংস্কারে কতটা মনোযোগ দেয় তার ওপর।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

