দীর্ঘ ১২ বছরের বিরতির পর আবারও আয়োজন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের অন্যতম বড় আয়োজন বাংলাদেশ অ্যাপারেল অ্যান্ড টেক্সটাইল এক্সপো বা BATEXPO।
দেশের পোশাক শিল্পের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) উদ্যোগে আগামী ১৮ ও ১৯ নভেম্বর ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে দুই দিনব্যাপী এই প্রদর্শনী।
আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রপণ্যের সক্ষমতা তুলে ধরা এবং দেশের রপ্তানি বাজার আরও সম্প্রসারণ করাই এবারের আয়োজনের মূল লক্ষ্য।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ১২ বছর পর BATEXPO আয়োজনের মাধ্যমে দেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র শিল্পের বর্তমান অবস্থান বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা হবে।
এই প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হবে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং নতুন ধরনের পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতার ওপর।
সর্বশেষ BATEXPO অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৩ সালে। এরপর ২০১২ সালের নভেম্বরে তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ড এবং ২০১৩ সালের এপ্রিলে রানা প্লাজা ধসের পর পোশাক শিল্প নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে এই আয়োজন দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল।
তবে গত এক যুগে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিশ্বের বড় পোশাক ব্র্যান্ডগুলোর চাপ ও সহযোগিতার কারণে কারখানার নিরাপত্তা, শ্রম পরিবেশ এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে।
বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব বা সবুজ কারখানা তৈরিতে বাংলাদেশ বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের স্বীকৃত এলইইডি সনদপ্রাপ্ত পোশাক কারখানার সংখ্যায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি।
বর্তমানে দেশে ২৮৬টি তৈরি পোশাক কারখানা এলইইডি সনদ পেয়েছে। এর মধ্যে ১২৩টি কারখানা প্লাটিনাম এবং ১৪৪টি কারখানা গোল্ড মর্যাদা অর্জন করেছে।
বিশ্বের সর্বোচ্চ মানের ১০০টি এলইইডি সনদপ্রাপ্ত কারখানার তালিকাতেও বাংলাদেশের ৫৩টি কারখানা রয়েছে।
কারখানার নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন এসেছে। অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের মতো আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মাধ্যমে কারখানাগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকি শনাক্ত ও সমাধানের কাজ হয়েছে। এর ফলে উৎপাদন পরিবেশে মান উন্নত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা বেড়েছে।
সাধারণ পোশাক থেকে উচ্চমূল্যের পণ্যে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ মূলত তুলাভিত্তিক পোশাক উৎপাদনের জন্য পরিচিত ছিল। এখন দেশটি ধীরে ধীরে উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনের দিকে এগোচ্ছে।
বিশ্ব বাজারে চীনের অংশীদারিত্ব কমার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ জ্যাকেট, স্যুট, খেলাধুলার পোশাক, স্কি পোশাক, সামরিক পোশাক এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের উচ্চমানের পণ্য উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
এখনো বাংলাদেশের বার্ষিক পোশাক রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশ তুলাভিত্তিক পণ্য হলেও বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক উৎপাদন বাড়ছে।
বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ৭৮ শতাংশ পোশাক তৈরি হয় কৃত্রিম তন্তু দিয়ে। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতেও এ ধরনের পণ্যের অংশ বাড়ছে এবং বর্তমানে মোট রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশ কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিবর্তন বাংলাদেশের পোশাক খাতকে শুধু পরিমাণের দিক থেকে নয়, পণ্যের বৈচিত্র্য ও মূল্য সংযোজনের দিক থেকেও এগিয়ে নিচ্ছে।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থান
বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। অথচ BATEXPO যখন প্রথম শুরু হয় ১৯৮৯ সালে, তখন দেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ বিলিয়ন ডলারেরও কম।
বিজিএমইএ সভাপতি জানান, এবারের BATEXPO-তে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের এই দীর্ঘ যাত্রা, অর্জন এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, BATEXPO শুধু একটি প্রদর্শনী নয়, বরং বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের পরিবর্তিত পরিচয় তুলে ধরার একটি সুযোগ। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং উচ্চমূল্যের পণ্যে সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্ব পোশাক বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে চাইছে।

