ঢাকার ক্রমবর্ধমান যানজট ও জনসংখ্যার চাপ মোকাবিলায় মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিমানবন্দর-কমলাপুর এবং হেমায়েতপুর-ভাটারা মেট্রোরেল প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন হওয়ায় এই দুই পাতাল মেট্রোরেলে মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪ হাজার ২৪২ কোটি টাকা।
এর পাশাপাশি নতুন করে অনুমোদন পেয়েছে গাবতলী-দাসেরকান্দি রুটের এমআরটি লাইন-৫ (সাউদার্ন রুট) প্রকল্প। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় গতকাল এসব প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকার ভবিষ্যৎ গণপরিবহন ব্যবস্থায় পাতাল মেট্রোরেলের গুরুত্ব বাড়ানো হচ্ছে। কারণ ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানীতে সড়কের ওপর নতুন অবকাঠামো নির্মাণের জায়গা ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে।
গাবতলী-দাসেরকান্দি মেট্রোতে থাকবে ১৫ স্টেশন
নতুন অনুমোদিত এমআরটি লাইন-৫ (সাউদার্ন রুট) গাবতলী থেকে শুরু হয়ে কল্যাণপুর, শ্যামলী, আসাদগেট, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও ও আফতাবনগর হয়ে দাসেরকান্দিতে গিয়ে শেষ হবে।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, এই রুটে মোট ১৫টি স্টেশন থাকবে। এর মধ্যে ১১টি থাকবে ভূগর্ভস্থ এবং চারটি হবে উড়ালপথের।
গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত অংশ মাটির নিচ দিয়ে নির্মাণ করা হবে। এরপর আফতাবনগর থেকে দাসেরকান্দি পর্যন্ত অংশ হবে উড়ালপথ।
এই রুটে শুরুতে ছয়টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচ নিয়ে ১৯টি মেট্রোরেল পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ট্রেন একসঙ্গে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯০৮ জন যাত্রী বহন করতে পারবে।
প্রকল্পটি চালু হলে গাবতলী থেকে দাসেরকান্দি পর্যন্ত যাতায়াতে সময় লাগবে মাত্র ২৮ মিনিট।
দুই পুরোনো প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়াল ২ লাখ কোটি টাকার বেশি
বিমানবন্দর-কমলাপুর এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পটি ২০১৯ সালের অক্টোবরে অনুমোদিত হয়েছিল। তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা।
সংশোধিত প্রস্তাবে এই প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। পাশাপাশি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০৩৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে হেমায়েতপুর-ভাটারা এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট) প্রকল্পের ব্যয় ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা।
এই প্রকল্পের হেমায়েতপুর-আমিনবাজার অংশ হবে উড়ালপথ এবং আমিনবাজার-ভাটারা অংশ হবে পাতালপথ। প্রকল্পটি ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন মেয়াদ বাড়িয়ে ২০৩২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে যেসব কারণ
প্রকল্প সংশোধনের নথিতে বলা হয়েছে, কভিড মহামারির সময় নকশা ও দরপত্র প্রস্তুতিতে বিলম্ব, দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল বাস্তবায়নের জটিলতা এবং কাজের পরিধি বৃদ্ধির কারণে ব্যয় বেড়েছে।
এ ছাড়া স্টেশনের গভীরতা বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং ভ্যাট-ট্যাক্স বৃদ্ধিও ব্যয় বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, প্রকল্পগুলোর ব্যয় বৃদ্ধি যাচাই করতে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির সুপারিশ ও যাচাই-বাছাইয়ের পরই সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বাড়ছে ঋণের খরচ, তবে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধার কথা ভাবছে সরকার
প্রকল্প দুটির অর্থায়নে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার ঋণ রয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে ঋণের সুদের হার বেড়েছে।
আগে যেখানে সুদের হার দশমিক ৭ শতাংশ ধরা হয়েছিল, বর্তমানে তা বেড়ে ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ হয়েছে। ভবিষ্যতে এই হার আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, দীর্ঘসূত্রতা হলে প্রকল্প ব্যয় ও ঋণের চাপ আরও বাড়তে পারে। তবে ঢাকার যানজট, জ্বালানি সাশ্রয় এবং নাগরিকদের সময় বাঁচানোর বিষয় বিবেচনায় প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় নতুন যুগের সম্ভাবনা
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে ভবিষ্যতের গণপরিবহন ব্যবস্থায় পাতাল মেট্রোরেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন রুটগুলো চালু হলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ তৈরি হবে, সড়কের ওপর চাপ কমবে এবং মানুষের কর্মঘণ্টার অপচয় কমতে পারে।
তবে একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় নিয়ন্ত্রণ, ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সব মিলিয়ে ২ লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের এই মেট্রোরেল উদ্যোগ ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

